ঢাকা      সোমবার ২৬, অগাস্ট ২০১৯ - ১০, ভাদ্র, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. মিথিলা ফেরদৌস

বিসিএস স্বাস্থ্য

সাবেক শিক্ষার্থী, রংপুর মেডিকেল কলেজ। 


সরকারি হাসপাতালে নানা অনিয়মই যখন নিয়ম!

একজন কনসালটেন্ট তার মামাতো ভাইকে দেখাতে এসেছে। রোগীর সাথে কথা বলছি, এই সময় দরজা ঠেলে একজন ঢুকে পরলো। এই লোক আগেও বহুবার এমন করেছে। আজকে একটু বিরক্ত হয়েই বললাম, রোগী দেখতেছি। সে বললো- আমি স্টাফ। আমি বললাম, আমি একজন ডাক্তারের রোগী দেখতেছি। তাছাড়া রোগী তো রোগীই, তার প্রাইভেসি আছে।

এবার সে লোক মুখ বিকৃত করে বলে গেলো, আমরা কি বানের জলে ভাইসা আইছি?

একই দিনে আরেক স্টাফ এসে বলছে- আমি 'আর পি' এর পিওন। আমি বললাম, নাম কি আপনার? সে নিজের নাম না বলে 'আর পি' এর নাম বলে আমাকে ফাপড় দেখায়।

আমি বললাম, 'আর পি আমার মেডিকেলের ছোট ভাই', তার পিওনের নাম অমুক আপনার নাম বলেন। তখন সে থতমত খেয়ে বলে, আমি আসলে তার পাশের রুমের।

আমি জানি শত্রু বাড়লো। এদের আবার একতা বেশি। যাহোক, আমি স্ট্রিক্টলি একটা রোগীর সাথে আরেকজন দেখা খুব অপছন্দ করি। আমার বেশিরভাগ মহিলা রোগী, তাদের প্রাইভেসির ব্যাপার আছে। এই নিয়ে প্রায় সময়ই এসব স্টাফদের সাথে টুকটাক ঝামেলা হয়। ঝামেলা কমানোর জন্যে অনুরোধও করি।

হাসপাতালের স্টাফরা হাসপাতালের ডাক্তারদের চেয়েও পাওয়ারফুল। এদের চক্র আছে, এদের ইউনিয়ন আছে, সবচেয়ে বড় কথা এদের একতা আছে যা ডাক্তারদের নাই। তাই হাসপাতালে ডাক্তাররা সবচেয়ে অসহায়। অনেক ডাক্তারদের দেখেছি এদের তোয়াজ করে চলতে। কিন্তু আমি পারিনা। কিছু কিছু স্টাফ সৎ। এদের সাথে আমার ব্যবহার সবসময় ভাল। তাদের সততার কারণে।

হাসপাতালে ডাক্তারবাদে বেশিরভাগ স্টাফ বেতনটাকে মনে করে চাকরীতে বেতন তোলা একটা কাজ। শুধু সেইটা তারা নিয়ম করেই তোলে। ফাও টাকা। বাকি তাদের সব কাজের জন্যে তারা টাকা নেয়। সেইটা রোগীর থেকেই হোক আর ডাক্তাদের থেকেই হোক।

ডাক্তারদের জন্যে যে স্টাফরা আছে, তারা সব কাজের জন্যেই ডাক্তাদের কাছে বাধ্যতামূলক টাকা নিবেই। না দিলে কাজ হবেনা। ডাক্তাররাও ঝামেলা এড়াতে এদের শুধু টাকা দেয় না, তোয়াজও করে চলে।

দুই.

এবার আসি রোগীদের ব্যাপারে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া থেকে শুরু হয় নানারকম অনিয়ম। ট্রলি ধরার জন্যে লোক আছে, সে বেতনও পায় কিন্তু টাকা ছাড়া কখনওই হুইল চেয়ার বা স্ট্রেচার নিয়ে যাবে না। এমন কি আমি যখন নিজেই ডিএমসিতে ট্রেনিং করি, অসুস্থ হয়ে ভর্তি হতে গেলে, আমার হাজবেন্ডের কাছ থেকেও টাকা নিয়েছিলো।

এইসব আয়াদের দামি ড্রেস, দামি মোবাইল, জুতা, ব্যাগ, সোনার জিনিস দেখে অনেকেই তাদেরকেই অফিসার মনে করেন। আমার রুম পরিষ্কার করা খালার কাছে তাদের অনেক সম্পত্তির হিসাব জানা যায়।

সার্জারিতে ট্রেনিং করার সময়, এডিমিশন মর্নিংয়ে অবস্ট্রাকশনের রোগী থাকলে ইনিমা অর্ডার দিয়ে আসতাম, সন্ধ্যায় যদি দেখতাম রোগীর পায়খানা হয়েছে তখন আর অপারেশনের ডিসিশনে না গিয়ে কঞ্জারভেটিভে চলে যেতাম। প্রায় দেখতাম রোগীকে ডুশ দেয়া হয় নাই। কেনো? রোগী টাকা দেয় নাই। এইসব দাদুদের সাথে কথা বলাও বিপদ। খুব গরীব রোগীর ক্ষেত্রে নিজেরাই পকেট থেকে টাকা দিয়ে দিতাম। তখনই মনে আছে সাপোজিটরি আর ইনিমা দেয়ার হাই রেট ছিলো। মানুষ কতটা অসহায় এদের কাছে। অথচ এরা কিন্তু বেতনভোগী।

আমার শ্বাশুরীর একবার মাথা ফেটে গেলো, হাসপাতালে নিলাম, ব্রাদার স্টিচ দিতে টাকা নিলো প্লাস দুই ধরনের দামি সুতা কিনায় নিলো যা হাসপাতালেই সাপ্লাই আছে। সে সাপ্লাই সুতা দিয়েই স্টিচ দিলো, কিন্তু সুতা নিলো বিক্রি করে দিবে। স্টিচ সবসময় আমরাই দিতাম, কে জানি ইমার্জেন্সিতে রোগীর লোড বেশি বা যে কারণেই হোক, ব্রাদার এভাবে দিনে কত টাকা ইনকাম করতে পারে? ফিরে আসার সময় একজন ডা. শুধু বলল, "আপনি ডাক্তার বলবেন না? আমি আপনাকে কত দেখেছি।" আমার হাসিও আসতেছিল না। আমি যাওয়ার পরেই বলেছিলাম, "আমার মা" কেউই গুরুত্ব দেয় নাই। পরিচয় দিয়ে কি করবো? মায়ের রক্তাক্ত মুখের সামনে কোন হিসাব বা পরিচয় চলে না। আমার মতো প্রতিদিন হাজার হাজার ভুক্তভোগী রোগী এভাবেই সাফার করে।

কয়দিন আগে এক সরকারী হাসপাতালে ঘটে যাওয়া এক ঘটনায় বহিরাগতদের হাসপাতাল ভাংচুরের কথা শুনলাম, সেখানে হাসপাতালে সিকিউরিটি গার্ডের কাজ ছিলো হাসপাতালের গেটে তালা লাগানো। ডাক্তারদের কোন সিকিউরিটিতে তাদের কাজ নাই। এদের কাজ কোম্পানীর লোকের কাছে টাকা পয়সা গিফট নিয়ে ঢুকতে দেয়া, কোম্পানির মেয়েদের বিভিন্ন কুপ্রস্তাব দেয়া।

শুনে অবাক হচ্ছেন, তাই না? এসবই সত্য ঘটনা। প্রতিদিন নিজের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনা। তেরো বছর ধরে তার আগে ইন্টার্নিশিপের সময় থেকেই দেখে আসছি। অথচ এইসব সিকিউরিটির সামনে ডাক্তারকে কেউ কিছু বললে বা এদের ডাকলেও আসে না। আসবে যদি ওদের টাকা দিয়ে রাখেন।

তিন.

এখন আসি টিকিট বিক্রি। অনেকেই দীর্ঘক্ষন লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট পায়না, কিন্তু ভিতরে নাকি একটা চক্র যাদের কাছে অতি চতুর লোকজন এক টাকা থেকে পাঁচ টাকায় ইজিলি টিকিট কেনে। শুধু তাই না, কোনরকম রিকুইজিশন ফর্ম ছাড়াই, লাইনে দাঁড়ানো ছাড়াই নাকি হাতে হাতে টাকা দিলে টেস্ট করা যায় এবং রিপোর্ট সাথে সাথেই পাওয়া যায়। এসবই আমার রোগীদের কাছ থেকেই শোনা আর অবাক হওয়া।

আমি নিজে লাইনে দাঁড়ায় টাকা দিয়ে টেস্টের জন্যে লাইনে দাড়ানোর ভয়ে টেস্টই করাই না।কাউকে অনুরোধও করতে ইচ্ছা হয় না।আর কত সুন্দর সিস্টেমের ভিতরে হাসপাতালে এইসব দুর্নীতি চলে! আমি হঠাৎ সেদিন এইসব কথা জেনে আসলেই অবাক হই। কত অসুস্থ রোগী লাইনে দাঁড়ায় চিকিৎসা নেয়, টেস্ট করায় ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়ায়।

একদল স্টাফের কাজ হাসপাতালের বাইরে রোগী ভাগানো, এরা বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের, বিভিন্ন ক্লিনিকের দালাল।

হাসপাতালে মৃত্যুতেও শান্তি নেই, এইসব দালালচক্রের পাল্লায় পরে। সেইসব ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন, তবুও কখনও কাউকেই দেখিনি এসব নিয়ে প্রতিবাদ করতে।

হাসপাতালের স্তরে স্তরে অনিয়মের কথা লিখে শেষ করা যাবে না। হ্যাঁ দায় ডাক্তারদেরই থেকে যায়। কিন্তু একজন ডাক্তার আজীবন একটা হাসপাতালে থাকে না, তাই অনিয়মের বিরুদ্ধে যেতেও চায় না। তাছাড়া এদের সিন্ডিকেট এতই পাওয়ারফুল যে, যেকোন সময় যেকোন ডাক্তারকে অন্যত্র পোস্টিং করায় দিতেও পারে তারা। তাছাড়া মানসম্মানের ভয়।

এদের এত ক্ষমতার কারণ কি?

১. এরা বেশিরভাগ লোকাল হয়।

২. এরা পাওয়ারফুল কাউকে দ্বারা রিক্রুট করা, সেইটা যেভাবেই হোক।

৩. এদের কোন বদলী নাই।

৪. এরা সবসময় একতাবদ্ধ।

৫. এদের মান সম্মানের কারবার নাই।

অনিয়মটাই সবাই নিয়ম হিসেবে মেনে নিয়েছে। কেউ এইসবের কোনও প্রতিবাদও কখনও করে না। যারা ডাক্তারদের বিরুদ্ধে সোচ্চার, তাদের বলবো ডাক্তারদের মত নিরীহদের বিরুদ্ধে অনেক তো লিখলেন, এইবার এইসব ব্যাপারে একটু দৃষ্টি দিন, তাতে বহু অসহায় রোগী উপকৃত হবে। তাছাড়া যথাযথ কতৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষন করছি। অন্তত মানুষ গুলো তাদের অধিকারের ব্যাপারে তো সচেতন হবে।

পরিশেষে একটা গল্প বলে শেষ করি, ইন্টার্নির সময় আই য়ে প্লেসমেন্টের সময় ইনডোরে কাজ শেষে আউটডোরে আরএস এর রুমে রোগী দেখতেছিলাম। একজন হোমড়া চোমড়া, সব রোগীকে ধাক্কা দিয়ে রুমে ঢুকলো। তার পরিচয়, সে হাসপাতালের এক কর্মচারীর ড্রাইভার। স্যার ঠান্ডা মানুষ, লোকটাকে চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দিয়ে আমাকে বললেন: আমার কর্মচারীর ড্রাইভার আছে, আর আমার গাড়িই নাই, এ কেমন কথা বলতো?

আজ চাকরীর তেরো বছর পর আমার ঠিক স্যারের কথাই প্রতিধ্বনি করতে ইচ্ছে করে যখন শুনি, হেলথ সেকটরের বিভিন্ন স্তরে কত ছোট ছোট কর্মচারীর সম্পত্তির হিসাব।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

সারভাইক্যাল ক্যান্সার: কারণ, লক্ষণ ও করণীয় 

সারভাইক্যাল ক্যান্সার: কারণ, লক্ষণ ও করণীয় 

সারভাইক্যাল ক্যান্সার আমাদের দেশে খুব পরিচিত রোগ। তবে বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং সচেতনতার…

ভিআইপি রোগী

ভিআইপি রোগী

এমবিবিএস পাস করে কেবল ১৯৮৫ সনের নভেম্বর মাসে ইন-সার্ভিস ট্রেইনিং শুরু করেছি।…

রোগীকে যখন শান্তনা দেয়ার কোন ভাষা থাকে না

রোগীকে যখন শান্তনা দেয়ার কোন ভাষা থাকে না

আমার চেম্বারে একজন ভদ্রমহিলা আসলেন বুকে ব্যাথা নিয়ে। তার প্রেশার আনকন্ট্রোলড। আমি…

একটা দুইটা অ্যান্টিবায়োটিক খেলে কি হয়?

একটা দুইটা অ্যান্টিবায়োটিক খেলে কি হয়?

আমাদের শরীরের কিছু কিছু অসুখ আছে যেগুলো জীবাণুর কারণে হয়। বলা হয়…

গর্ভবতী মায়ের সন্তানের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কতটুকু, করণীয় কী?

গর্ভবতী মায়ের সন্তানের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কতটুকু, করণীয় কী?

ডেঙ্গু বিষয়ক নানা প্রশ্নের একটি হচ্ছে, গর্ভবতী মায়ের ডেঙ্গু হলে সন্তানেরও তা…

বুদ্ধিজীবী

বুদ্ধিজীবী

আমার সামনে বসা মধ্যবয়সী এক অত্যাধুনিক ভদ্রলোক! ঘাড় পর্যন্ত ঝুলানো লম্বা চুল,…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর