মুজতাবা তামীম আল মাহদী

মুজতাবা তামীম আল মাহদী

এমবিবিএস (চতুর্থ বর্ষ),
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ


০৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০৫:২০ পিএম

ডেঙ্গু নিয়ে মজার কিছু তথ্য 

ডেঙ্গু নিয়ে মজার কিছু তথ্য 

ডেঙ্গু নিয়ে খুব আতঙ্কের মধ্যে দিনকাল কাটছে। রাজধানীতে কমলেও ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমছে না। এর মধ্যেই কিছু অদ্ভূত চিন্তা আর প্রশ্ন জেঁকে বসলো মাথায়। নিজে নিজে খুঁজে বের করলাম উত্তরও। আপনিও জেনে দেখুন। অবাক না হয়ে পারবেন না।

ছোটবেলায় পড়েছিলাম অনেক ধরনের মশার কথা। এনোফিলিস, কিউলেক্স আর এডিস মশা। প্রত্যেকটা ভিন্ন ভিন্ন রোগ সৃষ্টি করে। এই ভিন্নতার কারণ কি? যেহেতু এখন ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেশি, তাই আমার জানতে ইচ্ছা হলো:

ডেঙ্গু ভাইরাস কেন এডিস মশাই বহন করে?

উত্তর পেলাম, মানুষের জন্য ক্ষতিকর কোনো জীবাণু বহন করতে মশাদের কিছু বৈশিষ্ট্য থাকতে হয়। যেমন: 
১. তাকে মানুষের রক্ত খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
২. মানুষের বাসস্থানের জায়গায় ঘনবসতি স্থাপন করতে হবে।

অনেকগুলো মশাই এই বৈশিষ্ট্যগুলো পূরণ করে। কিন্তু তৃতীয় আরেকটি বিষয় আছে। সেটা হচ্ছে: মশার দেহ অবশ্যই সেই জীবাণুকে তার দেহে বসবাসের জন্য অনুমতি দিতে হয়। এবং লালায় জীবাণুটা সংক্রমিত হতে হয়।

এডিস মশার সবগুলো প্রজাতির মধ্যে Ae. aegypti উপরোক্ত ক্রাইটেরিয়াগুলো ভালোভাবে পূরণ করে। তাই ডেঙ্গু ভাইরাসের সর্বোত্তম বাহক হচ্ছে এডিস মশার এই প্রজাতিটি।

Ae. aegypti যে শুধু মানুষকেই কামড়ায় তা না, বরং এটি কুকুর ও বিড়ালসহ অন্যান্য সব গৃহপালিত প্রাণীকেই কামড়ায়। তাহলে কী সবারই ডেঙ্গু হতে পারে?

মালয়েশিয়া ভিত্তিক একটি গবেষণায় পাওয়া গেছে, গৃহপালিত প্রাণীরাও ডেঙ্গু ভাইরাসের পোষক হতে পারে।

একটা মজার ব্যাপার আমরা সবাই জানি তাহলো: শুধুমাত্র স্ত্রী মশা কিন্তু রক্ত খায়। পুরুষ মশার রক্তের প্রয়োজন হয় না। কখনো কি ভেবেছেন এটা কেনো?

স্ত্রী মশা রক্তকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে না। মশার খাদ্য হচ্ছে চিনি বা কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্য, যা সে ফুলের মধু থেকে সহজেই পেয়ে যায়।

কিন্তু যখন মশার ডিম পাড়ার সময় হয়, তখন তার প্রোটিন এবং লিপিডেরও প্রয়োজন হয়। সেই প্রয়োজন মেটাতে স্ত্রী মশা রক্ত গ্রহণ করে। কিন্তু পুরুষ মশার এরূপ প্রয়োজন পড়ে না বলে সে রক্ত গ্রহণ করে না।

এডিস মশা চেনার উপায়

অনেককেই দেখলাম, মশা মেরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তার ছবি দিচ্ছেন। ডেঙ্গু আতঙ্কের প্রেক্ষাপটে ক্ষুব্ধ নগরবাসীর হাতে মারা যাচ্ছে অনেক নিরীহ মশাও। ডেঙ্গু মশা ভেবে যার ছবি ফেবুতে দিচ্ছেন, সে কি আসলেই ডেঙ্গু ভাইরাস বহনকারী এডিস মশা? এডিস মশা দেখতে কেমন হয়?

একদম সহজ ভাষায় বললে, এডিস মশার পায়ে সাদা কালো ডোরাকাটা দাগ থাকে। দেহের উপরিভাগেও সাদা-কালো দাগ দেখতে পাবেন। এইটুকু খেয়াল করলেই আপনি সহজেই এডিস মশা চিনতে পারবেন।

ফেসবুকসহ অনেক জায়গায় শুনছিলাম, এডিস মশা পরিষ্কার পানিতে জন্মায়। আমি নিজেও অনেককে বলেছি। তার পরেই আমার মাথায় এ সংক্রান্ত এটি প্রশ্ন আসলো। তাহলো: কেন শুধু পরিষ্কার পানিতেই জন্মাবে এডিস মশা? ময়লা পানিতে কী সমস্যা?

উত্তর খুঁজতে ঘাঁটাঘাঁটি করলাম। International Journal of Mosquito Research এর একটা গবেষণাপত্র পড়ে জানতে পারলাম, ব্যাপারটা ঠিক উল্টো। তারা ৯১টি মশার লার্ভা দিয়ে একটা গবেষণা চালান। সেখানে প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যায়, বেশিরভাগ মশাই দূষিত পানিতে বংশবৃদ্ধি করেছে।

এক্ষেত্রে যেটা বলা সর্বাপেক্ষা যুক্তিযুক্ত তা হচ্ছে, এডিশ মশা আবদ্ধ পানিতে বংশবিস্তার করতে পছন্দ করে। এখন প্রশ্ন আসবে, আবদ্ধ পানিই কেন? এটার উত্তর জানতে হলে আপনাকে জানতে হবে, মশা কেন পানিতেই ডিম পাড়ে?

উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নাই। উত্তরটা আমিই বলে দিচ্ছি। মশার জীবনচক্রের চারটি ধাপ আছে। ডিম>লার্ভা>পিউপা>পূর্ণবয়স্ক মশা। প্রথম তিনটি ধাপের জন্য পানি বাধ্যতামূলক।

মশা ডিম পাড়ার পর ডিম ফুটে লার্ভা বের হয়। এটা হচ্ছে জুভেনাইল স্টেজ। মশার লার্ভাগুলো হচ্ছে জলজ। অর্থাৎ এদের খাদ্য হচ্ছে পানিতে থাকা শৈবাল, ব্যাকটেরিয়া এবং অন্যান্য অণুজীব। তারা তাদের লেজে থাকা ‘সাইফন’ নামে এক ধরনের টিউবের মাধ্যমে অক্সিজেন গ্রহণ করে।

The New South Wales Department of Natural Resources in Australia এদেরকে ‘Hairy maggots with siphon’ নাম দিয়েছে।

যেহেতু মশা ঠাণ্ডা রক্তের প্রাণী এবং দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য তারা বাইরের গরম তাপমাত্রার উপর নির্ভরশীল, তাদের বৃদ্ধিও নির্ভর করে উষ্ণ তাপমাত্রার উপর।

মশার জীবনচক্রের টিন-এজ বয়সকে বলা হয় পিউপা দশা। এই অবস্থায় থাকাকালীন কোনো খাদ্যগ্রহণ করে না তারা। শুধু সাঁতার কেটে বেড়ানো ছাড়া তাদের কোনো কাজ থাকে না। একটা সময় পর যখন এরা পূর্ণাঙ্গ মশা হয়ে বের হয়, তখন এদের মধ্যে দুইট চাহিদা তৈরি হয়। এক. খাওয়া আর দুই. বংশবিস্তার। 

বংশ বিস্তারে বদ্ধ পানি কেন?

এবার আসি কেন বদ্ধ পানি দরকার হয়? মশার লার্ভা খুবই দুর্বল সাঁতারু। তাই পানির স্রোতে এরা ভেসে থাকতে পারে না। সহজেই ওয়াশ আউট হয়ে যায়। তাই নিজের অবস্থানে থেকে বংশ বিস্তার করতে মশার আবদ্ধ পানি দরকার হয়। তাছাড়া চলমান পানির স্রোতে খাবারের অভাবেও মারা যেতে পারে।

সত্যিই অন্ধকারে কামড়ায় না এডিস?

তারপরে আরেকটা ব্যাপার আমাকে বেশ অবাক করলো—যখন শুনলাম, এডিস মশা অন্ধকারে কামড়ায় না। শুধুমাত্র আলোর উপস্থিতিতে কামড়ায়। এ আবার কেমন কথা! তাহলে কি এডিস মশা রাতকানা?

এটার উত্তর পেলাম International Centre for Genetic Engineering and Biotechnology এর Vector borne disease group এর গ্রুপ লিডার Dr. Sujatha Sunil এর কাছ থেকে। তিনি বললেন, ‘স্ত্রী এডিস মশার বায়োলজিক্যাল ক্লক প্রাকৃতিকভাবেই এমনভাবে নির্ধারণ করা যে, সে সকালে এবং সন্ধ্যায় খাদ্যগ্রহণ করে। যেহেতু খাদ্যগ্রহণে আলো এবং তাপমাত্রার একটা প্রভাব আছে, তাই আর্টিফিশিয়াল তাপমাত্রা এবং আলোও তাঁর এই স্বভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। বসতবাড়ি, অফিসে বদ্ধ জায়গায় মশা তার স্বাভাবিক দিন-রাত্রির সাইকেল অনুসরণ করতে পারে না। তাতে কনফিউজড হয়ে যায়। তখন আর দিন রাত্রির ব্যাপারটা থাকে না। মুখ্য হয়ে উঠে আলোর উপস্থিতি।’

হাঁটুর উপরে উড়তে পারে না!

সেদিন ফেসবুকে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ চোখে পড়লো, এডিস মশা নাকি হাঁটুর উপরে উড়তে পারে না? ব্যাপারটা পড়ে আমি হেসে উঠছিলাম। এটাও কিন্তু সত্য না। এডিস মশা হাঁটুর উপরের লেভেলেও উড়তে পারে। তাহলে এই কথাটা কিভাবে আসলো! কথায় বলে, ‘যা রটে, তার কিছুতো বটে।’

হ্যাঁ, কথাটার পিছনে একটা ভিত্তি আছে। এডিস মশা মানুষের উপস্থিতি বুঝতে পারে ঘ্রাণ নেওয়ার মাধ্যমে। মানুষের সেহে উৎপন্ন কার্বন ডাই অক্সাইডের ঘ্রাণ শুঁকে এডিস মশা রক্ত খেতে আসে। ধারণা করা হয়, আমাদের হাঁটুর নিচের জায়গাটাতে অধিক পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড উৎপন্ন হয়, তাই এখানে এডিস মশার আনাগোনা থাকে বেশি।

এইতো কয়েকদিন আগের কথা। আমার ছোটবোনের সঙ্গে কথা বলছিলাম। ও জিজ্ঞেস করে বসলো, ‘ভাইয়া, ডেঙ্গু ভাইরাস শরীরে ঢুকলে কী এমন হয় যে এতো সমস্যা হয় আমাদের?’

আমিও ভাবলাম, তাই তো! কী এমন হয়?

ডেঙ্গু ভাইরাস এডিস মশার লালার সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে রক্তে চলে আসে। তারপর সে ত্বকের দুটো কোষ ক্যারাটিনোসাইট এবং ল্যাঙ্গারহ্যান্স কোষকে আক্রমণ করে। সেই আক্রান্ত কোষগুলা চলে যায় লিম্ফ নোডে। যেখানে থাকে আমাদের দেহের প্রতিরক্ষাতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপুর্ণ ম্যাক্রোফেজ এবং মনোসাইট। যারা এই আক্রমণ প্রতিরোধ করতে গিয়ে উল্টো আক্রান্ত হয় এবং এভাবেই ভাইরাস রক্তের মাধ্যমে পুরো দেহে ছড়িয়ে পড়ে এবং লক্ষণগুলো ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে।

ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে করণীয় কী, ডেঙ্গু হয়ে গেলে কী করতে হবে এ সম্পর্কে এতদিনে নিশ্চয়ই জেনে গেছেন। আমি শুধু একটা কথাই বলবো। দয়া করে নিজের আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখুন। পানি জমতে পারে—এমন যেকোনো ধরনের পাত্র, কৌটা, টায়ার ও ভাঙ্গা বালতি কিংবা যেকোনো কিছু ফেলে রাখবেন না। আসুন আমরা সবাই মিলে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করি। সুস্থ থাকি, সুস্থ রাখি।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত