মাসঊদ বিন হক

মাসঊদ বিন হক

মেডিকেল শিক্ষার্থী। 


২৫ অগাস্ট, ২০১৯ ১১:০৯ এএম

১০ বছর পর দুঃসাধ্য হয়ে উঠবে অটিজম রোগ নির্ণয়!

১০ বছর পর দুঃসাধ্য হয়ে উঠবে অটিজম রোগ নির্ণয়!

অটিজমে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে। পাশ্চাত্যের মোট জনসংখ্যার শতকরা ১-২ ভাগ মানুষই এ রোগে আক্রান্ত হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। তবে, এখনকার সময়ে ত্রুটিপূর্ণ অধিকমাত্রায় অটিজম নির্ণয় করা হচ্ছে। এ কারণে আগামী ১০ বছরের মধ্যে অটিজমে আক্রান্ত রোগী ও এ থেকে মুক্ত অপেক্ষাকৃত সুস্থ রোগীর মধ্যে পার্থক্য করা দুঃসাধ্য হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

জানা গেছে, ব্রিটেনে প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ১ জন অটিজমে আক্রান্ত হচ্ছে বলে বিবেচনা করা হয় এবং ১৯৬০ থেকে আজ অবধি এর হার ২০ গুন বেড়েছে।

কিছু গবেষক আধুনিক জীবন যাত্রার আড়ষ্টতাকে এর কারণ হিসেবে দাঁড় করানো যায় কিনা সে বিষয়ে গবেষণা করছেন। তবে, কানাডা ও কোপেনহেগেনে অবস্থিত মন্ট্রিয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, অটিজম নির্ণয়ের প্যারামিটারগুলোর পরিসর গত ৫০ বছরে ব্যাপক হারে সুস্থতার দিক বরাবর নিচের দিকে নেমেছে। আর যদি এমন চলতে থাকে তাহলে ২০২৯ সালের মধ্যে এই রোগে আক্রান্ত মানুষ ও এ থেকে মুক্ত 'রোগী প্রতিপন্ন' সুস্থ মানুষের মধ্যে পার্থক্য করা যাবে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন গবেষকগণ। 

মন্ট্রিয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যক্ষ প্রফেসর লারেন্ট মটরোন (Laurent Mottron) বলেন, "যদি এরকম ধারা অব্যাহত থাকে তাহলে আগামী ১০ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে অটিজমে আক্রান্ত মানুষ এবং সাধারন সুস্থ জনসাধারণের মধ্যে বস্তুগত পার্থক্য বিলুপ্ত হয়ে যাবে"

তিনি বলেন, “অটিজমের সংজ্ঞা অর্থপূর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে খুব বেশি ঘোলাটে হয়ে উঠবে। কারণ, এমন মানুষদেরকে অটিস্টিক হিসেবে ধরে নেয়া হচ্ছে যাদের সাথে সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের পার্থক্য খুব একটা উল্লেখযোগ্য নয়।”

গবেষণাটি ১৯৬৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত অটিজম হিসেবে নির্ণিত হওয়া ২৩০০০ জন মানু্ষের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত নির্ণায়ক মাণদন্ড (diagnostic criteria) নিয়ে পর্যালোচনা করে।

অটিজমের রোগ-নির্ণয় কিছু মানসিক (psychological) ও স্নায়ুবিক (neurological) পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে করা হয়ে থাকে, যেখানে দেখা হয় যে একজন মানুষ মানবীয় আবেগ ও উদ্দেশ্যকে কিভাবে মূল্যায়ন করতে পারে, তারা কিভাবে একটা কাজ থেকে আরেকটা কাজে মনোনিবেশ করতে পারে, কাজের পরিকল্পনা, নিজেকে নিবারন, মস্তিষ্কের আয়তন এবং উদ্দীপনায় সাড়া প্রদান ইত্যাদি।

গবেষক দলটি খুঁজে বের করেছেন যে, বিগত সময়গুলোতে অটিজমে আক্রান্ত মানুষ ও সুস্থ মানুষের মধ্যে পরিমাপযোগ্য পার্থক্য শতকরা ৮০ ভাগের নিচে নেমে এসেছে। যদিও, রোগ নির্ণয়ের মানদণ্ড একই রয়ে গেছে তবুও মানদণ্ডগুলো ব্যাখ্যা করার পদ্ধতিগুলো চিকিৎসকদের কাছে ব্যবহারিক ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।

প্রফেসর মটরোন বলেন, "৫০ বছর আগে 'অন্যদের প্রতি স্পষ্ট অনাগ্রহ' অটিজমের একটা উপসর্গ ছিলো, কিন্তু বর্তমান সময়ে একে 'অন্যদের তুলনায় কম বন্ধু থাকা' অর্থই বোঝানো হচ্ছে। চারপাশের মানুষের প্রতি আগ্রহ থাকার বিষয়টিকে বিভিন্ন উপায়ে পরিমাপ করা যায়, যেমন চোখে চোখ রেখে কথা বলা বা যোগাযোগ করা। কিন্তু অধিকতর লাজুক হওয়ার কারণেও কিছু মানুষ এরকম না করে অন্যত্র তাকিয়ে যোগাযোগ ও কথা বলা চালিয়ে নিতে পারেন, যা অটিজমের উপসর্গ নয়। 

গবেষকগণ মনে করেন, ত্রুটিপূর্ণ অধিক রোগ নির্ণয়ের ঘটনা ঘটেছে একারনে যে নির্ণয় ব্যতীত চিকিৎসা প্রদান এবং সাহায্য করার বিষয়টি অনেকসময় চিকিৎসকের জন্য কঠিন যা নির্ণয়ের ব্যর্থতার জন্য বিপদজনক হয়ে উঠতে পারে। এছাড়াও, এ নিয়ে কাজ করা লবিস্টরা এ বার্তা প্রচার করেছে যে, "আগে ভাগে রোগ নির্ণিত হওয়া এবং চিকিৎসা হওয়াটা কল্যাণকর "

প্রফেসর মটরোন আরও বলেন, "কিছু মানসিক রোগবিশেষজ্ঞ অন্যান্য বুদ্ধিবৃত্তিক জটিলতা অথবা ব্যক্তিত্বজনিত রোগ নির্ণয়ের চেয়ে অটিজম রোগ নির্ণয় করাকে বেশি সহজসাধ্য ও ঝামেলাহীন মনে করেন।"

সকল অটিজমের রোগী একে অপরের চেয়ে আলাদা। কিন্তু প্রত্যেকেই সমাজের অন্যদের সাথে যোগাযোগ ও সামাজিক অংশগ্রহণে সমস্যায় পড়েন। 

"পেশাজীবি চিকিৎসকগণ এবিষয়ে আরো সচেতন হচ্ছেন, তবুও আরো বেশি সতর্ক হবার শুন্যস্থান রয়ে গেছে বলে মনে করি, বিশেষ করে মহিলা ও কমবয়সী মেয়েদের ব্যাপারে "

গবেষক দলটি অটিজমের পাশাপাশি সিজোফ্রেনিয়ার রোগ নিয়েও একই গবেষণা চালিয়েছিলেন। তারা এক্ষেত্রে খুঁজে পেয়েছেন যে, সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি ও সুস্থ স্বাভাবিক ব্যক্তির মধ্যে পার্থক্য খুবই স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট এবং সুস্থতা ও অসুস্থতার মাপকাঠির পরিসর আরো উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে যা রোগ নির্ণয়ের জন্য কল্যানকর। 

(গবেষণা নিবন্ধটি "Jama psychiatry" জার্ণালে ছাপা হয়েছিলো)

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত