ঢাকা      বুধবার ১৮, সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ৩, আশ্বিন, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

বিভাগীয় প্রধান, প্যাথলজি,

শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ।


ভিআইপি রোগী

এমবিবিএস পাস করে কেবল ১৯৮৫ সনের নভেম্বর মাসে ইন-সার্ভিস ট্রেইনিং শুরু করেছি। চাকরির নিয়ম কানুন কিছুই শেখা হয়নি। ফাউন্ডেশন ট্রেইনিংয়ের সময় চাকুরি বিধি ভালো করে শেখানো হয়। এমবিবিএস পড়ার সময় পরীক্ষা পাসের জন্য যেটুকু জানা দরকার তা শিখেছিলাম। রোগী ম্যানেজমেন্টের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করার জন্য হাসপাতালে ক্লিনিক্যাল এসিস্টেন্টের সাথে ডিউটি করে ইন-সার্ভিস ট্রেইনিং করা হতো। এখন ক্লিনিক্যাল এসিস্টেন্ট (সিএ)-কে এসিস্টেন্ট রেজিস্ট্রার এবং ইন-সার্ভিস ট্রেইনিংকে ইন্টার্নি বলা হয়।

আমি ডক্টরস ডিউটি রুমে বড় ভাইদের কথাবার্তা শুনছিলাম। তারা এক রোগীর খারাপ ব্যবহার নিয়ে সমালোচনা করছিলেন। আমি জানতাম ট্রেইনিংয়ের সময়ই সব শিখে যেতে হবে। রেগুলার মেডিকেল অফিসার হিসাবে যখন কাজ করব তখন আর শেখার সুযোগ থাকবে না। আমি সিএকে জিজ্ঞেস করলাম- কে খারাপ ব্যবহার করেছে?

- এক ভিআইপি।

- ভিআইপির ফুল মিনিং কি?

- ভেরি ইম্পোর্টেন্ট পারসন।

আমি বুঝে নিলাম খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন লোক। এটা না বুঝার কিছু নেই। খুব গুরুত্বপূর্ণ লোক। আমি আরও লক্ষ করলাম কেবিনের রোগীর দায়িত্ব কোন ট্রেইনি নিতে চায় না। কেবিনের রোগীরা নাকি সাধারণত খারাপ ব্যবহার করে। উপদেশ মানতে চায় না। আমি কেবিনের ডিউটি নিতে অনিহা প্রকাশ করলাম না। দেখি কিভাবে খারাপ ব্যবহার করে। খারাপ ব্যবহার পাওয়ার অভিজ্ঞতা হোক। খারাপ রোগী ম্যানেজ করার অভিজ্ঞতা হোক। সামনে ভিআইপি লিখা একটা কেবিন ছিল। এই কেবিনে আমার ডিউটি পড়ল। রোগী মহিলা ছিলেন। আমি লক্ষ করলাম এই ভিআইপি রোগী আমার সাথে কোন খারাপ ব্যবহার তো দুরের কথা অত্যন্ত ভালো ব্যবহার করতেন। এমনকি রোগী আমাকে স্যার ডাকতেন। অথচ আমি একজন নবীন ডাক্তার। ছাত্র থেকে মাত্র ডাক্তার হয়েছি।

রোগীর স্বামী একটা ভাব গাম্ভীর্যতা নিয়ে বারান্দায় চেয়ারে বসে পত্রিকা অথবা গল্পের বই পড়তেন। আমার সাথে তার কথা হয়নি। কিন্তু প্রেফেসর স্যার তার সাথে অনেক কথা বলেছেন। আমি স্যারকে জিজ্ঞেস করেছি- স্যার, ইনি কে?

- ইনিই ভিআইপি। অনেক দিন আগে মন্ত্রী ছিলেন। খুব ভালো লোক। রোগীর প্রতি খেয়াল রাখবে, ভিআইপি কিন্তু!

- আচ্ছা, স্যার।

আমি যখন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে পড়তাম তখন আমাদের প্রাক্তন কয়েকজন ক্লাসমেট বাংলাদেশ এগ্রিকালচার ইউনিভার্সিটিতে (কৃষি ভার্সিটি) পড়তেন। আমরা মাঝে মাঝে বন্ধুদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করতে যেতাম। ভার্সিটির পার্কে ঘুরতাম, ব্রহ্মপুত্র নদে নৌবিহার করতাম। ওখানে এক বড় ভাইয়ের সাথে পরিচয় হয়েছিল। বাড়ি ছিল তার কালিহাতি। আমার দাদাবাড়িও কালিহাতি হওয়ায় তার সাথে আমার বেশ ঘনিষ্ঠতা হয়। তার ব্যবহার খুব সুন্দর ছিল। আমাকে দেখলেই তিনি মিষ্টি হাসি দিয়ে কথা বলতেন। তিনি তখনকার শক্তিশালী এক ছাত্র সংগঠনের সভাপতি ছিলেন। চেহারায় তার ছাত্রনেতার ভাব ছিল।

আমি সন্ধায় ডিউটি করছিলাম। আমার ইউনিটের সিএ সেদিন খুব সম্ভব ছুটিতে ছিলেন। প্রফেসর ডা. কাজল কান্তি চৌধুরী ছিলেন সার্জারির রেজিজিস্ট্রার। তিনি ছিলেন সার্জারিতে সদ্য এফসিপিএস করা। এম-১০ ব্যাচের। আমাদের সকলের প্রিয় কাজল দা। কাজলদা খুব দক্ষ সার্জন ছিলেন। কেউ ঠেকে গেলে ডাক পড়তো কাজল দার। কাজল দা সব ইউনিটের রোগী এটেন্ড করতেন। খুব কর্মঠ ছিলেন। আমি কাজল দার আন্ডারে ৬ মাস সার্জারিতে বিশেষ ট্রেইনিং নিয়েছিলাম।

যাহোক, সন্ধায় আমার ডিউটির সময় ভার্সিটির সেই ছাত্র সংগঠনের সেই সভাপতি রাম দায়ের কয়েকটি কোপ খেয়ে চিকিৎসার জন্য এলেন। আমরা উভয়ে উভয়কে চিনতে পেলাম। দলে দলে ছাত্র প্রবেশ করলো সার্জারি ওয়ার্ডে। একটু উল্টাপাল্টা কিছু মনে হলে তারা যে কোন মুহুর্তে ভাঙচুর শুরু করতে পারে। আগের দিনে কেউ ডাক্তারের গায়ে হাত তোলতো না। ভাগ্নের গায়েও কেউ হাত তোলতো না। মানুষ মনে করতো ভাগ্নের গায়ে হাত তোললে বৃদ্ধকালে হাত কাপে। ডাক্তারদের গায়েও হাত দিতো না। কি ভেবে হাত দিত না তা জানি না। বিক্ষুব্ধ হলে বড় জোড় কিছু কাঁচের জানালা ভাঙ্গা হতো আঘাত করে। আমি ভয় পেয়ে কলবুকে কাজল দাকে কল দিলাম। কাজল দা হাসপাতাল কোয়ার্টারেই থাকতেন। কল খাতায় লিখেছিলাম "স্যার, একজন ভিআইপি রোগী এসেছেন মারাত্মক আঘাত নিয়ে। তাড়াতাড়ি আসুন।"

সাথে সাথে কাজল দা এলেন। আমরা এটেন্ডেন্টদের হৈ-হোল্লার জন্য কাজ করতে পারছিলাম না। কাজল দা আমাকে রুমে নিয়ে বললেন- এটেন্ডেন্ট সরাতে হবে।

-কিভাবে সরাব? ছাত্ররা কোন কথা শুনে না। এগ্রিভার্সিটির ছাত্র।

- তারা ফ্যামিলির কেউ না। এই রকমই করবে। সরানো খুব সোজা। তুমি কয়েকজনের হাতে রক্তের স্লিপ ধরিয়ে দিয়ে বলবে 'রুগীর অনেক রক্তক্ষরণ হয়েছে। অনেক রক্তের প্রয়োজন। আপনারা রক্ত সংগ্রহ করেন। দেখবে একে একে সব সরে যাবে'। " আমি তাই করলাম। প্রায় সব ছাত্র সরে পড়লো রক্ত হারানোর ভয়ে। কারন, তারা কেউ রুগীর আপন ছিল না। ওটিতে নিয়ে গেলাম। ছাত্রনেতা বড় ভাই আমার চোখের দিকে করুণ দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে রইলেন। আমি তাকে নির্ভয়ে থাকতে বললাম।

রুগী ম্যানেজ করে কাজল দা আমাকে নিয়ে রুমে বসলেন। তিনি বললেন- কল লেখেছে কে?

- আমি লিখেছি, দাদা।

- রোগী ভিআইপি লিখেছেন কেন?

- রোগী তো ভিআইপিই।

- কেমনে? সে তো ছাত্র। ছাত্র ভিআইপি হয় কেমনে?

- তিনি আমার দেশী। পরিচিত এবং আমার বড় ভাই এবং আমার সাথে তার ঘনিষ্ঠতা আছে। তিনি একটা ছাত্র সংগঠনের সভাপতি। তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ লোক।

- ঠিক আছে। আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সে তো ভিআইপি না।

- ভিআইপির ফুল মিনিং তো ভেরি ইমপোর্টেন্ট পারসন।

কাজল দা একটু হেসে বললেন "সবাই ভিআইপি না। ভিআইপি সরকার কর্তৃক নির্ধারিত সুযোগ সুবিধাপ্রাপ্য বিশেষ ব্যক্তি। তোমার কাছে ভেরি ইম্পোর্টেন্ট মনে হলেও যে কেউ ভিআইপি না। ভিআইপি হতে কিছু ক্রাইটেরিয়া লাগে।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এক্সাম ফোবিয়া ও ডিপ্রেশন: মুক্তির সহজ সমাধান

এক্সাম ফোবিয়া ও ডিপ্রেশন: মুক্তির সহজ সমাধান

প্রশ্ন: স্যার আমি মেডিকেলের ৩য় বর্ষের ছাত্রী। মেডিকেলে ইতিমধ্যেই ১ বছর লস…

ডাক্তাররা রোগের চিকিৎসা করে, মৃত্যুর নয়

ডাক্তাররা রোগের চিকিৎসা করে, মৃত্যুর নয়

: ব্যাটসম্যানদের ভুলে আজ খেলাটা চলে গেল! : ভুল বলছেন কেন? বল…

সন্তানের থ্যালাসেমিয়ার জন্য পিতা-মাতার অজ্ঞতাই দায়ী!

সন্তানের থ্যালাসেমিয়ার জন্য পিতা-মাতার অজ্ঞতাই দায়ী!

সিএমসি, ভেলোরে আমি যে রুমে বসে রোগী দেখছি সেখানে ইন্ডিয়ার অন্যান্য রাজ্যের…

আনিসের প্রত্যাবর্তন 

আনিসের প্রত্যাবর্তন 

রাস্তায় একজনের মুখে সরাসরি সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে দিলো আনিস। আচমকা এ আচরণে…













জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর