ঢাকা বুধবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৯, ৭ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ১ ঘন্টা আগে
০৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১৭:৩৪

‘শি লাভস টেক’র মূল পর্বে ডা. ফাহরীন হান্নানের ‘ঢাকা কাস্ট’

‘শি লাভস টেক’র মূল পর্বে ডা. ফাহরীন হান্নানের ‘ঢাকা কাস্ট’

মো. মনির উদ্দিন: নারীদের আন্তর্জাতিক স্টার্টআপ ‘শি লাভস টেক-২০১৯’ শীর্ষক প্রতিযোগিতার বাংলাদেশ রাউন্ডে বিজয়ী হয়েছে ডা. ফাহরীন হান্নানের স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান ‘ঢাকা কাস্ট’। মূল পর্বে অংশগ্রহণের জন্য চীন যাচ্ছে তারা। আগামী ১০ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর দেশটির বেইজিংয়ে এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। 

গত শনিবার (৩১ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে আইসিটি টাওয়ারে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এ সংক্রান্ত প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেন। 

তিনদিনব্যাপী এ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় নারী উদ্যোক্তাদের সাতটি দল। এর মধ্যে বিচারকরা শীর্ষ তিনটি দলকে নির্বাচিত করেন। দলগুলো হলো: ‘ঢাকা কাস্ট’, ‘উই রিচ’ ও ‘হ্যালো টাস্ক’। এর মধ্যে বিজয়ী হয় ‘ঢাকা কাস্ট’।  

বিজয়ী দল ‘ঢাকা কাস্ট’—যাচ্ছে চীনের বেইজিং মূল পর্বে অংশগ্রহণের জন্য। আগামী ১০ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর চীনের বেইজিংয়ে এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। 

ঢাকা কস্টের প্রতিষ্ঠাতা ডা. ফাহরীন হান্নান মেডিভয়েসকে বলেন, ‘তার সঙ্গে টিমে আছেন তিনি এবং আরও দুইজন চিকিৎসকসহ চারজন। এর মধ্যে তার স্বামী ঢাকা কাস্টের একজন কো ফাউন্ডার অধ্যাপক ডা. মো. মুনতাসির ইসলাম। তিনি ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে ফিজিওলজি ডিপার্টমেন্টে কর্মরত। অধ্যাপক মুনতাসির ইসলাম ঢাকা কাস্টের মেডিকেল ভিত্তিক বিষয়গুলো নির্ধারণ করেন। তাদের সঙ্গে আছেন এমবিবিএস শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. আব্দুর রাফি। এছাড়াও আছেন আরেকজন কো ফাউন্ডার যিনি নন-ম্যাডিকেল পারসন, তিনি ঢাকা কাস্টের প্রযুক্তি দিক দেখাশোনা করেন।’

ফাহরীন হান্নান চিটাগং বাওয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ১৯৯৯ সালে এসএসসি ও চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ২০০১ সালে এইচএসসি পাস করেন। 

লক্ষ্যে পৌঁছতে অন্য কো ফাউন্ডারদের কাছ থেকে কী পরিমাণ সহযোগিতা পাচ্ছেন, জানতে চাইলে সাপ্পোরো ডেন্টাল কলেজ তৃতীয় ব্যাচের এ শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা একেকজন একেক দিক নিয়ে কাজ করি। তবে তারা যদি পেছন থেকে আমাকে সহযোগিতা না করতেন তাহলে আমার পক্ষে তা উপস্থাপন করা সম্ভব হতো না। তারা রাতদিন আমার জন্য কষ্ট করছেন। ডায়াবেটোলজিস্ট হিসেবে স্বামীর সহযোগিতা খুব প্রয়োজন ছিল।’

ডা. ফাহরীন হান্নান চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা এম. এ. হান্নান পেশায় একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। মা নাসরিন শাহেদা গৃহিনী। তার বড় বোন শাহরীন হান্নান এরিনা চট্টগ্রামে একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষক। 

যেভাবে যাত্রা শুরু

কিভাবে এ পথে আসা—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কম সময়ে অধিক সংখ্যক মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছাতেই তাঁর এ পথে আসা। এ লক্ষ্যে ইংরেজি শিখতে অনলাইন ভিত্তিক একটি গ্রুপে যুক্ত হন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালে গ্রুপটির প্রতিষ্ঠাতা রাজিব আহমেদের সহযোগিতায় স্টার্টআপ ইকো সিস্টেমের সঙ্গে তার পরিচয়। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো জানতে তিনি এটুআই, গ্রামীণফোনসহ বিভিন্ন জায়গায় যান। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ একবছর বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নেটওয়ার্কিং হয় তাঁর। এ বিষয়ে আইসিটির বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা টিনা এফ যাবীন তাকে ব্যাপক সহযোগিতা করেন। পরে এ বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর তার উদ্যোগের ঢাকা কাস্টের ওয়েবসাইটের উদ্বোধন হয়।’

এর পর থেকে ডায়াবেটিস রোগীদের সচেতন করার জন্য অনলাইনে বিনা পয়সায় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। সেখানে চিকিৎসা পুরোপুরি সম্ভব না হলেও মানুষকে সচেতন করার অবারিত সুযোগ আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি কাজে লাগিয়ে এ রোগ জয়ের লক্ষ্যে কাজ করছে ঢাকা কাস্ট। ধারণা দেওয়া হচ্ছে—কখন ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত, কোন খাবারগুলো খাওয়া উচিত কোনটা বর্জন করা জরুরি। এবং এ উপায়ে অনেক মানুষের কাছে এ বার্তা পৌঁছানো সম্ভব। তাদের লক্ষ্য ব্যাপক সংখ্যক মানুষকে ডায়াবেটিস থেকে সুরক্ষা এবং আক্রান্তদের সুশৃঙ্খল জীবন সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ধারণা প্রদান। এ পদ্ধতিতে আগের ও পরের প্রজন্মকে অনায়াসে সমানভাবে সেবা দেওয়া সম্ভব। 

একই সঙ্গে বিভিন্ন মানুষের উৎসাহ ও উদ্দীপনায় স্টার্টআপের সঙ্গে ডায়াবেটিসের সেতুবন্ধনের চেষ্টা চলে। এ লক্ষ্যে তিনি দেশসেরা অনেক ডায়াবেটোলজিস্টের পরামর্শ নেন তিনি। এর পর তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় রোগীদের দোরগোড়ায় ডায়াবেটিসের কাঙ্খিত সমাধান পৌঁছে দেওয়ার মহান লক্ষ্যে কাজ শুরু করে ঢাকা কাস্ট। 

এর মধ্যে আছে:

১. ডায়াবেটস সম্পর্কে মানুষকে সচেতন ও শিক্ষিত করা,
২. রোগীদের ডায়াবেটিসবান্ধব ফুড ও ওষুধ সরবাহ,
৩. এছাড়া নার্স ও চিকিৎসা সেবা, অনুসন্ধান সেবার পাশাপাশি ফিজিওথেরাপিস্ট ও নিউট্রিশনিস্টের সেবা প্রদান,
৪. চিকিৎসক ও ল্যাব সাপোর্ট। 

নারীদেরকে নিজের ইচ্ছার ওপর গুরুত্বারোপ করার পরামর্শ দিয়ে উদ্যোগী এ নারী চিকিৎসক বলেন, ‘নারীরা জন্মগত ও মানসিভাবে খুবই শক্তিশালী, কিন্তু তারা তা বোঝে না। তাদের প্রতি আমার পরামর্শ, আপনার মন ইতিবাচক যা চায়—তাই করুন। পাশাপাশি বড় হওয়ার কাজে লেগে থাকেন।’  

সাহস ও প্রেরণায় যারা

বড় হওয়ার পথে মায়ের নিরবচ্ছিন্ন ও নিরলস সহযোগিতার কথা স্মরণ করে ডা. ফাহরীন হান্নান বলেন, ‘মা আমাকে সারাক্ষণ সহযোগিতা করেছেন। তা না হলে নারীর ক্ষমতায়নের পথে আমার পক্ষে এক চুল পরিমাণ হাঁটাও সম্ভব হতো না। আমার স্বামীও অনেক সুযোগ দিয়েছেন, সাংসারিক দায়িত্বে জড়িয়ে রাখলে এতদূর আগানো সম্ভব হতো না। সে বলতো, সমাজের জন্য ইতিবাচক যা খুশি করো, তবে অনৈতিক কিছু করা যাবে না।’ 

তাকে সব সময় সব বিষয়ে সাহস ও প্রেরণা যুগিয়েছেন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব মেহের আফরোজ শাওন। সীমাহীন সহযোগিতা করেছেন কুমিল্লা ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজের চতুর্থ ব্যাচের শিক্ষার্থী তাহসিন বাহার সুচনা। এছাড়া তার সহকারী হাসনা সব সময় তাকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করছেন।  

ডা. ফাহরীন হান্নান বলেন, টেক বিশ্বে নিজেদেরকে মেলে ধরার পাশাপাশি এ খাতে যে কোনো উদ্যোগে সার্বিক সহযোগিতা পেতে আগ্রহী নারীদের জন্য ‘শি লাভস টেক’ একটি বিশাল সুযোগ। প্রযুক্তি খাতে প্রতিষ্ঠা পেতে আগ্রহী নারীদের এগিয়ে নিতে তারা সারা পৃথিবীতে কাজ করে যাচ্ছে। 

বাংলাদেশে এই প্রথম

‘শি লাভস টেক’ তৃতীয়বারের মতো স্টার্টআপ প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে। তবে বাংলাদেশে এই প্রথম এসেছে তারা। বাংলাদেশ রাউন্ডে প্রযুক্তির ব্যবহার করে নিজ নিজ অঙ্গনে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন ধারণা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে বিচারকদের সামনে তুলে ধরেন নারী উদ্যোক্তা দলগুলো। 

প্রতিয়োগিতায় ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় তথ্য-প্রযুক্তির প্রয়োগ বিষয়ে ব্যতিক্রমী ধারণা, উদ্ভাবন ও কৌশল উপস্থাপনের মাধ্যমে বিচারকদের মন জয় করে নেয় স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান ‘ঢাকা কাস্ট’।   

লাল-সবুজ পতাকার প্রতিনিধিত্বে ডা. ফাহরীন

চীনে অনুষ্ঠেয় প্রতিযোগিতায় লাল-সবুজ পতাকার প্রতিনিধিত্ব করবে ‘ঢাকা কাস্ট’। উপস্থাপন করবে ডায়াবেটিস থেকে সুরক্ষায় নিজেদের প্রযুক্তি বিষয়ক ধারণা, উদ্ভাবন ও কৌশল। আর এ প্রতিযোগিতায় জিততে পারলে তথ্য-প্রযুক্তি খাতে নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মিলবে নানা রকম সুযোগ-সুবিধা।

প্রসঙ্গত, টার্টল ভেঞ্চার, ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর বিজনেস অ্যান্ড ইঞ্জিয়ারিং (আইওবিই) এবং ইএমকে সেন্টারের উদ্যোগে আয়োজনে ‘শি লাভস টেক’ শীর্ষক এ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। চীনের বেইজিংয়ে এবারের প্রতিযোগিতার মূল আসরে বিশ্বের ৪০টি দেশের প্রতিনিধি দল অংশ নেবে।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত