ডা. সুরেশ তুলসান

ডা. সুরেশ তুলসান

সহকারী অধ্যাপক (সার্জারি), কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ।


২৬ অগাস্ট, ২০১৯ ০১:২০ পিএম

রোগীকে কাউন্সিলিং: প্রকৃত অর্থে কতটা জরুরী?

রোগীকে কাউন্সিলিং: প্রকৃত অর্থে কতটা জরুরী?

আমাদের দেশে আমরা অর্থাৎ ডাক্তারদের একটা বড় একটা অংশই একটা সাধারণ সমালোচনার শিকার হই। সেটা হলো আমরা রোগীদের সাথে ঠিকমতো কথা বলি না। আমরা ভাবি রোগীদের সেবা দিতে তো আমরা কোন কার্পণ্য করছি না। সেবা তো ঠিকঠাকই দিচ্ছি। এতো বোঝানোর কি আছে? -গলদটা হলো এখানেই।

বিষয়টা অনেকটা এরকম যে, একই পরিবারে একে অন্যকে ভালোবাসার মত। মুখ বুঁজে শুধু ভালোবাসবেন আর প্রিয়জনেদের প্রতি কর্তব্য পালন করবেন তা হবে না। মাঝেমধ্যে বলতে হবে আমি তোমাকে ভালোবাসি। তাকে বোঝাতে হবে আমি তার প্রতি কতটা দায়িত্বশীল, তার জন্য আমি কী করছি, কেন করছি এবং এসবের ভালোমন্দ সম্পর্কিত ধারণা তাকে দিতে হবে। তা না হলে অনাস্থা আর অবিশ্বাস দেখা দিবে।

পরিবারের মানুষই যখন মুখ ফুটে কিছু না বললে বুঝতে চায় না, বাইরের মানুষ আমাকে বুঝবে এমনটা আশা করা মোটেও উচিত না। রোগীর চিকিৎসার পাশাপাশি সেই রোগীর চিকিৎসা সংক্রান্ত সব কিছুর পুঙ্খানুপুঙ্খ বুঝে নেয়ার ইচ্ছে এবং অধিকার রোগীর এবং রোগীর স্বজনদের থাকে। চিকিৎসার পরিভাষায় আমরা বলি কাউন্সিলিং। একবার এই কাউন্সিলিং ঠিকঠাক না করার কারণে এক বৃদ্ধ রোগীর হাতে আচ্ছামতো অপদস্থ হতে হয়ে হয়েছিলো আমাকে। 

গল্পটা এরকম:

একবার একজন বয়স্ক রোগী হঠাৎ প্রস্রাব আটকে যাওয়ায় প্রস্টেট অপারেশনের জন্য আমার অধীনে কুষ্টিয়াতে একটি ক্লিনিকে ভর্তি হন। প্রস্টেট গ্রন্থির অপারেশনরে পূর্বে রোগীর প্রস্টেটের আকার এবং প্রকৃতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা নেয়ার জন্য রোগীর মলদ্বারের ভিতরে আঙ্গুল দিয়ে একটি পরীক্ষা করতে হয়।
যার নাম চিকিৎসা পরিভাষায় "ডিজিটাল রেকটাল এক্সামিনেশন।"

তবে এই পরীক্ষাটি করার পূর্বে রোগীকে এই পরীক্ষার বিষয়ে ভালোমতো বুঝিয়ে শুনিয়ে রোগীর অনুমতি নিতে হয়। অনুমতি না নিয়ে মলদ্বারে আঙ্গুল দিলেই কিন্তু সমূহ বিপদ। সেই বিপদেই আমি পড়েছিলাম। অতি বৃদ্ধ রোগী। চোখে ঠিকমতো দেখেন না, কানে ঠিকমতো শোনেন না, যেটুকু শোনেন তার কতটুকু বুঝবেন সেটাও সন্দেহ। আর প্রস্টেট অপারেশনের পূর্বে মলদ্বারে আঙ্গুল দিয়ে পরীক্ষা করা লাগবেই যেহেতু, তাই আমি এ বিষয়ে কোন কিছু ভালোমতো না বুঝিয়েই মলদ্বারে আঙ্গুল দিয়ে পরীক্ষাটা করে ফেললাম।

ফলাফল কিন্তু হাতেনেতেই পেতে হলো। বৃদ্ধ মানুষটা তো রেগেবেগে আগুন। বাড়ী থেকে ছেলেকে ডেকে পাঠালেন। ছেলে আসার সাথে সাথেই ছেলেকে বললেন। "তুই আমারে কোন নিয়াইছিস। ডাক্তারের কাম রোগী দেখা, রোগী দেখবি। বকা কাম করবি কি করতে?" (বকা কাম বলতে আমাদের এ অঞ্চলে অশ্লীল কিছু বোঝানো হয়ে থাকে সাধারণত)

ছেলে জিজ্ঞেস করলো- "ক্যা বাপ তোর কি হইছে? এতো রাগ করছিস ক্যান? ডাক্তার তোরে কি করছে?"

বাপ আরও রেগে উত্তর দিলেন- "আমারে যা করার তা তো করেই থুইছে। সেতা আমি আর সবাইরে কবো ক্যান? আমার পেশাবের রাস্তার এই নলটা খুলে দিবার কও, আমি বাড়ী যাবো।"

ছেলেকে বোঝালাম নল খুলে দিলে আবার প্রশ্বাব আটকাবে, কষ্ট পাবে বুড়ো মানুষটা। ছেলে বললো, "আমার বারো-- চু-- (লেখার অযোগ্য) বাপ খুব জেদি,
জেদ যখন চাপছে, কারো কথা শুনবি নানে। স্যার আপনি নলটা খুলে দ্যান, পেশাব আটকাউক, চো-- (লেখার অযোগ্য) পরলে নিজেই কবিনানে ডাক্তারের কাছে নিয়ে চলো। তখন না হয় আবার নিয়ে আসবো। আমার একটু কষ্ট হবিনে, এই আর কি।"

বলা বাহুল্য, রোগীটা আমাকে তখনকার মতো ছেড়ে দিতেই হলো।

সন্ধ্যায় সেই ক্লিনিকেই অপারেশন করছি, হঠাৎ ওটি স্টাফদের মাঝে গুঞ্জন, কারণ জানতে চাইলে একজন বললো- "স্যার সকালের সেই রাগ করে ফেরৎ যাওয়া বয়স্ক দাদুটা আবার এসেছে। আবার প্রস্রাব আটকে গেছে, খুব কষ্ট পাচ্ছে।"

ওটি শেষের দিকেই ছিলো, বাইরে এসে দেখলাম বৃদ্ধ মানুষটা যারপরনাই কষ্ট পাচ্ছেন, তলপেট ফুলে টানটান। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হলো। ক্যাথেটার দেয়ার সাথে সাথেই ইউরিন ব্যাগটার প্রায় পুরাটাই ভরে গেলো। তিনি তাৎক্ষণিক আরাম আর প্রশান্তি লাভ করলেন। একমুখ কৃতজ্ঞতার হাসি দিয়ে আমার হাতটা জড়িয়ে ধরলেন। আমাকে সরি বলার সুযোগটাই দিলেন না।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না