ঢাকা      মঙ্গলবার ২৪, সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ৯, আশ্বিন, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. আহমাদ হাবিবুর রহিম

লেখক, কলামিস্ট

বিসিএস (স্বাস্থ্য), রেসিডেন্ট, বিএসএমএমইউ।


রেসিডেন্সি পরীক্ষায় জরুরি মাল্টিপল সাবজেক্ট চয়েস ও ওয়েটিং লিস্ট সিস্টেম

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) অধীনে পরিচালিত MD/MS রেসিডেন্সি প্রোগ্রাম সম্ভবত বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা গ্রহণেচ্ছু চিকিৎসকদের মাঝে এখন সবচেয়ে জনপ্রিয়। মেডিকেল সায়েন্সের সেন্টার অব এক্সিলেন্স এই বিশ্ববিখ্যাত শিক্ষায়তন মেডিকেল সেক্টরে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ বিস্তারে চমৎকার ভূমিকা রেখে চলেছে। MD/MS এর সুপরিকল্পিত অ্যাকাডেমিক পাঠ্যক্রম, সুপারভাইজড ট্রেইনিং সিস্টেম, নিয়মিত পরীক্ষার ব্যবস্থা, রেসিডেন্টদের জন্য মাসিক ভাতার প্রচলন, সরকারি চাকরিজীবী চিকিৎসকদের জন্য চমৎকার ডেপুটেশন সুবিধাসহ আনুষাঙ্গিক অনেক কারণেই MD/MS এখন মেডিকেল উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে অন্যতম সেরা অপশন।

বিএসএমএমইউর বাইরেও অন্যান্য যে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে এই কোর্স চালু রয়েছে সেখানে আরও বেশি কোলাবোরেশন ও সমন্বয় সাধন প্রয়োজন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে রেসিডেন্সি পাঠ্যক্রমের যথাযথ নির্দেশনা নিয়মিত তুলে ধরলে ও তাদের অভিমতের আলোকে কার্যক্রমকে নিয়মিত আপডেট করলে তা আরও ফলপ্রসূ হবে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। এ ক্ষেত্রে উদ্যোগের অভাব হলে শিক্ষা কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত হবে তা স্বাভাবিক। তাই এই সিস্টেমকে জনপ্রিয় করতে ও সব ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে সম্মানিত কর্তাব্যক্তিরা সবসময় সক্রিয় ভূমিকা রেখে যাবেন সেটাই প্রত্যাশা করছি।

আজকের মূল আলোচনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে। এ বিষয় দুটি- সম্পর্কে আমাদের তরুণ চিকিৎসক বলয়ে অজস্রবার শুনেছি। যদিও কথাগুলো গুছিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে তোলা হয়েছে কিনা জানি না। রেসিডেন্সি পরীক্ষায় সবচেয়ে কঠিন ও কনফিউজিং যে সিস্টেমটা বর্তমানে চালু আছে তা হলো পরীক্ষার্থীকে মাত্র একটি বিষয় বেছে নিতে হয় এবং যদি সেই কোর্সটা ৪/৫ টি প্রতিষ্ঠানেও চালু থাকে তবুও তিনি তিনটির বেশি প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করার সুযোগ পান না। ফলে পরীক্ষার কঠিন প্রস্তুতি যতোটা মানসিক চাপ সৃষ্টি করে; এই সাবজেক্ট ও প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের দোটানা তার চেয়ে কম চাপ সৃষ্টি করে না।

এই জটিল হিসাবে সামান্য ভুল হলে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও প্রিয় বিষয়ে চান্স তো পাওয়া দূরে থাক, ক্যারিয়ার থেকে হারিয়ে যাবে দীর্ঘ একটি বছর। প্রাপ্তির ঝুলিতে জমা হবে আকাশসমান ব্যর্থতার কালো মেঘ, পর্বতসম হতাশার জঞ্জাল।

আবার ধরুন, একজন ঝোঁকের বসে পরীক্ষা দিয়ে একটা সাবজেক্টে চান্স পেলেন কিন্তু তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি এ বছর কোনো কারণে ভর্তি হবেন না। সেক্ষেত্রে কী হবে? চোখের সামনে একটা সিট নষ্ট হবে আর ঠিক ওই সিটটার জন্য বছর বছর ধরে স্বপ্ন দেখা চিকিৎসক তালিকায় পরের জন হিসেবে থেকেও উচ্চশিক্ষার সুযোগ হতে বঞ্চিত হবেন। এই দৃশ্য দুটো কি অপরিচিত কিছু? মোটেও না। প্রতি বছর শত শত মেধাবী চিকিৎসকের ভাগ্যে জুটছে এই পরিণতি। অথচ এ সমস্যাগুলোর সমাধান করা খুবই সহজ। শুধু মাত্র কর্তৃপক্ষের ছোট কিছু সিদ্ধান্তই বদলে দিতে পারে এ দৃশ্যপট।

বিদ্যমান পদ্ধতি বদলাতে গেলে যে খুব কায়িক পরিশ্রম করতে হবে, তেমন নয়। রেজাল্ট প্রোসেসিং সফটওয়ারের সামান্য কিছু এলগরিদম পরিবর্তন করতে হবে মাত্র! সেটা ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য দু-চারদিনের ব্যাপার। তাছাড়া অনেক বছর ধরেই সিস্টেম দুটো মেডিকেল কলেজ ভর্তি পরীক্ষায় চমৎকারভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর সুফল হিসেবে এ যাবৎকালে কতো হাজার চিকিৎসকের যে ভাগ্য বদলেছে তা নিশ্চয়ই অজানা নেই কারো।

এ ক্ষেত্রে ফরম ফিল-আপের সময় মাল্টিপল সাবজেক্ট চয়েসের কোনো ব্যবস্থা রাখতে হবে। পরীক্ষার্থী একই সঙ্গে ধারাক্রম দিয়ে একাধিক সাবজেক্টের চয়েস করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে অবশ্য যে কোনো একটা ফ্যাকাল্টি বেছে নিতে হবে। চাহিদার ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে একটা সাবজেক্ট র‌্যাঙ্কিং ও প্রতিষ্ঠান র‌্যাঙ্কিং করা থাকবে। পরীক্ষার্থী ফরম-ফিলাপের সময় সেই তালিকা থেকে ম্যানুয়ালি নিজের চয়েস লিস্ট সিলেক্ট করে নিতে পারবেন। পরীক্ষার নম্বর বের হওয়ার পর এর ভিত্তিতে মেধাক্রম অনুসারে সাবজেক্ট ও প্রতিষ্ঠানের ডিস্ট্রিবিউশন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই চলে আসবে। নম্বরের গোপনীয়তা আগের মতোই রক্ষা করা যাবে। কেউ যদি একটা মাত্র সাবজেক্টেই পড়তে চান সে সুযোগও থাকবে। এক্ষেত্রে চিকিৎসকদের যোগ্যতার সবচেয়ে যথাযথ মূল্যায়ন হবে বলে আমি মনে করি। (কর্তৃপক্ষ চাইলে আমি সামনাসামনি প্রেজেন্টেশন/সহযোগিতা করতে রাজি আছি। যদিও এর প্রয়োজন পরবে না মনে করি।)

আর ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি সংক্ষিপ্ত ওয়েটিং লিস্টও প্রকাশ করা যেতে পারে। যাতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কেউ ভর্তি না হলে ওয়েটিং লিস্ট থেকে পরবর্তী চিকিৎসকদের মেধাক্রম অনুসারে ভর্তির সুযোগ দেয়া যায়। এর ফলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ অনেকটাই প্রসারিত হবে বলে আমার বিশ্বাস। একেকটা সিট অনেক মূল্যবান। কোনোভাবে একটা সিটও যাতে নষ্ট না হয়, সে চেষ্টা করা জরুরি। একই নিয়ম এমফিল ও ডিপ্লোমা পরীক্ষাতেও কাজে লাগানো যাবে।

উদাহরণ হিসেবে ডা. ইকবালের (ছদ্মনাম) কথা বলে শেষ করছি। ধরুন, তিনি দীর্ঘ একটি সময় নিয়ে গউ রেসিডেন্সি পরীক্ষার জন্য ভালো একটি প্রস্তুতি নিয়েছেন। তার পারিবারিক অবস্থা, বয়স ও আনুষাঙ্গিক অনেক বিষয়ের বিবেচনায় তাঁর লক্ষ্য একটা ভালো বিষয়ে গউ কোর্সে চান্স পাওয়া। সেটা যে বিষয়েই হোক। সাবজেক্টটা এন্ডোক্রাইনোলজি হলে খুব ভালো হয়। কার্ডিওলজি হলেও ভালো। গ্যাস্ট্রো এন্টেরোলজি হলেও হবে; পালমোনলজি হলেও চলে। কিন্তু একটা সাবজেক্টে তার চান্স পেতেই হবে। চিকিৎসকদের এই তীব্র প্রতিযোগিতার সময়ে পোস্ট গ্রাজুয়েশন না করে কিছু করা যাবে না। কিন্তু সমস্যা হলো একাধিক সাবজেক্ট চয়েসের সুযোগ তো নেই।

এখন যদি এমন হয়, পরীক্ষায় প্রায় ১৫৮ (অনুমিত) নম্বর পেয়েও তিনি এন্ডোক্রাইনোলজিতে চান্স পেলেন না। কারণ তুমুল প্রতিযোগিতায় আরও কয়েকজন এর চেয়েও বেশি নম্বর পেয়ে গেলেন। আবার আরেকজন ১৫০ পেয়েও পেয়েও তুলনামূল কম প্রতিযোগিতার অন্য একটি সাবজেক্টে ঠিকই চান্স পেয়ে গেলেন। কিন্তু এন্ডোক্রাইনোলজি চয়েস করার কারণে তিনি প্রতিযোগিতা থেকেই ছিটকে গেলেন। তাহলে সেরা প্রস্তুতি থাকার পরও ডা. ইকবাল কি বঞ্চিত হয়ে যাচ্ছেন না?

তবে কি তার উচিত হবে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পেছনের একটা সাবজেক্টে পরীক্ষা দিয়ে স্থিরতা খোঁজা নাকি নিজের যোগ্যতাকে তুরূপের তাসের মতো ভাগ্যের খেলায় বিনিয়োগ করা?

ব্যাপারটা খুব জটিল না? হ্যা, এই জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন অসংখ্য চিকিৎসক প্রতিবছর, প্রতিটি সেশনে। কর্তৃপক্ষের আরেকটুকু সদিচ্ছাই পারে এই আকাশসমান কনফিউশনের সুন্দর একটি সমাধান আনতে। তবে হ্যা, এর ফলে মেধার প্রতিযোগিতা বাড়বে বৈ কমবে না। তবে দারুণ মেধাবী এই চিকিৎসক সমাজ এ প্রতিযোগিতা উপভোগ করবেন, এটাই স্বাভাবিক। সম্মানিত কর্তৃপক্ষের কাছে এই দুটো সিস্টেম যতো দ্রুত সম্ভব চালু করার অনুরোধ করছি।

(আর্টিকেলটি মেডিভয়েসের জুলাই-আগস্ট ২০১৯ প্রিন্ট সংখ্যায় প্রকাশিত)

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস