অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ

অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ

প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও একুশে পদকপ্রাপ্ত চিকিৎসক 

 


২৭ অগাস্ট, ২০১৯ ০১:৪৫ পিএম

সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় স্বাস্থ্যবীমা জরুরি

সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় স্বাস্থ্যবীমা জরুরি

রহিম মিয়া (ছদ্মনাম), সাধারণ কৃষক, গ্রামের জমিতে দিনান্ত পরিশ্রম করে পরিবার পরিজন নিয়ে কোনো রকমে দিনাতিপাত করেন। তার ছেলেটি গ্রামের স্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে, সময় পেলেই সে বাবাকে মাঠের কাজে সহায়তা করে। ছোট মেয়ে এবার সবে ক্লাস ফাইভে উঠেছে। তার স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি বলতে মাঠের জমিটুকু আর হালের দুটো গরু।

কোনোভাবে টেনেটুনে দিন চলে যাওয়া রহিম মিয়া হঠাৎ একদিন ডান পায়ের তলায় ক্ষত লক্ষ্য করলেন। প্রথমে পাত্তা না দিয়ে গ্রাম্য টুটকা চিকিৎসা নিলেন। পরবর্তীতে রোগের তীব্রতায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা গেলো, পায়ের ক্ষতটি আসলে ক্যান্সার, পা কেটে ফেলা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। খরচের পরিমাণটা মেটানো তারপক্ষে দুঃসাধ্য।

অবশেষে শেষ সম্বল জমিটুকু বন্ধক রেখে এবং ধার-দেনা করে চিকিৎসার ব্যবস্থা হলো। রহিম মিয়ার ডান পা হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলা হলো। “নুন আনতে পান্তা ফুরানো” পরিবারটির দৈনন্দিন আয়ের উৎস একদিকে যেমন বন্ধ হলো, অন্যদিকে তেমনি চিকিৎসার ব্যয় যোগাতে গিয়ে পরিবারটি পথে বসে গেলো।

দৃশ্যপট-২: রেখা (ছদ্মনাম), মেডিকেলের শেষ বর্ষের ছাত্রী, দিনরাত পড়াশোনা করে যাচ্ছে, হাসপাতালের ওয়ার্ডে রোগী দেখছে, বড় ডাক্তার হবে। মা-বাবার চোখে কতো স্বপ্ন, মেয়ে ডাক্তার হবে, মানুষের সেবা করবে, সাথে তাদেরও সুদিন আসবে। হঠাৎ করে এই প্রাণোচ্ছ্বল মেয়েটি অসুস্থ হয়ে পড়লো, রক্ত পরীক্ষায় জানা গেলো, সে ব্লাড ক্যান্সার বা লিউকিমিয়ায় আক্রান্ত।

ক'দিন পরেই যার রোগীর সেবা করার কথা, আজ সে নিজেই রোগী হয়ে হাসপাতালের বেডে যমরাজের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। বাবা-মার সীমিত আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী, যা কিছু সম্ভব ছিল, তা সব শেষ হয়ে গেলো নিমেষেই।

চিকিৎসকগণ পরামর্শ দিলেন, বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশন ছাড়া বিকল্প কোনো চিকিৎসা নেই, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। মেয়েটি আর তার পরিবারের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো, এত টাকা তাঁরা কোথায় পাবেন? এই বিপদের দিনে এগিয়ে এলেন অনেকেই, বন্ধু-বান্ধব, প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং কর্তৃপক্ষের সাহায্যের পর যা সংগৃহীত হলো, তা দিয়ে চিকিৎসা ব্যয় সংকুলান সম্ভব নয়। বন্ধু-বান্ধবরা শেষ পর্যন্ত অ্যাপ্রোন পরে বড় বড় শপিংমল, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাক্স হাতে মানুষের কাছ থেকে সাহায্য সংগ্রহে ব্রতী হলো। টাকা জুটলো, চিকিৎসা করতে বাইরেও গেলো। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে, শত চেষ্টা স্বত্ত্বেও ভবিষ্যতে ডাক্তার হবার স্বপ্ন দেখা মেয়েটি অকালেই ঝরে পড়লো।

দুইটি ঘটনাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সীমিত আয়ের লোকজন চিকিৎসার জন্য নিজেরা আলাদা করে কোনো টাকা বরাদ্দ রাখে না। ফলশ্রুতিতে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খেতে হয় বা দৈন্যদশায় পড়তে হয়। অথচ এ অবস্থায় পড়তে হতো না, যদি তাদের স্বাস্থ্যবীমা থাকত বা সরকারিভাবে তাদেরকে স্বাস্থ্যবীমার আওতায় রাখা যেত। চিকিৎসা করতে গিয়ে রহিম মিয়ার জমি বন্ধক রাখতে হতো না এবং মানুষের কাছে হাত পাততে হতো না দেশের এক ভবিষ্যৎ ডাক্তারকে বা বসে থাকতে হতো না অনুকম্পার আশায়।

এমন অবস্থা শুধু এই দুই জনেরই নয়, দেশের অসংখ্য মানুষ সাধ্যের বাইরে চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে এমন অবস্থার সম্মুখীন হচ্ছেন হরহামেশাই। আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থার চিত্র এমনই। জটিল কোনো রোগে আক্রান্ত হলে ক্যান্সার, হৃদরোগ, কিডনি বিকল বা দুর্ঘটনায় অঙ্গহানি হলে অস্বচ্ছলদের পক্ষে টাকার অভাবে চিকিৎসা নেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি লোন করে হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নিলেও রোগ নিরাময় হবে কিনা তার কোনো গ্যারান্টি নেই, কিন্তু চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে পরিবারটি যে পথে বসবে বা আর্থিক দৈন্যতায় পড়বে, তা শতভাগ বলা যায়।

স্বাস্থ্যবীমা কেন জরুরি:

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়ন করতে হলে সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি নিশ্চিত করতে হবে। দেশের কোনো মানুষ যেনো চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত না হয় এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী চিকিৎসা করাতে গিয়ে যেনো আরও দরিদ্র বা নিঃস্ব না হয়ে পড়ে, সে লক্ষ্যে বাংলাদেশে সবার স্বাস্থ্য সুরক্ষায় স্বাস্থ্যবীমা কার্যকর করা জরুরি। স্বাস্থ্যবীমা করার উদ্দেশ্যই হচ্ছে ব্যক্তির চিকিৎসা খরচ মেটানো। স্বাস্থ্যসেবার সামগ্রিক ঝুঁকি ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ব্যয়ের আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, একজন বীমাকারী বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যবীমা গ্রহণ করতে পারেন। যেমন- মাসিক প্রিমিয়াম অথবা পে-রোল ট্যাক্স, যা বীমার চুক্তি অনুযায়ী তার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় খরচ যোগাবে। যার ভেতর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় সব খরচ, প্রতিবন্ধীত্ব অথবা দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ প্রদান ইত্যাদি।

পৃথিবীর অন্যান্য দেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থার স্বরূপ:

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা মূলতঃ বেসরকারি স্বাস্থ্যবীমার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, যা অধিকাংশ আমেরিকানদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির মূল উৎস। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) একটি সরকারিভাবে পরিচালিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা, যেখানে যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী সবাই স্বাভাবিকভাবেই এ স্বাস্থ্যসেবা পেয়ে থাকেন।

আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও ইতোমধ্যে বেশ কিছু স্বাস্থ্যবীমা চালু করেছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য বীমা 'যোজনা'। প্রকল্পটি দরিদ্র মানুষদের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা আর আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধার মেলবন্ধনের কারণে। অন্য স্বাস্থ্যবীমায় যার নামে বীমা করা থাকে, তাকে প্রিমিয়াম দেওয়ার কথা, কিন্তু সরকার এই বীমায় সেই প্রিমিয়াম দিয়ে দেয়। গরিব মানুষ বিনামূল্যে একটা নির্দিষ্ট অংকের টাকা অবধি অনেক চিকিৎসা সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেই পেতে পারেন। মাত্র ৩০ টাকার বিনিময়ে হতদরিদ্র মানুষরা পেতে পারেন তাঁদের পরিবারের সুচিকিৎসার নিশ্চয়তা।

একটি স্মার্ট কার্ড নিয়ে গেলেই হাসপাতালে এক পরিবারের পাঁচজন সদস্য এক বছরে পান ৩০ হাজার টাকার চিকিৎসা সেবা। ২০০৮ এর এক এপ্রিল দারিদ্র্যসীমার নীচে থাকা মানুষদের জন্য চালু হওয়া ওই বীমায় ছয় বছরের মধ্যে তিন কোটি ৬০ লক্ষ পরিবার যুক্ত হয়েছে। টাকা-পয়সা থাকলেও অজ্ঞতার কারণে অনেকে বীমা করাতে চাইতেন না। কিন্তু একটা ছোট্ট স্মার্ট কার্ডে যাবতীয় তথ্য রাখার ব্যবস্থা করে সেই ঝামেলা দূর করেছে এই বীমা। তাছাড়া চিকিৎসার খরচও খুব কম। ফলে সেদেশের অনেক দরিদ্র মানুষদের মাঝে সাড়া জাগিয়েছে এই প্রকল্প। পিছিয়ে নেই অপর পার্শ্ববর্তী দেশ নেপালও, সেখানেই চালু হয়েছে সার্বজনীন স্বাস্থ্যবীমা প্রকল্প।

আমাদের দেশের চিত্র:

বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ একাউন্টের তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে বছরে ৬৪ লাখ মানুষ গরিব থেকে আরো গরিব হচ্ছে। এদের মধ্যে ১৫ শতাংশ চরম বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ছে। কারণ বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৬৭ শতাংশ নিজের পকেট থেকেই ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে মানুষ স্বাস্থ্য ব্যয় মেটাতে গিয়ে দিন দিন আরও গরিব হয়ে পড়ছে। দ্রুত স্বাস্থ্যখাত বীমার আওতায় আনতে না পারলে ব্যক্তিগত ব্যয় আরও বাড়তেই থাকবে।

'জীবনবীমা' সম্পর্কে আমাদের দেশে অধিকাংশ মানুষের মধ্যে সচেতনতা ও আগ্রহ থাকলেও, 'স্বাস্থ্যবীমা' শব্দটি সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় অপরিচিতই। আর বাস্তবিক প্রয়োগের ব্যাপারে বলা যায়, স্বাস্থ্যবীমা এখনও পরীক্ষাগারে পর্যবেক্ষণ পর্যায়ে। স্বাস্থ্য অর্থ ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, দেশের এক শতাংশেরও কম মানুষ স্বাস্থ্য বীমার আওতায় এসেছে। অর্থাৎ ৯৯ শতাংশের অধিক মানুষ এখনও স্বাস্থ্যবীমার বাইরে রয়েছে। কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, কর্পোরেট হাউজ ও বিশ্ববিদ্যালয় তাদের কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা চালু রাখলেও এসব বীমায় সব ধরণের স্বাস্থ্যসুরক্ষা দিতে পারছে না।

এছাড়া ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্বাস্থ্যবীমার আওতায় আসার প্রবণতা নেই বললেই চলে। তবে আশার কথা হচ্ছে, বিগত কয়েক বছরে বিদেশি অর্থায়নে "স্বাস্থ্যসুরক্ষা কর্মসূচি" নামে দেশের হতদরিদ্র মানুষের জন্য হেলথ কার্ড দেয়া শুরু করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। পরীক্ষামূলকভাবে টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতি, ঘাটাইল ও মধুপুর উপজেলার হতদরিদ্র এক লাখ মানুষের মধ্যে এ কার্ড বিতরণের কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে। এতে প্রত্যেক পরিবারের জন্য বছরে এক হাজার টাকার প্রিমিয়াম দেয়া হবে। কার্ডধারীরা ৫০টি রোগের সেবা পাবেন উপজেলা ও জেলা হাসপাতাল থেকে।

আমাদের দেশের বাস্তবতায় দেখা যাবে, কেউ চাইলেই এতো সহজে সব মানুষকে কিন্তু বীমার আওতায় আনা সম্ভব হবে না, বিশেষ করে নিম্নমধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্তদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও কঠিন। এ অবস্থায় আমাদের প্রথমে উচ্চবিত্ত থেকে ক্রমান্বয়ে মধ্যবিত্তদের আগে বীমার আওতায় আনতে হবে। আয়ের অনুপাতে এবং পরিবারের সদস্য সংখ্যা অনুযায়ী বীমার প্রিমিয়াম নির্ধারণ করা যেতে পারে। আর দরিদ্র জনগোষ্ঠীকেও বীমার আওতায় আনতে হবে, তবে তা হতে হবে খুবই স্বল্পমূল্যে বা সম্ভব হলে বিনামূল্যে। অর্থাৎ দরিদ্র জনগোষ্ঠী বীমার আওতায় থাকবে, কিন্তু তার প্রিমিয়াম সরকারিভাবে দেওয়া যেতে পারে।

এখানে আরও একটা বিষয় নিশ্চিত করতে হবে, যেন গতানুগতিক বীমার মতো সেবা পেতে দেরি না হয়। সাধারণ অন্যান্য বীমার মতো সেবার টাকা উঠাতে গিয়ে যদি অফিসের টেবিলে টেবিলে দৌঁড়াতে হয় কিংবা ন্যূনতম ২/১ দিনও দেরি হয়, তবে মানুষ কিন্তু আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। কারণ স্বাস্থ্য বিষয়টি সবসময়ই স্পর্শকাতর, তাই যে মানুষটি বিপদের শঙ্কায় বছরব্যাপী বীমার প্রিমিয়াম জমা দিলো, তাকে তার প্রয়োজনের সময় যত দ্রুত সম্ভব প্রাপ্যটা সরবরাহ করার ব্যবস্থা করতে হবে। কোনো প্রকার হয়রানি যেন না হয়, সে ব্যপারে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে।

এক্ষেত্রে এটিএম কার্ডের মতো কিংবা অন্য কোনও ডিজিটাল ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। আর সেই কার্ডগুলো গ্রহণের ব্যবস্থা থাকবে শুধুমাত্র নির্ধারিত হাসপাতাল এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার কেন্দ্রগুলোতে। বীমার সেবা বা খরচের হিসাবকে সুষ্ঠু করতে সরকারি হাসপাতাল ছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বীমা গ্রহণের এবং সেবা প্রদানের জন্য নিবন্ধন ব্যবস্থার আওতায় আনা যেতে পারে। এমনকি বীমা ব্যবহারকারীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিভিন্ন রোগ অনুযায়ী সাধারণ প্যাকেজ ভিত্তিক সেবা চালু করা যেতে পারে। অর্থাৎ বীমা ব্যবহার করলে সে নির্ধারিত হাসপাতালগুলো থেকে নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসা একটি নির্দিষ্ট খরচে পাবে। ফলে বীমার মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা পাওয়া যেমন সহজতর হবে, তেমনি চিকিৎসা খরচ এবং বীমার অর্থ ব্যয়ের জটিলতাও থাকবে না।

স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আরও একটা বিষয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন, আসলেই যারা গরিব তারাই যেন ফ্রি বা স্বল্পমূল্যের সুবিধা পান। যদিও বিত্তবানরা অবশ্যই চিকিৎসা সেবা পাবেন, তবে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কেউ যেন বীমা বা চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রে হঠাৎ “দরিদ্র” না হয়ে যান! আবার বিত্তবানরা স্বতঃপ্রণোতি হয়ে যেন বীমার আওতায় চলে আসেন। কারণ এখানে তিনি শুধু নিজের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বীমা করছেন না, বরং তিনি পরোক্ষভাবে অন্য আরেক জনের চিকিৎসা সেবায় সহায়তা করে দেশের সার্বিক স্বাস্থ্যসেবা খাতে গঠনমূলক ভূমিকা রাখছেন, পরোপকারের মহান ব্রত নিয়ে।

বাংলাদেশের জনসংখ্যার তুলনায় দরিদ্র এবং নিম্নমধ্যবিত্তের সংখ্যাও কম নয়। দরিদ্র জনগণের সব রকমের চিকিৎসা ব্যয় মেটানো এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। তবে স্বাস্থ্যবীমা করা থাকলে এই চ্যালেঞ্জ শতভাগ না হলেও অনেকটা মেটানো সম্ভব। কিন্তু একথা সত্য যে, আমাদের দেশে স্বাস্থ্যবীমা চালু করা অত্যন্ত কঠিন এবং এর বাস্তবায়ন আরো কঠিন। তবে সরকার যদি এটিকে বাধ্যতামূলক করে, তাহলে কাজটি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। সর্বোপরি স্বাস্থ্যবীমা করা থাকলে রোগীদের বিশেষ করে হতদরিদ্র বা সহায় সম্বলহীনদের উন্নত ও জরুরি চিকিৎসা দেওয়া যেমন সম্ভব হবে, তেমনি আর্থিক দৈন্যতার কারণে তাদের চিকিৎসা প্রাপ্তিও ব্যাহত হবে না। তবেই সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়ন সম্ভবপর হবে, যার মূল লক্ষ্য "সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা এবং এখাতে ব্যক্তিগত ব্যয় শূন্যের কোঠায় কমিয়ে আনা"।

সবশেষে আমার ন্যূনতম প্রস্তাবনা, অন্তত এতটুকু করা হোক, উচ্চবিত্তদের বীমার আওতায় আনা, আর গরিবের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা।

(লেখাটি মেডিভয়েসের জুলাই-আগস্ট ২০১৯ প্রিন্ট সংখ্যায় প্রকাশিত)

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত