১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০৪:২৮ পিএম
মেডিভয়েসের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক ডা. এম এ তাহির

‘বর্তমানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পরিপূর্ণ মানুষ বের হচ্ছে না’

‘বর্তমানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পরিপূর্ণ মানুষ বের হচ্ছে না’

অধ্যাপক ডা. এম এ তাহির। একটি নাম। একজন কিংবদন্তী। পেশাগত জীবনে সর্বশেষ দায়িত্ব পালন করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে। অলঙ্কৃত করেছেন ইংল্যান্ডের রয়েল কলেজ অব ফিজিশিয়ানস এর কান্ট্রি এডভাইজারের পদ। এছাড়াও বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিসিয়ান্স এন্ড সার্জনস এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। মেডিভয়েসের কাছে স্যারের অবস্থান পিতৃতুল্য। আন্তরিক দিক-নির্দেশনা ও গভীর মমতা দিয়ে সিক্ত করে চলেছেন আমাদের চলার পথ। পাঠকদের জন্য রয়েছে স্যারের বর্ণিল জীবনের সংক্ষিপ্ত আলোকচ্ছটা। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেনঃ ডা. তুহিন মুশফিক। 

 

মেডিভয়েসঃ  স্যার, কেমন আছেন?

অধ্যাপক ডা. এম এ তাহির:  আলহামদুলিল্লাহ। বেশ ভালো আছি। 

মেডিভয়েসঃ  স্যার, আপনার বাল্যজীবন সম্পর্কে জানতে চাই।

অধ্যাপক ডা. এম এ তাহির:  আমি জন্মগ্রহণ করেছি সিলেটের এক অজপাড়াগাঁয়ে। সিলেটের কানাইঘাটের ছুরদেশ গ্রামে। জন্মের তিন বছরের মাথায় আমার আব্বা মারা যান। আমাদের আর্থিক অবস্থা যথেষ্ট ভালো থাকলেও অভিভাবক তেমন কেউ ছিলেন না। এক্ষেত্রে তোমরা বলতে পারো, আমি একদিক থেকে ভাগ্যবান। এখন যেমন প্রতিষ্ঠা পেতে হলে মেধার বাইরেও অনেক কিছু থাকতে হয়, তখন এমনটা ছিল না। সত্যিকারের মেধাবীরা ঠিকই তাদের মেধার মূল্যায়ন পেতো। আমার আম্মা খুবই ধার্মিক একজন মহিলা ছিলেন। আমাদের গ্রামে অনেক শিশুদেরকে বিনা পারিশ্রমিকে কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন। যদিও তিনি শিক্ষিত ছিলেন না, তারপরও তাঁর অনুপ্রেরণা আমাকে জীবনে এগিয়ে যেতে অনেক সহায়তা করেছে। 

মেডিভয়েসঃ আপনার শিক্ষাজীবন সম্পর্কে কিছু বলুন স্যার।

অধ্যাপক ডা. এম এ তাহির: আমি ছুরদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শুরু করি। বরাবরই ক্লাসে প্রথম হতাম। প্রতিটি বৃত্তি পরীক্ষাতেই আমি কৃতিত্বের সাথে সফলতা লাভ করেছি। ষষ্ঠ শ্রেণিতে আমি ভর্তি হই সিলেটের মিডেল ইংলিশ স্কুলে। এরপর ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেই সিলেট জিলা স্কুল থেকে ১৯৫৭ সালে। এ পরীক্ষায় আমি সারা বাংলাদেশে সেরা দশের মধ্যে ছিলাম। এরপর ভর্তি হলাম সিলেট এম.সি. কলেজে। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আই.এস.সি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতো। এখানেও আমি সারাদেশে সেরা বিশের মধ্যে অবস্থান করে নিতে সমর্থ হই। এরপর ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হতে আসি ১৯৫৯ সালে। তখন কর্নেল এম. এ. হক ও বারডেমের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ডা. ইব্রাহীম স্যার আমার ভাইভা নেন। আমি সে পরীক্ষায়ও কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হই। এম.বি.বি.এস পাশ করি ১৯৬৪ সালে। ই.এন.টির প্রফেসর আলাউদ্দিন ও প্রফেসর এম.এ. হাদী আমার সহপাঠী ছিল এবং আমরা একই সাথে পাশ করি।

মেডিভয়েসঃ আপনার কর্মজীবন সম্পর্কে জানতে চাই।

অধ্যাপক ডা. এম এ তাহির: তখন এম.বি.বি.এস পাশ করার পর এখনকার মতো পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন ট্রেনিংয়ের বাধ্যবাধকতা ছিল না। তারপরও আমি ঢাকা মেডিকেলে চার মাস ট্রেনিং করি। এরপর আমি ঢাকা মেডিকেলে ক্লিনিকাল এসিস্ট্যান্ট (সি.এ.) হিসেবে যোগ দেই। ছয় মাস পর রেজিস্ট্রার হই। ১৯৬৯ সালে সারা পাকিস্তানে এফ.সি.পি.এস পরীক্ষায় প্রথম হওয়ায় স্বর্ণপদক লাভ করি। এবং আমার সম্মানে সেবারের সমাবর্তন বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭০ সালে আমি এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে রংপুর মেডিকেলে যোগদান করি। ১৯৭৩ সালে এসোসিয়েট প্রফেসর হিসেবে পদোন্নতি লাভ করি। ১৯৭৭ সালে আমি মেডিসিনের অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাই। তখন আমার বয়স ছিল মাত্র ৩৬ বছর। ১৯৮২ সালে বরিশাল মেডিকেল কলেজে যোগদান করি। প্রফেসর সিদ্দিকী, ডা. ফখরুদ্দীন, ডা. এম. এ. হাই আমার সরাসরি ছাত্র। এরপর ১৯৮৫ সালে জয়েন্ট ডিরেক্টর পদে তৎকালীন পিজি হাসপাতালে যোগদান করি। ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পাই ১৯৯৪ সালে। ১৯৯৮ সাল থেকে পাশাপাশি প্রোভিসির দায়িত্ব পালন করি। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পাই। ২০০৯ সালে আমি অবসর গ্রহণ করি। 

মেডিভয়েসঃ  স্যার, আপনার অবসর কিভাবে কাটছে? 

অধ্যাপক ডা. এম এ তাহির: এখন ব্যস্ততা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করছি। বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চেম্বারে রোগীদের সময় দেই। আর বাকী সময়ে কোরআনের বিভিন্ন তাফসীর পড়ে সময় কাটাই। এই অসাধারণ গ্রন্থটি আমাকে দারুণভাবে মোহিত করেছে। আমি বিশ্বাস করি, যে ব্যক্তি কোরআন অধ্যয়ন করেনা সে অনেক অসাধারণ বিষয় থেকে বঞ্চিত হয়। 

মেডিভয়েসঃ  আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কি?

অধ্যাপক ডা. এম এ তাহির: আমি অনুধাবন করতে পারছি বর্তমানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে পেশাগত যোগ্যতায় দক্ষ মানুষ হয়তো বের হচ্ছে, কিন্তু পরিপূর্ণ মানুষ নয়। আমরা ক্রমেই নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় আর ধর্মহীনতার দিকে ঝুঁকে পড়ছি। এটি কিন্তু মোটেই কল্যাণকর হয়নি আমাদের জন্য। তার ফলাফলও আমরা পেতে শুরু করেছি। এ ব্যাপারে খুব প্রচলিত একটি বাণী, ‘আপনি যদি আপনার সন্তানকে তিনটি R শিক্ষা দেন, Reading, Writing, Arithmatic এবং চতুর্থ R মানে Religion শিক্ষা দিতে ভুলে যান, তবে আপনি পাবেন পঞ্চম R হিসেবে একজন Rascal সন্তান। বর্তমান সময়ে এই বোধটুকু আরও তীব্র হচ্ছে। কিন্তু কোন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। 

মেডিভয়েসঃ  স্যার, এই সমস্যা সমাধানে কি করা উচিত আমাদের?

অধ্যাপক ডা. এম এ তাহির: নিয়মিত নৈতিক শিক্ষা অর্জন ও ধর্মীয় গ্রন্থ অধ্যয়নের বিকল্প নেই। 

মেডিভয়েসঃ  স্যার, আমাদের বর্তমান মেডিকেল শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে কিছু বলুন।

অধ্যাপক ডা. এম এ তাহির: প্রায়োগিক ও যুগোপযোগী শিক্ষা এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি। লন্ডনের রয়েল কলেজের কান্ট্রি এডভাইজার হিসেবে এটুকু বলতে পারি- আমাদের দেশের চিকিৎসকেরা কোনভাবেই আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে পিছিয়ে থাকবে না, যদি তারা নিজেদের মেধার যথাযথ মূল্যায়ন ও নিয়মতান্ত্রিক অনুশীলনের মাধ্যমে যোগ্যতার সঠিক বিকাশ ঘটায়। আমাদের যোগ্যতা আছে যে কোন পরিমন্ডলে সবচেয়ে সেরা হিসেবে নিজেদের তুলে ধরার। সবার আগে এই কথাটুকুই বিশ্বাস করতে হবে। তবে অযথা রাজনীতিকীকরণের যে ধারা এদেশে শুরু হয়েছে, তা মেধার মূল্যায়ণ করতে পারছে না। একটা সময় এর জন্য আমাদেরকে ভুগতে হবে। 

মেডিভয়েসঃ  মেডি ভয়েস সম্পর্কে কিছু বলুন।

অধ্যাপক ডা. এম এ তাহির: দেখো, একটা সময় আমাদেরকে প্রতিনিধিত্ব করার মতো তেমন কোন মাধ্যম ছিলো না। তোমাদের উদ্যোগ অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। এ ধরনের সৃজনশীল কাজগুলো তোমাদের অনেক যোগ্যতা বাড়াতে সহযোগিতা করবে। চেষ্টা করবে যাতে নিয়মিতভাবে প্রকাশনাটি ধরে রাখতে পারো। তবে ব্যক্তিগত অধ্যয়নে যাতে কোন ছেদ না পড়ে। 

মেডিভয়েসঃ  আপনাকে অনেক ধন্যবাদ স্যার।

অধ্যাপক ডা. এম এ তাহির: তোমাদেরকেও ধন্যবাদ।

(মেডিভয়েস : সংখ্যা ৫, বর্ষ ২, জুন-জুলাই ২০১৫ তে প্রকাশিত)

  ঘটনা প্রবাহ : অধ্যাপক ডা. এম এ তাহির
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
আন্তর্জাতিক এওয়ার্ড পেলেন রাজশাহী মেডিকেলের নার্স
জীবাণু সংক্রমণ প্রতিরোধে অসামান্য অর্জন

আন্তর্জাতিক এওয়ার্ড পেলেন রাজশাহী মেডিকেলের নার্স