৩১ অগাস্ট, ২০১৯ ১১:১৮ এএম

সিএমএইচের ডাক্তারদের দেখেই আমার মনে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন জাগে

সিএমএইচের ডাক্তারদের দেখেই আমার মনে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন জাগে

২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত এমবিবিএস প্রথম বর্ষ ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেন মাহমুদুল হাসান ইউসুফ। তার টেস্ট স্কোর ৯০.৫। তার গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের বোয়ালমারি উপজেলার শেখপুরে। বাবা সেনা সদস্য লুৎফর রহমান। মা মমতাজ বেগম একজন গৃহিনী। বাবার চাকরির সুবাদে ইউসুফের শৈশব কাটে কুমিল্লায়। জাতীয় মেধায় প্রথম হওয়া তুখোড় এ মেধাবী তরুণ টাঙ্গাইলের মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি গোল্ডেন জিপিএ ৫ নিয়ে পাস করেন।

এ বছর যারা মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা দেবে তাদের জন্য তিনি দিয়েছেন নানা পরামর্শ। জানিয়েছেন তার ভর্তিপ্রস্তুতি সংক্রান্ত নানা গল্প।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. মনির উদ্দিন।  

বেড়ে ওঠার গল্প 

কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে ময়নামতি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে প্রাথমিকের শিক্ষা সম্পন্ন করেন মাহমুদুল হাসান ইউসুফ। পরে বাবার চাকরির সুবাদে সিলেটের লন্ডন গ্রেস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে এক বছর পড়াশোনা করেন। সেখান থেকে ঢাকা আদমজি ক্যান্টনমেন্টে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন। পরে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হন তিনি। সেখান থেকে ২০১৫ সালে এসএসসি ও ২০১৭ সালে এইচএসসি পাস করেন। উভয় পরীক্ষাতেই তিনি জিপিএ ৫ পান। 

চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন

মাহমুদুল হাসান ইউসুফ জানান, ‘ছোটবেলা স্বপ্ন ছিল পাইলট হবো। দীর্ঘদিন এ স্বপ্ন বুকের মধ্যে লালন করি। ছোটবেলা অসুস্থ হলে স্বাভাবিকভাবেই ডাক্তারের কাছে যেতে হতো। আব্বু সেনা সদস্য হওয়ায় সিএমএইচে যেতাম। সেখানে ডাক্তারদের দেখে মনে হতো, তাদের অনেক সম্মান, অনেক উঁচুস্তরের মানুষ। এ কারণে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন জাগে মনে। পরবর্তীতে যখন ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হলাম, তখন অন্য সহপাঠীদের সঙ্গে আমারও লক্ষ্য ছিল সেনাবাহিনী বা বিমানবাহিনীতে যাবো।

ক্যাডেট কলেজের আমার একজন সিনিয়র ভাই ছিলেন, যিনি ঢাকা মেডিকেলে (ডিএমসি) চান্স পেয়েছেন। ভর্তিপরীক্ষায় তিনি ২০-এর মধ্যে ছিলেন। এ কারণে তিনি আমাদের কলেজে বেশ জনপ্রিয়। ক্যাম্পাসে আসলে আমরা সবাই তাকে ঘিরে ধরতাম। ক্যারিয়ার গঠন নিয়ে তার পরামর্শ চাইতাম।

এ সময় সেনা কর্মকতা নাকি ডাক্তার হবো—এ নিয়ে খানিকটা দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিলাম। পরে তার একটি কথা আমার মনে দাগ কেটে গেলো। তিনি বললেন, ‘প্রতিটি পেশার মানুষের মাধ্যমেই অন্যদের উপকার হয়। তবে এই উপকার বা ভালো লাগাটা সংশ্লিষ্ট পেশার মানুষ সরাসরি অনুভব করেন না। কিন্তু একজন চিকিৎসকের সেবায় কোনো রোগী যখন সুস্থ হয়ে যায়; তখন তার যে হাসি, সেটা একজন চিকিৎসক প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করতে পারেন। চিকিৎসকের এই শান্তিটা অতুলনীয়।’ এই দর্শনই আমাকে এতদূর নিয়ে এসেছে, যা আমি এখন প্রতিমুহূর্তে মনের মধ্যে লালন করি।

প্রথম হওয়ার অনুভূতি 

তিনি বলেন, ‘এটি বলে বোঝানো যাবে না। আমাদের ফলাফল নির্ধারিত দিনে প্রকাশ করা হয়নি। এ সময় একটি মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছিলাম। পর দিন দুপুরে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তখন একটি ফোনে আমার ঘুম ভাঙে। একজন বড় ভাই আমাকে এ সংবাদটি দেন। শুনে আপ্লুত হয়ে যাই।’

অভাবনীয় ফলাফল

এমন ফলাফলের প্রত্যাশী ছিলেন কিনা—জানতে চাইলে মাহমুদুল হাসান ইউসুফ বলেন ‘আসলে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু সময় অনেক বিষয় জড়িত থাকে—প্রস্তুতি কিভাবে নেবো, যার ওপর ফলাফল নির্ভর করবে। ধাপে ধাপে এগুতে থাকি, চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে মনে হয়েছে, আমার প্রস্তুতি ভালো হয়েছে। ভালো ফলাফলের জন্য মনের মধ্যে আশা ছিল, কিন্তু এতটা ভালো হবে—এমন আত্মবিশ্বাস ছিল না। আসলে যারা পরীক্ষা দেয় তারা কখনো আগে থেকে বলতে পারে না কোথায় চান্স পাওয়া যাবে।’

সাফল্যের নেপথ্যে

এ সাফল্যের জন্য পিতা-মা ও শিক্ষকদের অবদানের কথা জানিয়ে মাহমুদুল হাসান ইউসুফ বলেন, ‘সর্বাগ্রে ছিলেন আমার আব্বু-আম্মু। ছাত্রজীবনের যে ধারা—একটি কলেজ থেকে আরেকটি কলেজে চান্স পাওয়াটা, এর পুরো অংশে আমার আম্মু-আব্বু সহযোগিতা করেছেন। পাশাপাশি শিক্ষকদেরও ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে।

ক্যাডেট কলেজে আলমগীর হোসেন নামে একজন স্যার ছিলেন, যিনি আমাদের ফিজিক্স পড়াতেন। তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি একজন পিতার মতো আমাদের যত্ন নিতেন। আমাদের যেকোনো সংকট স্যারকে অকপটে বলতে পারতাম। প্রায় সবাই যখন হতাশার কথা বলতেন, স্যার তখন আমাকে আশার বাণী শুনিয়ে যেতেন।’

ভর্তিপরীক্ষার প্রস্তুতি

মাহমুদুল হাসান ইউসুফ বলেন, ‘তিন মাস কোচিংয়ের সময় যত তথ্য সংগ্রহ করা যায়, করেছি। টেক্সট বইগুলো ভালোভাবে পড়েছি। পরে সহায়ক বইগুলোর যেসব তথ্য আমার কাছে গুরুত্ব বিবেচিত হতো সেগুলো বইয়ে লিখে রাখতাম। পরে একসঙ্গে রিভিশন করতাম। ’

ভর্তিচ্ছুদের জন্য পরামর্শ 

মেডিকেল ভর্তিচ্ছুদের প্রস্তুতি একটু আগে থেকে শুরু করাটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন মাহমুদুল হাসান ইউসুফ। তিনি বলেন, এইচএসসির সময় বা তার আগে যদি জুলজি আর বোটানির বইটা ভালোভাবে শেষ করে রাখা যায়, তাহলে পরীক্ষায় এটি যথেষ্ট সহায়ক হয়। পাশাপাশি টেক্সট বই ভালোভালো রপ্ত করতে হবে। সেখান থেকেই সরাসরি প্রশ্ন করা হবে। মূল টেক্সট বইগুলো থেকে বেশিরভাগ প্রশ্ন হয়। এছাড়া অন্যান্য বই থেকে কিছু প্রশ্ন করা হয়, সেগুলোও সংগ্রহ করতে হবে। তা না হলে মূল বই থেকে ৭০-৮০% কাভার হয়ে যায়, বাকি ২০-৩০% এর জন্য এসব বই পড়তে হবে। এছাড়া শেষ দিকে রিভিশনটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। যতবেশি রিভাইজ হবে, তত বেশি মনে থাকবে। আর সফলতার জন্য সার্বিকভাবে সৃষ্টিকর্তার ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। 

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

আগামী দিনের পরিকল্পনা নিয়ে তিনি জানান, ছুটির দিনে গ্রামে গিয়ে দরিদ্র রোগীদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদান করার তীব্র ইচ্ছা আছে তার।

ইউসুফ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, চিকিৎসক ও রোগীদের মধ্যে দূরত্বটা প্রকটা আকার ধারণ করছে। এজন্য চিকিৎসক-রোগীদের পাশাপাশি রাষ্ট্রেরও দায় আছে। কাঙ্ক্ষিত সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ায় অপেক্ষাকৃত যোগ্য চিকিৎসকরা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছেন। এটি বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারলে দেশের স্বাস্থ্যখাত আরও উন্নত হবে।  

অবসরে

অবসরে খেলাধুলায় বেশি সম্পৃক্ত থাকেন মাহমুদুল হাসান ইউসুফ। পাশাপাশি গল্পের বই তাকে বেশি টানে। সুযোগ পেলে অনেক গল্পের বই পড়েন।   

মেডিভয়েস নিয়ে মতামত-পরামর্শ

মেডিভয়েস সম্পর্কে নিজের মতামত ও পরামর্শ তুলে ধরে তিনি বলেন, মেডিভয়েস দেশের স্বাস্থ্যখাতের জন্য ইতিবাচক কাজ করছে। এই যে শিক্ষার্থীদের অর্জন নিয়ে আয়োজন, এর মাধ্যমে পরের ভর্তিচ্ছুরা উদ্বুদ্ধ হবে, দিকনির্দেশনা পাবে। তারা যদি একটুখানি ধারণাও পায়, তাহলে তারা এগিয়ে যেতে পারবে। কারণ এ ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে অনেকেরই তেমন ধারণা থাকে না। এখানে আগের ও পরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মেলবন্ধনে ভূমিকা রাখছে মেডিভয়েস। 

দেশের স্বাস্থ্যখাতের জন্য পত্রিকাটি কাজ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এ দেশের চিকিৎসকরা এরই মধ্যে ঈর্ষা করার মতো বেশ কিছু অপারেশন করতে সক্ষম হয়েছেন, যা স্বাস্থ্যসেবায় এক বিপ্লবের সূচনা করেছে। এগুলো গুরুত্বসহকারে মেডিভয়েসে প্রকাশ করা হলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা আরও উৎসাহিত হবেন।’ 

যা কিছু প্রিয়:

প্রিয় বই: দত্তা। 
প্রিয় লেখক: শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। 
প্রিয় শিল্পী: আতিফ আসলাম, অরিজিৎ সিং। 
প্রিয় রঙ: রয়েল ব্লু। 
প্রিয় খাবার: গরম ভাতের সঙ্গে ঘি, ইলিশ মাছ ও আলুভর্তা। 
প্রিয় খেলা: ফুটবল। 
প্রিয় খেলোয়াড়: লিওনেল মেসি। 
প্রিয় মুহূর্ত: বিকাল বেলা। 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত