ঢাকা      মঙ্গলবার ২৪, সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ৯, আশ্বিন, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. সুরেশ তুলসান

সহকারী অধ্যাপক (সার্জারি), কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ।


ডাক্তার বিদ্বেষ কেন আমাদের অস্থিমজ্জায়?

সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপকভাবে উচ্চারিত একটি কথায় আমার কান, চোখ, মগজ আর মন যেন ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে। সেই কথাটি হলো, ডাক্তার বনাম সাধারণ জনগণের মুখোমুখি অবস্থান। অর্থাৎ সেবাগ্রহীতা বনাম সেবাদাতার মধ্যে দ্বন্দ্ব। এখানে সেবার ধরণটাও কিন্তু ভিন্ন রকম। এ সেবা হচ্ছে মানুষের সবচাইতে অমূল্য সম্পদ, মানবদেহ অর্থাৎ শরীর এবং জীবনের সেবা।

এই কথাগুলো আমাদের সাধারণ জনগণ যে জানেন না, তা কিন্তু না। তারপরও চিকিৎসকদের প্রতি কেন এতো বিদ্বেষ?

আরও একটা বিষয় পরিষ্কার। সাধারণ জনগণ এটাও জানেন, সুস্থভাবে জন্মাতে হলে, সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে হলে এবং স্বাভাবিকভাবে মরতে হলে ডাক্তারের সহযোগিতা জরুরি। তা তারা যতই ডাক্তার বিদ্বেষী হোন না কেন। জন্মক্ষণ থেকে মৃত্যুর মুহূর্ত পর্যন্ত ডাক্তারের প্রয়োজন। এমনকি মৃত্যুর পরও ডাক্তারের দেয়া ডেথ সার্টিফিকেট না হলে চলে না।

উপরন্তু সাধারণ জনগণ এটাও ভালোভাবেই জানেন, তাদের হাতে ডাক্তারের বিকল্প কিছু নাই। অথচ ডাক্তারদের হাতে ডাক্তারি ছাড়াও বিকল্প অনেক পেশা আছে। পৃথিবীজুড়ে বিকল্প পেশায় ডাক্তারদের ঈর্ষণীয় সাফল্যের অনেক উদাহরণ আছে।

এ কথা সবাই জানেন, সমাজের বাছাই করা মেধাবী শিক্ষার্থীরাই ডাক্তার হয়ে থাকেন। সুতরাং তারা যে কোনো পেশাতেও সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারবেন। বিষয়টি সম্পর্কে সবাই অবগত হওয়ার পরও ডাক্তারদের প্রতি অনাকাঙ্ক্ষিত এ বিদ্বেষ দিনের পর দিন কেন বেড়েই চলেছে?

অনেক ভেবেচিন্তে একটি প্রশ্ন মাথায় উঁকি দিচ্ছে বারবার, এই ডাক্তার বিদ্বেষের বীজ কি আমরা নিজেরাই নিজেদের অজান্তে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে বপন করছি না? ঠিক যেভাবে আমাদের অভিভাবকরা এবং পূর্বপুরুষেরা আমাদের মধ্যে বপন করে গেছেন। অবাক হচ্ছেন, এ আবার কি অলুক্ষণে কথা! ভয় নাই, ব্যাখ্যা দিচ্ছি।

এ প্রসঙ্গে শৈশবের কয়েকটি ছড়ার কথা মনে পড়ে গেল-

“খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গী এলো দেশে 
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দিবো কিসে?”

অথবা, দাদি-নানিদের ঘুম পাড়ানিয়া ভুতের গল্প। আর তাইতো শৈশবের সেই বর্গী আর ভুতের ভয় আজও চিত্ত থেকে দূর হয়নি-যদিও ভুত বলতে আদতেই কিছু নেই-এটা সকলেই জানেন, বোঝেন এবং বিশ্বাসও করেন।

এবার আসুন ডাক্তারদের প্রসঙ্গে। খেয়াল করুন, আমাদের বাচ্চারা যখন স্কুলে যায়, তখন অতি সাধারণ একটি ইংরেজি ট্রান্সলেশন তাদের করতে হয়, “ডাক্তার আসিবার পূর্বেই রোগীটি মারা গেলো"। দেশের ন্যূনতম শিক্ষিত কেউ কি বলতে পারবেন, এই ট্রান্সলেশন তিনি করেননি? এবং এ সময় সেই রোগীটির মৃত্যুর জন্য মনে মনে সেই অদেখা কাল্পনিক ডাক্তারকে দোষী সাব্যস্ত করে অভিসম্পাত করেননি?

ঠিক এভাবেই ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় ডাক্তারদের ভিলেন বানানো হয়েছে যুগের পর যুগ। আর এভাবেই ডাক্তার বিদ্বেষ আমাদের অস্থিমজ্জায় রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রতিস্থাপিত হয়ে আসছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। তাইতো ওষুধ তিতা হলে আমরা বাচ্চাদের বলি, “এবারের মতো খেয়ে নাও লক্ষ্মী সোনা, ডাক্তার আসুক তাকে ধরে আচ্ছামত পিটাবো, এত্তবড় সাহস আমার বাবু সোনাকে তিতা ওষুধ দিছে।”

আরও একটা অভিজ্ঞতা আমার মনে হয় কমবেশি সব ডাক্তারের হয়েছে, সেটা হলো কোনো রোগীর সঙ্গে যদি কোনো বাচ্চাকাচ্চা আসে এবং সেই বাচ্চা যদি ডাক্তারের চেম্বারে দুষ্টুমি করে তাহলে অভিভাবকেরা ডাক্তারের সামনেই বাচ্চাটিকে ভয় দেখায় এই বলে "ইনি ডাক্তার, দুষ্টুমি করলে ইঞ্জেকশন দিয়ে দিবে কিন্তু" যেন ডাক্তার মানেই মস্ত বড় এক খলনায়ক!

ঠিক একারণেই যেভাবে আমাদের মাঝে ভুতের অস্তিত্ব না থাকা স্বত্ত্বেও যেমন বায়বীয়ভাবে ভূতের ভয় তৈরি হয়ে আছে, ঠিক সেভাবেই তৈরি হয়েছে ডাক্তার বিদ্বেষ, এবং তা চলছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে, যেন জেনেটিকসের ধারাবাহিকতায়। সেই সঙ্গে আরও একটা ধারণা সেই শৈশব থেকেই আমাদের মনের অন্দর কোঠায় প্রোথিত হয়ে আছে। সেটা হলো: ইচ্ছে হলেই যখন তখন যে কোনো ডাক্তারকে পিটানো যায়, অপমান করা যায় বা লাঞ্ছিত করা যায়।

এখন সামাজিক অবক্ষয় এতোই বেড়ে গেছে যে, ধর্ষণের হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে চিকিৎসককে। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে, একজন নারী চিকিৎসককে এক ছাত্রনেতা হুমকি দিচ্ছেন, “বাইরে বের হ একবার, রেইপ করে ফেলবো।”

এই ডাক্তার মারার বিষয়টি এতোটাই ছেলেখেলায় পরিণত হয়েছে যে, এর প্রতিফলন আমরা প্রতিনিয়ত দেখতে পাই, যখন একজন জটিল এবং দীর্ঘমেয়াদী রোগে ভোগা কোনো রোগী বা তার আত্মীয়-স্বজন কথায় কথায় চেম্বারে এসে বলেন, স্যার দেশে-বিদেশে অনেক ডাক্তার মারলাম, কিন্তু কোনো লাভ হলো না। এবং আমার কাছে কোনো রোগী বা রোগীর আত্মীয় এ ধরণের কোনো কথা বললে আমি তাদেরকে লজ্জা দেওয়ার জন্য হলেও একটা প্রশ্ন করি, আচ্ছা আপনি যে ডাক্তার মারলেন, তা কয়জনকে মারলেন? কয়জন মিলে? কিভাবে? বা কি দিয়ে মারলেন?

এবার দুটি ঘটনার উল্লেখ করি-

১. একটা বাচ্চার বয়স নয় বছর। তার মুসলমানি অর্থাৎ Circumcision দিবো বলে প্রস্তুতি নিচ্ছি। অজ্ঞান করেই দিতে চেয়েছিলাম। অভিভাবকের অনুরোধে অবশ করে দেয়ার প্রয়াস। বাচ্চাটা একেবারেই Noncoperative. অস্ত্রোপচার কক্ষের (ওটি) টেবিলে তোলার পর থেকেই সমানে হৈ চৈ করছে। বাচ্চাটার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে তার মামা ওকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন।

এক পর্যায়ে মামা তাকে বললেন "নুনু কাটার সময় ওখানে ভালোমতো অবশ করে নিবে, তোমার কোনো ব্যথাই লাগবে না। আর যদি ডাক্তার তোমাকে একটুও ব্যথা দেয়, তাহলে তোমার ছোট চাচ্চুকে দিয়ে ডাক্তারকে আচ্ছামতো মার দেওয়াবো।

বলাবাহুল্য-বুল্টিটা না কেটেই, সেদিন বাচ্চাটাকে আমি ফেরত দিয়েছিলাম।

২. মোটরসাইকেল এক্সিডেন্টে এক ছাত্রনেতার পায়ের কিছুটা অংশ কেটে গেছে বা থেতলে গেছে। পরিষ্কার করে সেলাই বা একটা কিছু করার জন্য ওটির টেবিলে নিলাম। সেলাই বা কিছু একটা করা তো পরের কথা, অবশ করার ইঞ্জেকশন দেয়ার সময়ই ভীষণ হৈ চৈ শুরু করলো। ডাক্তারের মা-বাপ তুলে গালাগালি দিতে থাকলো। মনে হলো, ছেলেটির অভিভাবকেরা সেই বাচ্চাটার মামার মতোই হয়তো শৈশব থেকেই তার মনে ডাক্তার বিদ্বেষের বীজ বপন করে দিয়েছিল।

অনেকেই হয়তো বলবেন, অসুস্থ ছেলেটা কি বলতে কি বলে ফেলেছে। প্রথমত সে কিন্তু ছেলেটা না, রীতিমতো প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ মানুষ। কেউ কেউ আবার হয়তো বলবেন, চিকিৎসকদের কি ঔদার্য বা মানবিকতা নেই? আমি বলি, এসব গুণাবলী অবশ্যই তাদের মধ্যে আছে। কিন্তু দুঃখজনক হলো, সেটা তিলে তিলে বিনষ্ট হয়েছে বা হচ্ছে আমাদের অতীত আর বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার কারণে।

সঙ্গত কারণেই সেই ছাত্রনেতাকে সেদিন ড্রেসিং দিয়ে রাজশাহীতে রেফার্ড করেছিলাম।

(লেখাটি মেডিভয়েসের জুলাই-আগস্ট ২০১৯ প্রিন্ট সংখ্যায় প্রকাশিত)

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আধুনিক মায়েরা সিজার ছাড়া বাচ্চা প্রসবের চিন্তাই করেন না

আধুনিক মায়েরা সিজার ছাড়া বাচ্চা প্রসবের চিন্তাই করেন না

সমাজে কিছু মানসিকভাবে অসুস্থ ডাক্তার বিদ্বেষী মানুষ আছে। অসুখ হলে ইনিয়ে বিনিয়ে…

আনিসের প্রত্যাবর্তন 

আনিসের প্রত্যাবর্তন 

রাস্তায় একজনের মুখে সরাসরি সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে দিলো আনিস। আচমকা এ আচরণে…

কনজেনিটাল হার্ট ডিজিজ: গল্পে গল্পে শিখি

কনজেনিটাল হার্ট ডিজিজ: গল্পে গল্পে শিখি

স্রষ্টার সৃষ্টি বড় অদ্ভুত, মেডিকেল সায়েন্স পড়লে এটা ভাল বুঝা যায়। মাছের…

বদ লোকের গল্প!

বদ লোকের গল্প!

উপজেলায় নতুন তখন। সবাইকে ঠিকঠাক চিনিও না। হঠাৎ একদিন আমার রুমে পেট…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস