ডা. সুরেশ তুলসান

ডা. সুরেশ তুলসান

সহকারী অধ্যাপক (সার্জারি), কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ।


২১ অগাস্ট, ২০১৯ ১০:৫৬ এএম

বেসরকারি মেডিকেলে ভর্তি প্রক্রিয়া ও কিছু প্রস্তাবনা

বেসরকারি মেডিকেলে ভর্তি প্রক্রিয়া ও কিছু প্রস্তাবনা

কিছুদিন পরেই সকল সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজসমূহে ভর্তি পরীক্ষা। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের সাথে সাথে কখন যে চোখের নিমিষেই চিকিৎসা শিক্ষার মত বিষয়টাও হঠাৎ করেই বাজারের পণ্যে পরিণত হয়ে গেল আমরা বুঝতেও পারলাম না। যখন বোধোদয় হলো ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

আমরা প্রতিবাদ করে ছিলাম, কিন্তু রুখতে পারলাম না এবং একসময় অবশেষে মেনেই নিলাম। অনেকটা অপ্রিয় কোন কিছুতে বাধা দিতে পারার ক্ষমতা না থাকার কারণে সেই অপ্রিয় বিষয়টাকেই উপভোগ্য করে তোলার মত অবস্থা।

সেদিন আমরা যারা প্রতিবাদ করে ছিলাম আজ তাদের অনেকেরই আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, সন্তান-সন্ততি, তথা অনেক নিকটজনই এখন বেসরকারি মেডিকেল থেকে পাশ করা ডাক্তার। আর বেসরকারি মেডিকেল থেকে পাশ করা অনেক ডাক্তারই এখন চিকিৎসাশাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জনসহ সুনামের সাথে নিজ পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে দেশে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছেন।

তাই নিঃসন্দেহে বলাই যায়, বেসরকারি মেডিকেল কলেজসমূহ আমাদের চিকিৎসা শিক্ষা ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য না হলেও অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়েছে। এখনতো অনেক বেসরকারি মেডিকেল কলেজে উচ্চতর ডিগ্রীরও সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বেসরকারি মেডিকেল কলেজসমূহ চালু হওয়ার পর থেকে অনেকদিন পর্যন্ত তারা নিজেরাই নিজেদের মত করে ভর্তি পরীক্ষা নিত।

ভর্তিচ্ছুদের সংখ্যা আসনের তুলনায় বেশী হলে বিভিন্ন প্রকার অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, মেধাক্রম না মানা, বছর বছর ভর্তি ফি বৃদ্ধি, বিভিন্ন খাত, অজুহাতের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় ইত্যাদির অভিযোগ ছিল নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার। এছাড়াও ভর্তিচ্ছুদের সংখ্যা আসনের তুলনায় কম হলে বারবার ভর্তির আবেদনের তারিখ ও ভর্তি পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তন, একাধিকবার ভর্তি পরীক্ষা নেয়া, একজন-দুজনের জন্য টোকেন পরীক্ষা নেয়া। এমনকি "First come first service basis" অর্থাৎ আগে আসলে আগে পাইবেন (ভর্তি হইবেন) ইত্যাদি। ভর্তি ফি/ টিউশন ফি -এসব ক্ষেত্রেও বিভিন্ন রকম ছাড়/ অফার/ কিস্তি সুবিধা। সকল ক্ষেত্রেই সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ভর্তির জন্য নূন্যতম মানদণ্ড বজায় রাখা ছাড়া অন্য কোন স্ট্যান্ডার্ড না মানার অভিযোগ।

দিনে দিনে বেসরকারি মেডিকেল কলেজের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে এবং বেসরকারি মেডিকেলগুলো নিজেদের মত করে ভর্তি পরীক্ষা নেয়ায় দেখা দিল নুতন নুতন বিপত্তি। দেশে কোথায়, কতগুলো বেসরকারি মেডিকেল কলেজ আছে, কোনটা বৈধ, কোনটা অবৈধ, বিএমডিসি অনুমোদন আছে কি নাই ইত্যাদির খোঁজ-খবর রাখা, কবে কোথায় আবেদনপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন, কবে কোথায় ভর্তি পরীক্ষা ইত্যাদি বেশ ঝামেলা।

এছাড়া প্রত্যেকটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে আলাদা আলাদা আবেদন পত্র পাঠানো, এক কলেজ থেকে আরেক কলেজ ঘুরে ঘুরে ভর্তি পরীক্ষা দেয়া অভিভাবক এবং ছাত্র- ছাত্রীদের জন্য বড়ই বিড়ম্বনার বিষয় হয়ে দাঁড়ালো। তা ছাড়া জায়গায় জায়গায় ভর্তি ফরমের মূল্য, পরীক্ষা ফি, ভ্রমনব্যয়, সময়ের অপচয়, ভ্রমনের ঝুঁকি ইত্যাদি তো আছেই।

এ অবস্থায় বেসরকারি মেডিকেল কলেজ সমূহের ছাত্রছাত্রী ভর্তি প্রক্রিয়া নিয়ে কিছু প্রস্তাবনা-

১. একই সময়ে একই দিনে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে সকল - বেসরকারি মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি বহাল  থাকবে।

২.ভর্তি পরীক্ষার আবেদনের সময় সকল সরকারি, বেসরকারি মিলিয়ে পছন্দক্রম দেয়ার সুযোগ থাকতে হবে। তা হোক না তা লম্বায় কয়েকশো, আজকের ডিজিটাল যুগে এটা কোন দাপ্তরিক সমস্যা হবে বলে মনে হয় না।

৩. একজন শিক্ষার্থী কোন বেসরকারি মেডিকেলে ভর্তি হবে সেটা যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে হবে। দামের তারতম্যের এবং দাম দেওয়ার সক্ষমতার ভিত্তিতে নয়।

৪. চিকিৎসা শিক্ষার বাণিজ্যিককরণ মেনে নিতেই অনেক কষ্ট হয়েছে আমাদের। দাম ও দাম দেওয়ার সামর্থের ভিত্তিতে মানের তারতম্য কোনভাবেই মেনে নেয়া যাবে না।

৫. সকল বেসরকারি মেডিকেলের ভর্তির ক্ষেত্রে কলেজ পছন্দ অবশ্যই মেধার ভিত্তিতে হতে হবে এবং কে, কোন বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হবে সেটা সরকারি মেডিকেল কলেজের মত করেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলে উল্লেখ থাকবে।

৬. অপেক্ষমাণ তালিকা হতে ভর্তি এবং পরবর্তীতে অটোমাইগ্রেশন অবশ্যই সরকারি মেডিকেল কলেজসমূহের মত একই নিয়মে হতে হবে।

৭. কোন একজন শিক্ষার্থী কোন একটি বেসরকারি মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার পর অপেক্ষমাণ তালিকা হতে কোন সরকারি মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পেলে তার ভর্তির সময় জমাকৃত সমুদয় টাকা ফেরত দিতে হবে।

৮. অনুরূপভাবে একজন শিক্ষার্থী কোন একটি বেসরকারি মেডিকেলে ভর্তির হওয়ার পর তার পূর্ববর্তী পছন্দের কোন বেসরকারি মেডিকেলে ভর্তির যোগ্য বিবেচিত হলে তাকে মাইগ্রেশনের সুযোগ দিতে হবে। এবং তার ভর্তিকৃত কলেজে জমাকৃত সব টাকা তার মাইগ্রেশনকৃত নুতন কলেজে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করতে হবে।

৯. সকল বেসরকারি মেডিকেলে ভর্তি ও আনুষঙ্গিক খরচ অবশ্যই সমান এবং সরকার কর্তৃক নির্ধারিত হারে হতে হবে।

১০. সরকার যদি মনে করে কোন বেসরকারি মেডিকেল কলেজ মান সম্পন্ন নয় এবং কোনভাবেই মানের উন্নতি করা যাচ্ছে না। তাহলে কম দামে বাজারজাত করার চাইতে সেই কলেজকে বন্ধ করে দিতে হবে।

১১. সরকার ইচ্ছে করলে বেসরকারি মেডিকেল কলেজসমূহের কিছু আসন টাকা দিয়ে কিনে নিতে পারে। আর এসব আসনে জাতীয় মেধা তালিকা থেকে প্রকৃত মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি হয়ে সরকারি মেডিকেলের মত অল্প খরচে পড়াশোনা করতে পারবে। একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন করে এমবিবিএসের আসনপ্রতি সরকারের যত টাকা খরচ হয়, এই পদ্ধতিতে আসন প্রতি সরকারের ব্যয় তার চাইতে অনেক কম হবে।

উপরন্ত এই পদ্ধতির ফলে শুধুমাত্র বাপের টাকায় যোগ্যতা এবং মেধার চরম ঘাটতি থাকা স্বত্বেও যে সকল ছাত্রছাত্রী বেসরকারি মেডিকেলে ভর্তি হবে, তারা সরকারের ক্রয়কৃত এই সকল আসনে ভর্তিকৃত কিছু প্রকৃত মেধাবী ছাত্রছাত্রীদেরকে সহপাঠী হিসাবে পাবে। চিকিৎসা শিক্ষার ক্ষেত্রে একজন ভালো মানের মেধাবী সহপাঠীর গুরুত্ব কিন্তু অপরিসীম। 

আমি হলফ করে বলতে পারি,  চিকিৎসা শিক্ষার ক্ষেত্রে একজন শিক্ষার্থী ক্লাসে শিক্ষকদের কাছ থেকে যতখানি জ্ঞান লাভ করে, তার প্রায় সমানই অথবা কোন কোন ক্ষেত্রে বেশী জ্ঞান লাভ করে ভাল মেধাবী সহপাঠীদের কাছ থেকে।

 

১২. বিদেশী কোটায় শুধুমাত্র বিদেশী ছাত্র-ছাত্রীই ভর্তি করতে হবে। যদি কোন কারনে দেশী ছাত্র ভর্তি করতে হয় তবে তা অবশ্যই মেধাক্রম মেনে করতে হবে, এবং কোনভাবেই অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা যাবে না।

১৩. কোনো বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ভর্তি সংক্রান্ত কোনো আলাদা বিজ্ঞাপন দিতে পারবে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জারিকৃত বিজ্ঞাপনে সকল সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজের তালিকা ও তথ্য দেয়া থাকবে। ফলে চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত হওয়ার আর কোনো সুযোগ থাকবে না।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত