ঢাকা শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ৩ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ১৩ মিনিট আগে
২৮ অগাস্ট, ২০১৯ ১৫:২৬

ডেঙ্গু থেকে আরোগ্যের পর যেসব সমস্যা হতে পারে, করণীয় কী?

ডেঙ্গু থেকে আরোগ্যের পর যেসব সমস্যা হতে পারে, করণীয় কী?

মুন্নাফ রশিদ: গত মাসের মাঝামাঝি সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে নিটল-নিলয় গ্রুপের কর্মকর্তা শাহ মোহাম্মাদ হাদিউজ্জামান মামুন ধানমন্ডির ইবনে সিনা হাসপাতালে ৬ দিন ভর্তি ছিলেন। গত সোমবার মামুনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় মাত্র ১ দিনের জ্বরে তার রক্তের প্লাটিলেট ৮৫ হাজার থেকে কমে ক্রমান্বয়ে ৪০ হাজারে নেমে যায়। পরে ডেঙ্গু কমলেও এখনো শারীরিক দূর্বলতা প্রচ-ভাবে অনুভব করছি। এমনকি ১০ মিনিট রোদে চলাফেরা করলেই অত্যাধিক ক্লান্ত হয়ে পড়েন।

শুধু হাদিউজ্জামান মামুনই না এমন অসংখ্য মানুষ রয়েছেন যারা ডেঙ্গু থেকে পরিত্রাণ পেলেও শারীরিক জটিলতা কমছে না। সারাদেশে এবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অতিক্রম করেছে অতীতের সকল রেকর্ড। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী,চলতি বছরের শুরু থেকে আজ বুধবার (২৮ আগস্ট) পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ৬৭ হাজার ২২১ জন। তবে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফেরার সংখ্যাও কম নয়।

চলতি বছরের এখন পর্যন্ত সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়েছেন ৬১ হাজার ৮২২ জন। অর্থাৎ সারাদেশে ছাড়পত্র পাওয়া রোগীর সংখ্যা ৯২ শতাংশ। আর যারা আক্রান্ত হয়ে নিজ বাড়িতে চিকিৎসা নিয়েছেন তাদের হিসাব পাওয়া যায়নি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে।

গত ২৮ জুলাই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়া ঢাকা স্টেট কলেজের মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষিকা রোমানা আফরোজ বলেন, এর আগে ২০১২ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলাম, কিন্তু এবার ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে আক্রান্ত হয়েছি। জ্বরের কারণে প্রচন্ড মাথাব্যাথা ও চোখের পেছনে তীব্র ব্যথা ছিল। বর্তমানে ডেঙ্গু থেকে মুক্তি মিললেও চোখ ও মাথার ব্যথা রয়ে গেছে বলে তিনি জানান। এই শিক্ষিকার শ্বাশুড়ি কোহিনূর বেগম (৫৮) ডেঙ্গুর কারণে মিরপুরের ইসলামি ব্যাংক হাসপাতালে ৮ দিন ভর্তি ছিলেন।

কোহিনূরের বর্তমান শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে রোমানা বলেন, শ্বাশুড়ির জ্বর হওয়ার পর ১ দিনের ব্যবধানে রক্তের প্লাটিলেট ১ লাখ ৯০ হাজার থেকে ১৪ হাজারে নেমে আসে। এছাড়া ডেঙ্গু শক সিনড্রোম হওয়ায় মস্তিষ্কে সামান্য আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে বলে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ে। যার ফলে সুস্থ্য হওয়ার পরও প্রায় সময় তার মেজাজ খিটখটে থাকছে। চিকিৎসকরা বলছেন এমন সমস্যা ৬ মাস থেকে ১ বছর পর্যন্ত থাকতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ডেঙ্গু থেকে প্রাথমিক মুক্তি মিললেও অধিকাংশ রোগীরাই ভূগছেন নানা শারীরিক জটিলতায়। ফলে ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তির জ্বর চলে গেলেও পরিচর্যা ও করণীয় বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। রোগী ও চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

এছাড়া এ বছর যাদের ডেঙ্গু হয়েছে তাদের শরীরে খুব বেশি জ্বর উঠছে না। জ্বর উঠলেও দুই-তিন দিনের মধ্যেই নেমে যাচ্ছে। এছাড়া গত কয়েক বছর আক্রান্তদের হেমোরেজিক জ্বর হলেও এবার শকড সিনড্রোম বেশি দেখা দিচ্ছে। এতে করে ডেঙ্গু মুক্ত হওয়ার পরও রোগীরা বিভিন্ন ধরণের শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন।

চিকিৎসকরাও জানান, প্রাথমিকভাবে জ্বর সেরে যাওয়া বা সুস্থ হওয়ার পরও কেমন খাদ্যাভাস ও চলাফেরা করা উচিৎ সে সম্পর্কে রোগীরা অনেক কিছুই জানেন না। ফলে অনেকেই পুনরায় ডেঙ্গু আক্রান্ত ও সুস্থতা পরবর্তী নানা জটিলতার সম্মূখীন হচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত একজন ডেঙ্গু আক্রান্তের রক্তের ভেতরের তরল অংশ বের হয়ে আসা, রক্ত ঘন হয়ে যাওয়া বা রক্তের চাপ কমে যাওয়া অর্থাৎ অধিক মাত্রায় ক্যাপিলারি লিকেজ সিন্ড্রোম ও ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম দেখা দেয়া।

তবে জ্বর নেমে যাওয়ার পর রোগীর পরিচর্যা সম্পর্কে একাধিক মেডিসিন চিকিৎসক মেডিভয়েসকে বলেন, ডেঙ্গু শনাক্তের পর ৩ থেকে ৪ দিনে জ্বর কমে আসার পরই মূলত রোগীর বেশি জটিলতা দেখা দিচ্ছে। কারণ রক্তের উপাদান কমে যাওয়া বা রক্তের ঘনত্ব বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যা কেবল জ্বর চলে যাওয়ার পরেই পরিলক্ষিত হয়। যদিও অনেকে মনে করে জ্বর কমে গেলে হয়ত আশঙ্কা থাকবে না এটি ভুল ধারণা। ফলে জ্বর কমে গেলেও চিকিৎসকদের পরামর্শ মতো ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।

ডেঙ্গু চলে যাওয়ার পর আক্রান্তরা ব্যক্তিদের কী করণীয় এ ব্যাপারে প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের সাবেক ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ মেডিভয়েসকে বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম জটিলতা দেখা দিতে পারে। এজন্য হাসপাতাল ছেড়ে যাওয়ার সময় রোগীর ব্লাড কাউন্ট ও রক্ত চাপ পরীক্ষা করতে হবে। নিয়মিত বিশ্রাম, বেশি বেশি তরল খাবার গ্রহণ করতে হবে। এরপরও কোন ধরনের জটিলতা দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। রোগীকে নিয়মিত চিকিৎসকের ফলোআপে থাকতে হবে।

গত জুলাইয়ে ঢাকা শিশু হাসপাতালে ডেঙ্গুর চিকিৎসা দেওয়া হয় ৮ বছরের শিশু রাফিনকে। শিশুটির রিকশা চালক বাবা জোনায়েদ শেখ মেডিভয়েসকে বলেন, ছেলেকে নিয়ে ৪ দিন হাসপাতালে ভর্তি থাকার পর চিকিৎসকরা রিলিজ দিয়ে দেন। যদিও আরও কয়েকদিন হাসপাতালের থাকার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু সিট সংকটের কারণে এক রকম ছুটি নিয়ে চলে আসতে হয়। হাসপাতাল ছাড়ার পরও ছেলের পাতলা পায়খানা, বুকে ও পেটে ব্যথা হয়। পুনরায় চিকিৎসকের পরামর্শে বুকে পানি জমছে কিনা পরীক্ষা করাতে আলট্রাসনোগ্রাম ও বুকের এক্সরে করে সমস্যা ধরা পরে।

শিশুদের ডেঙ্গু আক্রান্ত পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা শিশু হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ মেডিভয়েসকে বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুদের জ্বর নেমে যাওয়ার পর ৪৮ ঘন্টা হলো ঝুঁকির সময়। বিশেষ করে ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের শিশুদের হাইপোটেশন বা রক্ত চাপ কমে যাওয়া, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া ও শরীরে পানি জমতে পারে। কিডনি ও রক্তে পানি সরবারহ কমে যেতে পারে। অতিরিক্ত ঘাম ঝরা ও খাবারে অরুচি দেখা দিতে পারে।

ফলে এসময় শিশুর শরীরিক কোন পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে কিনা সেদিকে খেয়াল রাখার পরামর্শ দেন তিনি। বলেন, হাসপাতাল ছেড়ে যাওয়ার পর অন্তত এক সপ্তাহ চিকিৎসকের শিশুর ফলোআপ থাকতে হবে। পাশাপাশি ফ্লুয়িড ম্যানেজমেন্ট বা তরল জাতীয় খাবার যেমন, ডাবের পানি, ওরস্যালাইন, লেবুর শরবত জাতীয় প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার খাওয়াতে হবে। সর্বপরি নিয়মিত বিশ্রাম নিতে হবে।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত