ঢাকা      বুধবার ১৮, সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ৩, আশ্বিন, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. রাজ কামাল আহমেদ

অর্থোসার্জারি রেসিডেন্ট, বিএসএমএমইউ, শাহবাগ, ঢাকা

মেডিকেল অফিসার, বিসিএস (স্বাস্থ্য)

সাবেক শিক্ষার্থী, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ। 


স্বাস্থ্যখাতে নৈরাজ্য সৃষ্টির পাঁয়তারা ‘অশনিসংকেত’

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সৈন্যের সংখ্যা বিশ্বে তৃতীয়! অথচ জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে কোনো বাংলাদেশি নেই! বিশ্বের পরাশক্তি দেশগুলোর সেনারা নিজেদের দেশের নিরাপত্তা রক্ষা ও সমরাস্ত্র চর্চায় ব্যস্ত! আর আমাদের সেনাবাহিনী ভিনদেশে শান্তিরক্ষায় ব্যস্ত। 

পাশ্চাত্যে বিজ্ঞানীরা ব্যস্ত নিত্য নতুন প্রযুক্তি তৈরিতে! আমাদের বিজ্ঞানীরা ব্যস্ত পানি দিয়ে কিভাবে সাইকেল চালানো যায়, ভুষি দিয়ে কিভাবে বাতি জ্বালানো যায়—এসব উদ্ভাবনে! 

তাদের শিক্ষাবিদগণ নতুন নতুন জীবনমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলন করেন! আর আমাদের শিক্ষাবিদগণ ভুলেভরা টেক্সটবই রচনা করে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মাঝে তা বিতরণ করে ভুল শিক্ষা দেবার কাজে ব্যতিব্যস্ত থাকে! আমাদের দেশে ছাত্রছাত্রীদের সৃজনশীল প্রশ্ন চাপিয়ে দিয়ে কোচিং ব্যবসাকে উৎসাহী করা হয়! প্রশ্নপত্রে সানি লিওন আর মিয়া খলিফার মতো পর্ণোতারকার নাম উল্লেখ করা হয়! বছর বছর ভুরি ভুরি এ প্লাস বের করে শিক্ষাব্যবস্থার বারোটা বাজানো হয়! 

আর উন্নত বিশ্বে শিক্ষার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি দেয়া হয়। ইউরোপ আমেরিকার দেশগুলো যখন শিল্পে উন্নত থেকে উন্নততর হচ্ছে, তখন এ দেশের শিল্প ধ্বংসের জন্য আমাদের দেশের শিল্পের নীতিনির্ধারকরা বিদেশিদের সঙ্গে যৌথভাবে আমাদের শিল্পকে ধ্বংসের জন্য উঠেপড়ে লাগে। প্রমাণস্বরূপ বলতে পারি, পাটশিল্প ধ্বংস হয়েছে সেই কবেই! এখন পাটকলগুলো বেকার পড়ে আছে, কোনো কোনোটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। 

এককালে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শীর্ষে ছিল। বিভিন্ন পাশা খেলায় সেই পোশাক শিল্পের লাগাম এখন ভিনদেশিদের হাতে, শুধু কলকারখানা এদেশের। আর স্বল্প পারিশ্রমিকের বিনিময়ে পাওয়া শ্রমিকদের ঘাম নিংরানো শ্রমে তারা ডলারের এভারেস্ট গড়ছে। এই রকম বোকাসোকা পরিশ্রমী শ্রমিক তাদের দেশে পাওয়া যায় না। পর পর কয়েকবার কোরবানির ঈদে চামড়ার দাম কমাতে ব্যস্ত সিন্ডিকেট তৎপর ছিল।

এবারের কোরবানি ঈদের কাঁচা চামড়ার সীমাহীন দর পতনে জাতির কাছে পরিষ্কার হয়েছে যে সেই সিন্ডিকেট চামড়া শিল্পকে ধ্বংসের পাঁয়তারায় রয়েছে! এবং তারা যে অনেকাংশে সফল হয়েছে তা আর না বললেও চলে।

দেশের মাতৃমৃত্যু হার ও শিশুমৃত্যুহার গত দুই দশকে ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে; দেশের মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে। এমডিজি-৪ বাস্তবায়নে দেশের স্বাস্থ্যসেক্টর পুরোপুরি সফল হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সাউথসাউথ অ্যাওয়ার্ড লাভ করেছেন। সবই হয়েছে মাঠপর্যায়ের চিকিৎসকদের অক্লান্ত পরিশ্রমের জন্য।  অথচ দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলতা সৃষ্টির জন্য একটা কুচক্রীমহল নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তা তো স্পষ্টই। ডাক্তারদের কর্মস্থল নিরাপদ নয়। ভুয়া ডাক্তার দিয়ে দেশ সয়লাব। ডাক্তারদের নিয়ে সাংবাদিকদের মিথ্যাচার আর ভারতীয় ডাক্তারদের অবিরাম প্রশংসা, এমনকি এই দেশে তাদের রোগী দেখার বিজ্ঞাপন প্রকাশ—নিঃসন্দেহে এসব অশনিসংকেত? ধামাধরা সুশীল সমাজ আর রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও বসে নেই ডাক্তারদের নিরন্তর সমালোচনায়। অথচ উন্নত বিশ্বে ডাক্তারদের কত সম্মান দেয়া হয়! এ রকম চলতে থাকলে দেশের রত্ন ভবিষ্যৎ ডাক্তারেরা ভিনদেশে পাড়ি জমাবেন সন্দেহ নেই। তখন দেশের মানুষকে সেবা দিবে কোয়াক, কবিরাজ, ভুয়া ডাক্তার আর ভারতে পসার জমাতে না পারা তথাকথিত ভারতীয় ডাক্তার।

উন্নত দেশ তো বটেই এমন কি ভুটান মালদ্বীপের শহরের এভিনিউগুলো দেখলেও বোঝা যায়, তাদের নগর পরিকল্পনাবিদরা কতটা পারদর্শী! আর আমাদের রাজধানী ঢাকার প্রধান প্রধান সড়ক দেখলেই বুঝবেন, আমাদের নগরপরিকল্পনাবিদরা কতটা শান্তিতে আছেন! বসে বসে ঘুমানো, আর মাস শেষে বেতন তোলা ছাড়া বোধ করি তাদের আর কোনো কাজ নেই। বৈদ্যুতিক তার, স্যাটেলাইটের তার, টিএন্ডটির তার, ইন্টারনেটের তার—সব তার মিলিয়ে তারে তার জড়িয়ে জঙ্গল হয়ে ঝুলে আছে রাস্তার দুই ধার দিয়ে। ফুটপাত তৈরিতেও তাদের কোনো ভূমিকা আছে বলে মনে হয় না! 

ড্রেনেজ ব্যবস্থার হতশ্রী অবস্থা বোঝা যায় একটু বৃষ্টি হলেই। নগরীর সড়কগুলোতে তখন পানি জমে প্লাবন হয়ে যায়! উন্নত বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা পাঠদান আর গবেষণায় ব্যস্ত, আামাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগ শিক্ষক গবেষণার বরাদ্দকৃত অর্থ লোপাট করে ভিনদেশি গবেষণার কপি পেস্ট করতে ব্যস্ত, আর ব্যস্ত ছাত্রীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার কাজে! 

অন্যদেশের বুদ্ধিজীবী আর সুশীল সমাজ তাদের দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য রাজনীতি সমাজনীতি অর্থনীতি কূটনীতি প্রভৃতি বিষয়ক গবেষণা ও পরামর্শ প্রদান করে যাচ্ছে, আর আমাদের তথাকথিত বুদ্ধিজীবী আর ধামাধরা সুশীল সমাজ সাম্প্রদায়িকতা আর অসাম্প্রদায়িকতার মধ্যে পার্থক্য গবেষণা করতে আর সংখ্যালঘুর তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে মহাব্যস্ত!

রবি ঠাকুর তো এমনি এমনি বলেননি, 
“সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী
রেখেছো বাঙালি করে
মানুষ করনি!”

 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এক্সাম ফোবিয়া ও ডিপ্রেশন: মুক্তির সহজ সমাধান

এক্সাম ফোবিয়া ও ডিপ্রেশন: মুক্তির সহজ সমাধান

প্রশ্ন: স্যার আমি মেডিকেলের ৩য় বর্ষের ছাত্রী। মেডিকেলে ইতিমধ্যেই ১ বছর লস…

ডাক্তাররা রোগের চিকিৎসা করে, মৃত্যুর নয়

ডাক্তাররা রোগের চিকিৎসা করে, মৃত্যুর নয়

: ব্যাটসম্যানদের ভুলে আজ খেলাটা চলে গেল! : ভুল বলছেন কেন? বল…

সন্তানের থ্যালাসেমিয়ার জন্য পিতা-মাতার অজ্ঞতাই দায়ী!

সন্তানের থ্যালাসেমিয়ার জন্য পিতা-মাতার অজ্ঞতাই দায়ী!

সিএমসি, ভেলোরে আমি যে রুমে বসে রোগী দেখছি সেখানে ইন্ডিয়ার অন্যান্য রাজ্যের…

আনিসের প্রত্যাবর্তন 

আনিসের প্রত্যাবর্তন 

রাস্তায় একজনের মুখে সরাসরি সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে দিলো আনিস। আচমকা এ আচরণে…













জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর