ঢাকা      মঙ্গলবার ২৪, সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ৯, আশ্বিন, ১৪২৬ - হিজরী

বিশ্ববিখ্যাত এক বাংলাদেশি নিউরোসার্জন ডা. রামপ্রসাদ সেনগুপ্তের গল্প

পারিবারিক নাম রামপ্রসাদ সেনগুপ্ত। আর বিদেশিদের কাছে তিনি রবীন সেনগুপ্ত নামে পরিচিত। নিউরোসার্জারির জগতে তিনি বিশ্বব্যাপী তিনি বিশেষভাবে সম্মানিত। বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিউরোসায়েন্টিস্ট হিসেবে ভুবনজোড়া তাঁর আসন। অসাধারণ এ মেধাবী মানুষটিকে ব্রিটেন সরকার নাগরিকত্ব দিয়ে সম্মানিত করেছে।

ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ব্রিটেনের সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব অর্ডার অব দি ব্রিটিশ এম্পায়ার বা ও বি ই উপাধিতে ভূষিত করেছে।

নিউরো সার্জারিতে তাঁর অসাধারণ অধিকার ও অপারেশনে কৃতিত্বপূর্ণ ব্যাপক সাফল্যের খবর চাউর হয়ে যাবার পর ইউরোপ-আমেরিকাতেও তার ব্যাপক কদর। এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকা তিন মহাদেশে দৌড়ঝাপ করেই তাঁর বছর কেটে যায়।

বিশ্ববিখ্যাত নিউরোসায়েন্টিস্ট, চট্টগ্রামের কৃতী সন্তান ড. রামপ্রসাদ সেনগুপ্ত ও বি ই দীর্ঘ ৬৪ বছর পর আজ মাতৃভূমি চট্টগ্রাম পরিদর্শনে আসছেন। হাটহাজারী উপজেলার ফতেয়াবাদ গ্রামে তাঁর জন্ম। ১৯৫৫ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েন্ট পাস করার পর উচ্চতর পড়াশোনার জন্য তিনি কলকাতা যান। সেখান থেকে অধিকতর উচ্চ শিক্ষার জন্য ১৯৬১ সালে বিলেতে যান। ইন্টার্নশিপ শেষ করেননি, হাতে খুব অল্পই টাকাপয়সা। লন্ডনে যাওয়ার পর মাসখানেক এখানে ওখানে ঘুরলেন। খুব একটা সুবিধে করতে পারলেন না। শেষে ম্যানচেস্টারের বেরি জেনারেল হাসপাতালে একটা চাকরি পেলেন। একবছর পরে পেলেন ডাক্তার হিসেবে নিবন্ধন। এরপর বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে শেষে নিউরোসার্জারি বিভাগেই থিতু হলেন ড. রামপ্রসাদ সেনগুপ্ত।

চিকিৎসা শাস্ত্রের এই বিভাগটা দারুণভাবে আকর্ষণ করল তাকে। নিউরোসার্জনদের কাজ, রোগীদের জীবন-মরণ লড়াই, তাদের সুস্থ করে তোলার জন্যে চিকিৎসকদের আকুলতাসবকিছুতেই একটা চ্যালেঞ্জিং অনুপ্রেরণা খুঁজে পেলেন। মানব শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ অংশটার চিকিৎসক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস পেলেন।

কিন্তু যত সহজে চাওয়া যায়, পাওয়াটা তত সহজে হয় না। এ জন্যে লাগে সুষ্ঠু পরিকল্পনা, অক্লান্ত পরিশ্রম এবং ঐকান্তিকতা। ড. সেনগুপ্ত এই তিনটি জিনিসকে কাজে লাগালেন। চরম কঠিন সে দিনগুলোতে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেছেন তিনি। সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও কাজে লেগে থাকতেন। কারণ ততদিনে সংসারে বাড়তি মুখ এসেছে। ছেলে এবং মেয়ে। তাদের ভরণপোষণও তো বাবাকেই করতে হবে। প্রতিটি পাই-পয়সা পর্যন্ত হিসেব করে খরচ করতেন। স্ত্রী-সন্তানকে ততদিনে নিজের কাছে নিয়ে গেছেন।

সফলতার গল্প

১৯৭১ সালে এডিনবরা থেকে এফআরসিএস পাস করলেন ড. সেনগুপ্ত। এসময় তার স্ত্রী ভারতে ফিরে আসার জন্য অস্থির হয়ে পড়লেন। ড. সেনগুপ্ত নিজেও চাইছিলেন পেশাগত ক্যারিয়ারটা ভারতেই গড়ে তুলবেন। কিন্তু ভারতের কোথাও সুযোগ পাচ্ছিলেন না। যাহোক দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় ১৯৭৩ সালে দিল্লির সফদরজং হাসপাতালে চাকরি পেলেন। তবে সেখানে কেবল মাথার ইনজুরি ছাড়া আর কোনো ধরনের চিকিৎসার সুযোগ ছিল না।

ড. সেনগুপ্ত চাইছিলেন আরো সূক্ষ্ম ও বড় ধরনের কাজ করতে। কারণ এর আগে এর চেয়ে বড় কাজও তিনি করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারলেন, ভারতে এর চেয়ে বড় কিছু পাওয়া সম্ভব নয়। তিনি ফের ইংল্যান্ডে চলে যাওয়ার উদ্যোগ নিলেন। জানেন, কঠিন পরিশ্রম করে তাকে ওখানেই প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। কিন্তু সময়টা গত শতকের সত্তরের দশক।

নিজের যোগ্যতা ও ঐকান্তিক ইচ্ছার ফল পেলেন ড. সেনগুপ্ত। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত নিউরোসার্জন ড. উইলিয়াম সুইটের কাছ থেকে ডাক পেলেন। মেস জেনারেল হাসপাতালে তার সঙ্গে কাজ করতে শুরু করলেন। কিন্তু কাজটাকে উপভোগ করতে পারছিলেন না ড. সেনগুপ্ত। শেষে নিউ ক্যাসলের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে যোগ দিলেন।

২০০২ সালে ৬৫ বছর বয়সে নিউক্যাসল হাসপাতাল থেকে অবসর নেন ড. সেনগুপ্ত। নিউক্যাসল হাসপাতাল তাদের অপারেশন থিয়েটারের নাম রাখে তার নামানুসারে রবিন সেনগুপ্ত থিয়েটার। এর মানে হলো সরকারি চাকরির মেয়াদ ফুরিয়ে গেলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এরপরও তাকে চেয়েছিল। তাই শেষ পর্যন্ত ২০১২ সালে তিনি চূড়ান্তভাবে অবসর নেন।

চিকিৎসক জীবনের যত প্রাপ্তি

শিক্ষা ও পেশাগত জীবনে পেয়েছেন অনেক সম্মাননা ও পুরস্কার। ১৯৫৩ সালে মেট্রিক পরীক্ষায় বৃত্তি পেয়ে পাস করলেন। মেডিক্যাল ফর প্রফিসিয়েন্সি ইন বায়োকেমিস্ট্রি সম্মাননা পেলেন ১৯৫৭ সালে, ১৯৫৮ সালে সার্টিফিকেট অব অনার্স ইন সার্জারি পেলেন। পেশাগত জীবনে ১৯৭৩ সালে পান ডেভিড ডিকসন গবেষণা পুরস্কার। এসবিএনএস ১৯৭৪ সালে তাকে কেইমস মেমোরিয়াল ট্রাভেলিং স্কলারশিপে ভূষিত করে। ডিসটিংশন অ্যাওয়ার্ড পেলেন ১৯৮৯ সালে। ১৯৯২ সালে পান এ মেরিট।

১৯৯৯ সালে ডাচ নিউরোসার্জিক্যাল সোসাইটি থেকে পান বেক পদক। ২০০০ সালে নিউরোসার্জিক্যাল সোসাইটি অব ইন্ডিয়া তাঁকে নিউরোসার্জন অব দ্য মিলেনিয়াম পদকে ভূষিত করে।

ভারতের নিউরোসার্জারি চিকিৎসাসেবায় ডা. সেনগুপ্তের অবদান

পেশাগত ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে যেমন গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে ডা. সেনগুপ্তের, তেমনি তার দাতব্য কর্মকাণ্ডের ভাণ্ডারও বিশাল। জন্ম বাংলাদেশে হলেও বর্তমানে তিনি ভারতেরও নাগরিক। ভারতে নিউরোসার্জারি চিকিৎসাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়ার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি। নিজের টাকায় কলকাতায় গড়ে তুলেছেন নিউরোসায়েন্স সেন্টার নামে একটি প্রতিষ্ঠান।

১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি পূর্ব ভারতের ৩০ কোটি মানুষের একমাত্র ভরসাস্থল হয়ে উঠেছে। স্ত্রী এবং নিজের সঞ্চয় থেকে আড়াই লাখ পাউন্ড খরচ করেছেন। এই দাতব্য প্রতিষ্ঠানটির বড় পৃষ্ঠপোষক হলেন ডাচেস এলিজাবেথ অব নর্দাম্বারল্যান্ড। মূল প্রতিষ্ঠানটি হলো নিউরোসায়েন্স ফাউন্ডেশন।

লেখক: নাসির উদ্দিন, সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক ও মুক্তিযোদ্ধা

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষায় রেকর্ড সংখ্যক আবেদন

এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষায় রেকর্ড সংখ্যক আবেদন

মেডিভয়েস রিপোর্ট: দেশের সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষায…

চিকিৎসক হিসেবে স্বীকৃতি চান পল্লী চিকিৎসকরা

চিকিৎসক হিসেবে স্বীকৃতি চান পল্লী চিকিৎসকরা

মেডিভয়েস রিপোর্ট: নির্ধারিত কিছু কোর্স সম্পন্ন করেই নিবন্ধিত চিকিৎসকের মর্যাদা চাচ্ছেন পল্লী…

‘ভ্যাকসিন হিরো’ সম্মাননায় ভূষিত হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

‘ভ্যাকসিন হিরো’ সম্মাননায় ভূষিত হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

মেডিভয়েস রিপোর্ট: বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যের জন্য ‘ভ্যাকসিন হিরো’ সম্মাননায় ভূষিত হচ্ছেন…

ঢাকা মেডিকেল কলেজ নিয়ে সরকারের নতুন পরিকল্পনা

ঢাকা মেডিকেল কলেজ নিয়ে সরকারের নতুন পরিকল্পনা

মেডিভয়েস রিপোর্ট: ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) ভেঙে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে বড় পরিসরে নির্মাণের…

উপ-পরিচালক পদে পদোন্নতি পেলেন ৪৯ চিকিৎসক

উপ-পরিচালক পদে পদোন্নতি পেলেন ৪৯ চিকিৎসক

মেডিভয়েস রিপোর্ট: স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রনালয়ের বিভাগীয় পদোন্নতি পদোন্নতি কমিটির (ডিপিসি) সুপারিশক্রমে…

ক্যানসার আক্রান্ত এন্ড্রু কিশোর, চলছে কেমোথেরাপি

ক্যানসার আক্রান্ত এন্ড্রু কিশোর, চলছে কেমোথেরাপি

মেডিভয়েস রিপোর্ট: জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী এন্ড্রু কিশোরের শরীরে ক্যানসার ধরা পড়েছে। গতকাল শনিবার…

আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস