ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯, ৭ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ১ ঘন্টা আগে
ডা. শুভ প্রসাদ

ডা. শুভ প্রসাদ


লেখক, অর্থোপেডিক্স বিশেষজ্ঞ।


১৪ অগাস্ট, ২০১৯ ১৬:১২

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থোপেডিক হাসপাতাল নিটোরের গল্প

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থোপেডিক হাসপাতাল নিটোরের গল্প

সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় নিটোর নিয়ে কিছু কথা উঠেছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থোপেডিক হাসপাতালটির বিশাল কর্মযজ্ঞ সমন্ধে সাধারণ মানুষতো বটে অনেক চিকিৎসকেরই সঠিক ধারণা নেই। অনেকের বরং রয়েছে ভুল ধারণা। তারই বিরূপ প্রতিক্রিয়া মাঝে মাঝে সোশ্যাল মিডিয়ায় উঠে আসে। 

আমার এ লেখায় নিটোর সম্পর্কে একেবারে ফার্স্টহ্যান্ড কিছু অভিজ্ঞতা এবং তথ্য তুলে ধরার চেষ্টা করবো।

নিটোর-পঙ্গু হাসপাতাল নামে পরিচিত হাসপাতালটা যেনো সকলের চক্ষুশূল। অথচ জাতির জনকের স্বপ্নের এই হাসপাতালটি যেটির শুরু যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য একমাত্র জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল হিসেবে অর্থোপেডিক্স চিকিৎসার মানউন্নয়নে ব্রতী আছে জন্মলগ্ন থেকে।

পঙ্গু হাসপাতালে কর্মব্যস্ততা শুরু হয় সকাল ৭ টা থেকেই৷ প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে সাড়ে ৯টার মর্নিং সেশানে পরদিনের ওটি হওয়া প্রত্যেকটা রোগী সম্পর্কে রেসিডেন্টরা প্রেজেন্ট করেন, সেশানে উপস্থিত সকল ডাক্তার অপারেশনটা কিভাবে করলে ভালো হবে সেই নিয়ে ডিসকাশন করেন। নিটোরের মর্নিং সেশান কোন খোলা তারিখে অফ থাকে না। ঝড় বৃষ্টি, হরতাল, ইভেন নিজেদের কেউ মারা গেলেও না।

নিটোরে ভর্তি হতে হলে অন্যসব হাসপাতালের মতই কিছু নিয়ম আছে। ২৪ ঘন্টার মধ্যে ঘটা যেকোন ট্রমা আপনি নিটোরে ভর্তি করাতে পারবেন। শুধুমাত্র জরুরি বিভাগে একটা টিকিট কেটে ২৪ ঘন্টা খোলা থাকা নিটোর ইমার্জেন্সিতে গেলেই হবে৷ যেই লিম্ব অথবা স্পাইন ট্রমার অপারেশান লাগবে সেটাকে নিটোর কখনো রিফিউজ করবে না এটা নিশ্চিত থাকেন। শুধুমাত্র যদি হেড ইনজুরি থাকে তাহলে নিনস বা ঢাকা মেডিকেলে যেতে হবে, মূত্রনালী বা থলিতে আঘাত থাকলে নিকডু, চেস্ট ট্রমা থাকলে বক্ষব্যাধি ঘুরে আসতে হবে, অনেক সময় ফেসিও ম্যাক্সিলারি ইঞ্জুরি থাকলে ঢাকা ডেন্টাল।

যেকোন ট্রমা ম্যানেজমেন্টের তিনটা ধাপ, প্রথমটা প্রাইমারি সার্ভে, যেটা ইমার্জেন্সীতে ডাক্তার দেখে ঠিক করে যদি আপনার ওটি লাগে ওটিতে পাঠাবেন, যদি প্রাইমারি ম্যানেজ করে ছুটি দিয়ে দেয়া যায় ছুটি দিয়ে দেবেন। নিটোর ইমার্জেন্সী রুম এক মিনিটের জন্যও খালি থাকেনা। খালি রাখার কোন সুযোগ নেই।

সেকেন্ডারী সার্ভের প্রথম স্টেজ টা সম্পন্ন হয় ওটিতে। এই ওটির সামনে টাই হচ্ছে সবচেয়ে টাফ একটা জায়গা। এই জায়গায় ইম্প্রুভ করতে হবে আমাদের নিঃসন্দেহে৷
ইমার্জেন্সী ওটিতে ২২ ঘন্টাই কাজ করেন কমপক্ষে তিনজন চিকিৎসক৷ ননস্টপ রুটিনমাফিক ওটি করেন প্রতিদিন। সকালের এক ঘন্টা আর রাতের এক ঘন্টা যায় মেইন্টেন্যান্সে। ওটি পরিষ্কার করা, আবর্জনা সাফ করা, এটা এপ্রক্সিমেট টাইম।

এখানে অপেক্ষার সময়টাই মারাত্মক। ধরেন আপনার স্বজন মারাত্মক ভাবে আহত আপনাকে জরুরী বিভাগে প্রাইমারী ম্যানেজ করে ইমার্জেন্সী ওটিতে পাঠানো হবে। আপনার আগেও হয়তো আরো দশজন ওখানে ওয়েট করছে ফাইলসহ। এই অপেক্ষাটুকু আপনাকে করতেই হবে৷ সাধারনত শর্ট আউটটুকু ডাক্তাররাই করেন কাকে আগে ওটিতে ঢুকাবেন৷ এখানে প্রায়োরিটি কাজ করে কারটা করা আর্জেন্ট। অনেক সময় একটা মেজর কেস চললে মাইনর গুলা পাশে চলে আগেও সিরিয়াল পেয়ে যান অনেকে। এখানে কোন বায়াসনেস নেই।

এ টাইমটাতেই আপনি নানা রকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন৷ রোগীর লোক সেজে কেউ বলবে, ‘আরেহ এখানে কোন চিকিৎসা হয় না। বাইরে চলে যান’। হয়তো কোন ওটি বয় বলবে- ‘সিরিয়ালটা আগে করে দিচ্ছি কিছু টাকা দেন’। 

কিছু অতি বোকা লোককে কেউ বলবে, ‘স্যারের সার্জারীর চার্জ হইছে ১০ হাজার টাকা দিয়ে দেন’। অথচ সরকারি হাসপাতালে আপনার প্রায় কোন খরচই হয় না৷ অনেক সময় আপনাকে স্যালাইন, সুতা এগুলা কিনতে হতে পারে। সেটা লেখা থাকবে ভেতরের কাগজে। মাঝে মাঝে রড লাগাতে হয় সেটা কিনতে হয়। সেই প্রিপারেশন নেয়া লাগতে পারে৷

শুধু দুইটা কথা বিশ্বাস না করলে আপনার ভয় নাই-‘পঙ্গু হাসপাতালে আপনার চিকিৎসা হবে না’, ‘ভেতরে কোন ডাক্তার নাই’৷ 

অনেক সময় এও বলে- ‘সব ডাক্তার পিকনিকে গেছে বা ঈদে বাড়ি চলে গেছে’।

ওটি শেষ হওয়ার পরে আপনাকে ইমার্জেন্সী রিকোভারী বা ইআরএ থাকতে হবে একটা সীটের অপেক্ষায়।

বর্তমান পরিচালক স্যারের নির্দেশমতই আর ফাঁকা রাখার চেষ্টা করার জন্য ওয়ার্ডগুলোতে সীট ফাকা থাকলেই দিয়ে দেয়া হয়। এই একটা রাত আপনার ধৈর্য ধরতে হবে৷

ইআর এর সীটের জন্য বাণিজ্য হয় বলে শোনা যায়, তবে এর পেছনে কোন ডাক্তার জড়িত না এই বিশ্বাসটুকু রাখার জন্য কড়জোড়ে অনুরোধ করছি।

সীট পেয়ে গেলে আপনার অপেক্ষা অপারেশন কবে হবে। প্রতিটা ইউনিটে এভারেজে ৬০-৭০ টা রোগী ভর্তি থাকে। সপ্তাহে দুই দিন ওটি পায় প্রত্যেকটা ইউনিট। একদিনের ওটিতে ৪/৫ টা কেস করা পসিবল। সো আপনি আজ ভর্তি হয়ে দুই দিন পর ওটি পেয়ে যাবেন এটা ভাবা অবাস্তব। এক-দু সপ্তাহের সিরিয়াল থাকবেই।
তাছাড়া কিছু ব্যাপার মাথায় রাখতে হয়।

বড় একটা ট্রমার ৩-৫ দিনের মধ্যে শরীর কিছু কেমিক্যাল মেডিয়েটর রিলিজ করে। এই সময় অপারেশন করলে তখন শরীরে সেকেন্ড হিট হয়। যেটা শরীর নিতে পারে না। সেজন্য সেফটির জন্য আমরা কমপক্ষে এক সপ্তাহ অপেক্ষা করি। বাইরের দেশে বা বাংলাদেশে দু’একটা সুপার স্পেশালাইজড হসপিটাল যেখানে খুব আর্জেন্ট সব টেস্ট করা যায়। ফ্যাট এম্বলিজম ডেভেলপ করলে সেটা ঠেকানোর ব্যাবস্থা আছে সে সব যায়গায় ৮ ঘন্টার মধ্যে অপারেশন করা যায়। কিন্তু আমরা ইউজুয়ালি সে রিস্কে যাই না।

খুব সিলেক্টিভ কিছু ভাঙ্গা যেগুলোকে আমরা বলি অর্থোপেডিক ইমার্জেন্সী, সেগুলা দু-তিন দিনের মধ্যে করে ফেলা লাগে। আর অন্যান্য হাসপাতাল থেকে পঙ্গু হাসপাতালে ডেথ রেট কম।
পঙ্গু হাসপাতালে রোগী মারা যায় কী কী ভাবে বা কারা?

১. উঁচু কোন জায়গা থেকে পড়ে সারভাইক্যাল ফ্রাকচার হলে সেটা যদি রেসপিরেটরী সেন্টার ইনভলভ করে অনেক সময় তাকে বাচানো কঠিন হয়।

২. সিভিয়ারলি ক্রাশ হওয়া লিম্ব যেটা ম্যাংগেল্ড এক্সট্রিমিটি সিভিয়ারিটি স্কোর MESS অনুযারী Unsalvageable (লিম্ব রাখা যাবেনা) এরকম পা বা হাত কাটার জন্য পেশেন্ট পার্টির অসম্মতিতে ক্রাশ সিন্ড্রোম, র্যা বডোমায়েলাইসিস ডেভেলপ করলে। বা মাল্টিপল অর্গান ডিসফাংশন ডেভেলপ করলে।

৩. খুব রেয়ারলি এনাস্থেটিক হ্যাজার্ড থেকে।

৪. কিছু পেশেন্ট আসে যারা পেরীফেরী থেকে ইনকম্পলিটলি ম্যানেজড হয়ে আসে। যেমন ফিমার ফ্রাকচার এর একটা পেশেন্ট ব্লাড ইভেন একটা ফ্লুইড ও পেলো না৷ সে হাইপোভলিউমিক শকে মারা যেতে পারে।
ইমবিলাইজ করা ছাড়া পেরিফেরিতে ম্যানেজ করলে ফ্যাট এম্বলিজম হতে পারে।

৫. যেসব রোগীর অনেকগুলো কোমরবিডিটি আছে যেমন হার্ট ফেইলিউর, ক্রনিক কোন লাং ডিজিস, কিডনি বা লিভারের ক্রনিক ডিজিজ পাশাপাশি এক্সট্রিম ওল্ড এইজ।
নিটোরে কোন ইন্টার্ন নাই। সব পোষ্ট গ্রাজুয়েট ডাক্তার। লোকবল ও এমন না ২৪ ঘন্টা ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ডাক্তার থাকবে। কিন্তু নিটোরে সব সময় ২ জন ইএমও, একজন আইএমও, দুই জন ওটিতে সার্জন, একজন এনাস্থেটিস্ট থাকেনই।
 

আউটডোর মারফত ভর্তির উপায়

ধরুন মঙ্গলবার আমাদের আউটডোর। মঙ্গলবার সকালে রাউন্ড দিয়ে দেখলাম আমার সীট খালি ৪টা। আউটডোরে ৫০০ রোগীর মধ্যে আমার ভর্তির সুযোগ ৪টায়। এর বেশি নয়। এই চারটার সীটের জন্য ফোন আসবে ১০ জনের। কিন্তু আমরা চেষ্টা করি রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী ভর্তি করার। কিন্তু সেটা তো চারের বেশী হওয়ার সুযোগ নেই।

ড্রেসিং কে করবেন?

আমাদের ইনফেকটেড উন্ড চিকিৎসার জন্য প্রতি সপ্তাহে প্রতি ইউনিটে দুইটা ডার্টি ওটি পায়৷ যেখানে এনেস্থেশিয়া দিয়ে উন্ড টয়লেটিং করা হয়। বাকী পাঁচ দিন দরকারমাফিক ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন ব্রাদার ড্রেসিং করেন বেডের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক এর তত্ত্বাবধানে। এখানে টাকা পয়সা লেনদেন এর কোন বিধান নাই৷ বাংলাদেশে ঘুষ দেয়া নেয়া দুইটাই নিষিদ্ধ আবার বড়কর্তারা স্পীড মানির কথাও বলেন। কিন্তু এর সাথে কোনো ডাক্তার কখনোই জড়িত না এটা শতভাগ গ্যারান্টি দিয়েই বলছি৷ যারা জড়িত তাদের ব্যাপারে সবাই নিরব বা উৎসাহ কম আলাপে।

নিটোর (পঙ্গু হাসপাতাল নয়) বর্তমানে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থোপেডিক হাসপাতাল (কুরগান ১২০০) নিটোরের ১০০০ বেডের মধ্যে ৬০০ পর্যন্ত চালু হয়ে বাকিটাও পর্যাপ্ত লোকবল পেলে শীঘ্রই চালু হবে।

নিটোরের ৯০ ভাগ ডাক্তারই চেষ্টা করেন রোগীদের জন্য কিছু উপকার করতে৷ তারপরেও রোগীরা ভোগান্তির শিকার হয়, কারণ আমরা কাউকে সাধারনত ইমার্জেন্সী হতে ফেরাই না। যে কয়টা বেড সেই কয়জন রোগী চিকিৎসা দিলে মান আরো উন্নয়ন সম্ভব। কিন্তু তাতে দালালরা আরো তৎপর হবে৷ কারণ সীট না পেলেই দালালেরা রোগীটাকে ওদের ক্লিনিকে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করে।

আমি নিজের আগ্রহে হিসেব করে দেখলাম- ২৩ জুন পর্যন্ত নিটোরে ক্লিন ওটি হয়েছে ৩ হাজার ৫৪৯টি। অর্থাৎ ছুটির দিন বাদ দিলে প্রতিদিন প্রায় ৩০টি করে।
প্রতিদিন ইমার্জেন্সীতে ১৫০-২০০ রোগী আসে, আউটডোরে ১২টা রুমে এভারেজ ৫০-৭০টা করে হিসেবে ৬০০-৮০০ রোগী দেখা হয়।
ইমার্জেন্সী ওটিতে চিকিৎসা হয় এভারেজ মর্নিং আর নাইট শিফট মিলিয়ে ৪০টা। 

ঈদের দিন সারাদিনে প্রায় ৬৫টা অপারেশন করা হয়েছে। অপারেশনগুলা মেশিনে হলে ভালো হত; কারো ওয়েটিং টাইম লাগত না। কিন্তু অপারেশন তো মেশিনে না মানুষে করে।
ডার্টি ওটিতে এভারেজ প্রতি দিন ২৮-৩০ টা কেইস থাকে।

এত বড় কর্মযজ্ঞ নিটোর বছরের পর বছর করে আসছে। বছরে আউটডোর আর ইনডোর মিলিয়ে লক্ষাধিক রোগীর চিকিৎসা করছে নিটোর।

এই যে নিটোরের বিশাল কর্মযজ্ঞ, এখানে কর্মরত চিকিৎসকদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর হাজার হাজার রোগীর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়া - এগুলোর কোনটাই সাম্প্রতিক সমালোচনায় উঠে আসে নাই। এতে দিনরাত খেটে যাওয়া চিকিৎসকরা হতোদ্যম হয় আর নষ্ট হয় সাধারণ রোগীদের আস্থা। 

অথচ প্রায় ১৮ কোটি জনসংখ্যার এই দেশে একটাই বিশেষায়িত হাসপাতাল, যেটার ওপর আস্থা নষ্ট হলে আর এখানে কর্মরত চিকিৎসকদের কর্মস্পৃহা নষ্ট হলে ক্ষতি হয় সাধারণ রোগীদের, যাদের অধিকাংশেরই এই দেশেই চিকিৎসা নিতে হবে। একজন চিকিৎসক হিসেবে আমারও এই দেশেই চিকিৎসা নিতে হয় সবসময়। তাই সবার প্রতি অনুরোধ- গঠনমূলক এবং যৌক্তিক সমালোচনা করুন। অযথা চিকিৎসকের প্রতি অযৌক্তিক সমালোচনার তীর ছুঁড়ে তাদের কর্মস্পৃহা নষ্ট করবেন না।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত