ঢাকা      সোমবার ২৬, অগাস্ট ২০১৯ - ১০, ভাদ্র, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. মাহবুবুর রহমান

সিনিয়র কনসালটেন্ট, ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট ও সি সি ইউ ইনচার্জ, ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল, ঢাকা।


মৃত্যুর আগে কথোপকথন

হাতির মতন বিশাল মেশিনটি আমার বুকের উপর দিয়ে বার কয়েক চক্কর দিয়ে গেল। আমি বুঝতে পারছিলাম এবার কবরের মত গর্তে আমাকে ঢোকানো হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম। বালুঝড় দেখলে উটপাখি যেমন বালুর মধ্যে মাথা লুকিয়ে ফেলে। ব্যাপারটা মনে হতেই নিজে নিজে হেসে ফেললাম। শেষ পর্যন্ত উটপাখি হয়ে গেলাম! তাহলে উটপাখিও আমার মত চিন্তা করে? আগে ভাবতাম এতবড় পাখিটার ছোট্ট মাথায় নিশ্চয় তেমন ঘিলু নেই। কিন্তু আজ বিপদে পড়ে বুঝলাম কার মাথায় কত ঘিলু!

-শ্বাস বন্ধ রাখুন।

মাইক্রোফোনে অপারেটরের নির্দেশ পেয়ে বুকটা ধক করে উঠল। আমাকে শ্বাস বন্ধ করতে বলেছেন। এটা কি তবে শেষ নিঃশ্বাস আমার? আর যদি এই পৃথিবীর বাতাস বুক ভরে নিতে না পারি? আমি বুকভরে একবুক বাতাস টেনে নিলাম।

-শ্বাস ছেড়ে দিন।

মাইক্রোফোনে আবার নির্দেশ। আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। যাক বাবা এবারের মত রক্ষা। কিন্ত না। আবার একই নির্দেশ। দৈত্যের মত সিটি স্ক্যানার মেশিনটি তার অন্তর্ভেদী চোখ দিয়ে আমার হার্ট লাংসের শিরা উপশিরা তন্নতন্ন করে কি যেন খুঁজে বেড়াল। লক্ষ লক্ষ রশ্মি আমার বক্ষ বিদীর্ণ করে ক্রমাগত অসংখ্য ইমেজ তৈরী করে কম্পিউটারের ডিস্কে জমা করতে থাকল। আমার হঠাৎ রঞ্জেন দাদার কথা মনে পড়ে গেল। সেই কবে ১৮৯৫ সালে জুরিখের এই দাদা কী এক অদৃশ্য দৈত্যকে মেশিন দিয়ে ধরে ফেললেন! সেই যে ধরে ফেললেন আর ছাড়লেন না। সেই আলোর দৈত্যকে পিটিয়ে সিঁটিয়ে বাঁকিয়ে তাতিয়ে কত নতুন দৈত্যের ছানা বানানো হল। রঞ্জেন দাদা চলে গেছেন সেই কবে কিন্তু তাঁর আলোর দৈত্যরা দিব্যি রাজত্ব করে চলেছে।

রঞ্জেন দাদার এই দৈত্যটি আমার বুকের উপর আরো কয়েক চক্কর পাক দিয়ে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু মেশিনের দীর্ঘশ্বাসের শেষ রেশটুকু আমার মাথায় ঢুকে গেল। সে কি তবে কিছু খুঁজে পেল? কোন মৃত্যুকণা? যে কণা আমাকে টেনে হিচড়ে টেনে নিয়ে যাবে অদেখা সেই জগতে। একটি অপাঙতেয় বীজ আমার অনিচ্ছায় আমারই ভেতর তার অদম্য শেকড় বসিয়ে গজিয়ে উঠবে এক প্রকাণ্ড মহীরূহে। সেই মহীরূহ তার সতেজ দৈত্যপত্র মেলে সূর্যের কাছ থেকে আদায় করে নিবে সবটুকু জীবন। সেই প্রকান্ড কান্ডের দুর্বিসহ ভারে আমার জীবনপ্রদীপখানি একদিন দপ করে নিভে যাবে।

নিভে যাবার আগে সেই ঝলসে ওঠা আলোকচ্ছটায় একটি করুণ মুখ আমি দেখতে পেলাম। কতদিন এই মুখটি আমি দেখতে পাইনি। আগে যতবার তার কথা মনে করতে চেষ্টা করতাম ততবারই একটি ফ্রেমে বন্দী সাদাকালো স্থির ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠত। একটি মাত্র স্থির দৃষ্টি। অটল, অক্ষয়। কিন্তু এইমাত্র যে মুখটি দেখতে পেলাম তা জীবন্ত। আলোর বেঁকে যাওয়া চকচকে দৃষ্টি। কিন্তু কেবলই ক্ষণিকের। মুহূর্তকালের। তবে ধ্রুবসত্যময়।

সিটি স্ক্যানের রিপোর্ট আমার হাতে। কি সব লিখেছে তা বুঝবার বিদ্যা আমার নেই। ফুসফুসের ডাক্তার আমায় বললেন, রিপোর্ট এখনো পরিস্কার নয়। সন্দেহ দূর করার জন্য একটি নিডল বায়োপসী করতে হবে।

তাঁর নির্দেশ মত এখন যাচ্ছি ধানমন্ডির দু’নম্বর রোডে। এই রোডটি কতকালের চেনা, কত পুরাতন কিন্তু এখনো জীবন্ত। যেন পুরানো বন্ধু এক। ক্ষণেক্ষণে আড়াল হয়, কিন্তু হারায় না কখনো।

টিএসসি থেকে রিকসা নিয়ে সোজা রোড নম্বর দুই। ভারতীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। পথের পাঁচালী। সত্যজিৎ রায়। সবসময় দেখে দেখে বয়স্ক রিকসাওয়ালা নিতাম। যাতে পথটি আরো একটু লম্বা হয়। সময়কে রাবারের ফিতা বানিয়ে তার খোপায় পরিয়ে হাওয়ায় উড়ে বেড়াতাম। বামপন্থী মানুষ হলেও সবসময় রিকসার ডানদিকই আমার পছন্দ ছিল। সে হাসিমুখেই তা মেনে নিত। বৃদ্ধ রিকসাওয়ালার শ্রমসাধ্য উঠানামায় তার কুঞ্চিত ত্বকের রন্ধ্রপথ দিয়ে ঘামের স্রোত শুরু হয়ে যেত। এটা দেখে গ্রাম থেকে সদ্য উঠে আসা আমার রক্তে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রক্ত টগবগ করে উঠত। পৃথিবী থেকে পূঁজির নির্মম শোষণ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত আমার শান্তি আসবে না। পরিস্থিতি এমন হল যে, কোনো গাড়িওয়ালা লোক দেখলেও তার প্রতি একধরণের আক্রোশ জন্ম নিত। মনে হত সেও এই সাম্রাজ্যবাদের স্থানীয় দালাল। পাশের মানুষটি আমার মনোভাব বুঝতে পারত।

সে বলত⁃ একদিন তুমিও গাড়ির মালিক হতে চাইবে।

⁃ প্রশ্নই আসে না। যতক্ষণ না”উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না” ততক্ষণ আমি হব না শান্ত। আমার রক্তের তাপমাত্রা হঠাৎ বেড়ে যায়। সম্ভব হলে এক্ষুণি জ্বলন্ত মশাল হাতে সবকিছু পুড়ে ছারখার করে দিই।

নিডল ডাক্তার অনেকক্ষণ পরীক্ষা নিরীক্ষা করে আমাকে বুঝিয়ে বললেন যে, তিনি কী করবেন।

আবার রঞ্জেন দাদা। আবার সিটি স্ক্যান। তবে নিডলসহ। এবার সোজা বসিয়ে পিঠের বাম বরাবর নিডল ঢুকিয়ে আমার অন্তর্লোক রক্তাক্ত করলেন। কোনো উপায় নেই। বিধি মোতাবেক চলতে হবে।

টীকার সুঁইয়ের ভয়ে স্কুল পালানো ছেলে আমি। অসহায় নির্বোধ নির্বাক পশুকে জবাই করার মত জোর করে শুধু যক্ষ্মার টীকা নিতে হয়েছিল। সেই লোক এখন দিব্যি সুঁই ফুটানো, ছোটখাটো অপারেশন সহ্য করে চলেছি।

একবার টিএসসি থেকে নিউমার্কেটে যাচ্ছি। হুডখোলা রিকসায় সে আর আমি। যেতে যেতে নানান দার্শনিক আলোচনা চলছে। বস্তুবাদ আর দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের মূল দ্বন্দ্ব কোথায় এ বিষয়ে জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা শুরু করতেই পেছন থেকে সাম্রাজ্যবাদের এক দালাল তার গাড়ি দিয়ে দিল এক ধাক্কা। তাল সামলাতে না পেরে সে রিকসা থেকে ছিটকে নীচে পড়ে গেল। আমি লাফ দিয়ে নীচে নেমে পড়ার আগেই তার দুই হাঁটু মারাত্মকভাবে কেটে গেল এবং বাম হাতের তর্জনী ভেঙ্গে গেল। মুহূর্তে অসংখ্য ছাত্রছাত্রী ঘাতক গাড়িসহ আমাদেরকে ঘিরে ফেলে। প্রতিবাদী ছাত্ররা উপস্থিত আদালত বসিয়ে গাড়ির চালককে পর্যাপ্ত উত্তম মধ্যম প্রদানপূর্বক গাড়িটিকে শুদ্ধ করার প্রয়াসে অগ্নিদেবতার কাছে সমর্পন করল। আর আমি তাকে আরেকটি রিকসা নিয়ে দ্রুত ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে নিয়ে চললাম। তার মুখায়বে তখন এক ভীতসন্ত্রস্ত হরিণীর মৃত্যুভয় দেখতে পেলাম।

জরুরি বিভাগে তাকে প্রথমে কয়েকটি ব্যথানাশক ইনজেকশন ও টিটেনাস ভ্যাকসিন দেয়া হল। প্রতিটি ইনজেকশন নিতে গিয়ে সে তার সর্বশক্তি দিয়ে আমার ডান হাতটি চেপে ধরল। তখন সত্যি সত্যি মনে হয়েছিল এই হাত সে কোন দিন ছেড়ে যাবে না। তার সেই আঁকড়ে ধরা নির্ভরতার স্পর্শটুকু আমি ঠিক ঠিক এখনো অনুভব করতে পারি।

টানা ছয় সপ্তাহ বিশ্রাম শেষে সে ক্লাসে যোগ দিল। কিন্তু তার চোখের আগের সেই চকচকে আলোটুকু কোথায় যেন হারিয়ে গেল। 

-তোমাকে একটা কথা বলি।

আমি তার দিকে জিজ্ঞাসু নেত্রে তাকাতেই সে নতমুখী হয়ে বলল- এই দেশে আমি থাকব না।

তার এই কথার কোন উত্তর না দিয়ে বললাম, চল গাছের ছায়ায় ওদিকটায় একটু বসি। আমরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের একটি পানিশূন্য পুকুর পাড়ে বসন্তের দুপুরে বকুলতলায় আসন্ন অনিশ্চিত ভবিষ্যতকে সামনে রেখে পাঁচ টাকার চীনা বাদাম নিয়ে বসলাম।

-আচ্ছা বলত এগুলোর নাম চীনা বাদাম হল কেন?

আমি বুঝতে পারলাম আবহাওয়া লঘু করার প্রয়াসে চীনকে উপস্থিত করা হয়েছে।

-আসলে বাংলা অভিধানে যা কিছু ভাল, যা কিছু মহান তার প্রায় সবই বিদেশ থেকে আমদানী করা হয়েছে। যেমন ধর চীনা বাদাম, চীনা হাঁস, বিলেতি গাব, বোম্বাই মরিচ, আরো কত কী। বিপরীতে দেশী বাদাম, দেশী গাব, দেশী মরিচ চাকচিক্যহীন, রূপগুনহীন, বিস্বাদে ভরা। আসলে দেশী মুরগী আর দেশী ক্রিকেট ছাড়া বাঙালির কাছে সবকিছুতেই বিদেশপ্রেম।

এসব লঘুবিষয়ক আলোচনায় আমাদের পাঁচ টাকার বাদাম কখন যে শেষ হয়ে গেল টেরই পেলাম না। সম্মুখে শুধু পড়ে রইল অদৃশ্য আগামী এবং পরিত্যক্ত বাদামের নিঃসঙ্গ নিঃস্ব খোলস।

নিডল বায়োপসীর সাদা খামটি দেখে বুকটা ধক করে উঠল। খামটি অন্য কোন রঙের হলেও তো পারত। সাদা কেন হল? শেষ দিকের সবই কি সাদা রঙের হয়ে যায়? যাই হোক খামটি বুকপকেটে রেখে রিকসা নিয়ে সোজা গ্রীণরোডের ডাক্তারের চেম্বারে।

ডাক্তার ধীরে সুস্থে খামখানি খুলে মুখ গম্ভীর করে বসে রইলেন। সমস্যা আমার কিন্তু মুখ গম্ভীর তাঁর। অবশ্য এরকম মুখের গাম্ভীর্য আমারও একবার দেখা দিয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে প্রায় ছয় মাস হলে বসে বিভিন্ন দপ্তরে দরখাস্ত করে যাচ্ছি। কারও কোন সাড়া শব্দ নেই। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শুকনো পুকুরপাড়ে বসে তার সাথে বসে শুকনো বাদাম খাওয়াও অনিয়মিত। টিউশনির পয়সায় তখনো পেটের পুজো চলে যাচ্ছিল। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন আপাতত লেনিনের রচনাবলীর পাতায় পাতায় বিশ্রাম নিচ্ছে।

এরই মধ্যে স্বঘোষিত উর্দিওয়ালা সুলতান -ই-তুঘলক হোমো এরশাদ আমাদের হল খালি করার ফরমান জারি করল। বন্দুকের নলের ভেতর যে সকল ক্ষমতার উৎস এই তত্ত্বের নিগুঢ় রহস্য সেদিন মর্মে মর্মে উপলব্ধি করলাম। একাত্তরে তিরিশ লক্ষ বোকা বাঙালি কেন যে মরতে গেল সেই হিসাবটা কোনভাবেই মিলানো যাচ্ছে না!

দুই.

হাসপাতালের বেড যতই চকচকে হোক না কেন তা কারোরই কাম্য নয়। এই সুশোভিত ধবধবে বেড যেন তীর্থযাত্রীর এহরাম বাঁধা সেলাইবিহীন সাদা পোশাক। এরকম পরিষ্কার সাদা বিছানায় শুয়ে থাকা এক অদ্ভুত অনুভূতির সঞ্চার করে। জন্মের আনন্দ, ধোয়াটে শৈশব, বল্গাহীন কৈশোর আর প্রেমময় যৌবন। সবকিছু স্বপ্নের মত ভাসাভাসা, কিছু স্পস্ট, কিছু অতিদ্রুত সাদাকালো চলচ্চিত্রের কুশলী কোলাজ। যেন মহাকালের টাইম মেশিন। মুহূর্তে নক্ষত্রলোক পার হয়ে অসীমের দিকে ধাবমান আমার সোনারতরী!

গ্রামগঞ্জে সপ্তাহে সাধারণত দু’দিন হাট বসে। কিন্তু হাসপাতালে নিত্যদিন হাট বসে। জীবনমৃত্যুর হাট। এই হাটে কেউ কেনে, কেউ বেচে। কেউ জীবনকে নতুন করে পূর্ণ করে বাড়ি ফিরে যায়। নতুন রূপে জগত ধরা দেয়। আর কেউ জীবনের হিসেব নিকেষ মিটিয়ে দিয়ে জীবনদেবতার কাছে ফিরে যায়। কোথায় যায় সে? সবই কী নিশ্চিহ্ন ধুলায় মিলিয়ে যায় তবে? এই যে সবুজের অদম্য অবোধ সমারোহ, প্রভাতের বুক জুরানো মৃদুমন্দ সমীরণ আর আকাশজুড়ে রূপালী জোছনা ! সে কি কেবলই মরীচিকার মায়াবী কুহক?

কেমোর বিষক্রিয়ায় আমার এতসুন্দর সখের চুলগুলো আমাকে নিঃস্ব করে বিদায় নিল। যেন আমারই ‘খন্ড খন্ড আমি ‘ আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে খন্ড খন্ড মৃত্যুকে বরণ করে নিল। মৃত্যু কি তবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মৃত্যু দিয়ে তৈরী? জীবনের শাসাল ফলের ভেতর তবে কি লুকিয়ে আছে কালো কালো মৃত্যুবীজ? নাকি জন্মান্তরের পরম্পরা সে?

কেমোর বিষক্রিয়া দেখবার জন্য রক্তপরীক্ষা, ইকোকার্ডিওগ্রাম করা হল। ডাক্তার বললেন, রিপোর্ট খুব ভাল।

রিপোর্ট ভালো হলে বুকের বামদিকে চিনচিন করে ব্যথা হচ্ছে কেন? হঠাৎ করে তার কথা মনে পড়ল। মনে পড়তেই চিনচিনে ব্যথাটা আরো বেড়ে গেল। ভাবলাম তাকে সবকিছু জানাই। আবার ভাবলাম, থাক। কীইবা লাভ জানিয়ে?

তিন.

প্রিয়বন্ধু,

গতকাল ঘুম থেকে জেগেই তোমার মেইলটি পেলাম। প্রথমে একটা ঘোরের ভেতর ছিলাম। ভাবলাম আমি কি জেগে আছি, নাকি ঘুমের কুয়াশায় আছি। চোখে মুখে বার দুই পানি ছিটিয়ে এসে আবার মেইলটি খুলে বসলাম। তোমার কাজ, লেখালেখি, জীবনযাপন সব এত সুন্দর করে লিখেছ যে পড়ে একটি অনাবিল আনন্দ পেলাম। আমাদের সেই হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো, রমনার বিকেলে অর্থহীন হাঁটাহাটি, শূন্যপুকুরে ভরাবাদাম, অবশেষে নিঃসঙ্গ শুষ্ক খোসা। সেদিনের সেই দুর্ঘটনার কথা মনে হলে এখনো বুক আতঙ্কে কেঁপে ওঠে। সেদিন আমাকে তোমার অকুন্ঠ আগলে রাখা কোনদিন আমি ভুলব না। দুর্ঘটনার পরবর্তী মানসিক আঘাত আমি সহ্য করতে পারিনি। সেই অভিঘাত শেষ পর্যন্ত আমাকে স্বার্থপরের মত এই দূরপ্রবাসে টেনে নিয়ে এসেছে।

জানতে চেয়েছ, কেমন আছি? সপ্তাহের পাঁচদিন গাধার মত খাটাখুটি করি। আর দুদিন নাকডাকা ঘুম ঘুমাই। সংসারে সময় দেই। বাচ্চাদের সাথে আড্ডা দেই। হইহুল্লোড় করি। আর লংড্রাইভে ধাওয়া করি। বেশ আছি।

তবে কাজের ক্লান্তি কখনো কখনো নিজেকে আনমনা করে তোলে। মনে হয় কোথায় যেন কিছু শূন্যতা রয়ে গেল জীবনে। জীবনের এই শূন্যতাটুকু ভরে নিতে একা একা বেরিয়ে পড়ি সপ্তাহের শেষে শুক্রবার বিকেলে।

তুমি নিশ্চয় জান, ভার্জিনিয়া বীচ পৃথিবীর সুন্দরতম বীচগুলোর একটি। আটলান্টিক মহাসাগরের পেট থেকে বেরিয়ে চেসাপিক উপসাগর ভার্জিনিয়া বীচ থেকে ইস্টার্ন শোরকে বিচ্ছিন্ন করেছে। সেই বিচ্ছিন্ন তটকে সংযুক্ত করেছে তেইশ মাইল দীর্ঘ চেসাপিক বে ব্রীজ টানেল। শুক্রবার বিকেলে গাড়ি চালিয়ে একাকী চলে যাই ব্রীজ টানেল পার হয়ে ওপারে একটি শান্ত দ্বীপে। ফিশারম্যান অভয়ারণ্যে। শত শত গাঙচিল দিকে দিকে উড়ে বেড়ায়। হেলে পড়া সূর্যের সোনালী রোদ গাঙচিলের ডানায় এঁকে দেয় ভ্যান গগের আঁচড়। হঠাৎ আটলান্টিকের কাকের চক্ষুর মত গভীর জল থেকে উঠে আসেন জীবনানন্দ দাশ। তাঁকে নিয়ে ঘুরে বেড়াই হাত ধরে ফিশারম্যানের ছোট্ট দ্বীপে। সেখানে জীবনের লেনদেন মিটিয়ে ফিরে চলি দিনান্তের ঠিকানায়!

কি তোমার হিংসা হচ্ছে? একটু হিংসা থাকা ভালো। সেদিন যদি একটু জোরালো হিংসা করতে তাহলে আজকের জীবন অন্যরকমও হতে পারত। তুমি বামপন্থী উদার মানুষ, তোমার তো আবার ওসব মানায় না।

ও আচ্ছা তুমি তো বাপু সাংঘাতিক চালাক মানুষ ! তোমার ঘরসংসারের খবর বেমালুম চেপে গেলে। বউ কি করে গো? খুব সুন্দরী বউ বুঝি! আশা করি এরপর তোমার সব খবর জানাবে। শরীর কেমন, কি কি বই লিখলে সব জানাবে। আর তোমার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন কতদূর , কোথায় পৌঁছুলো জানাতে ভুলো না কিন্তু। ইতি।

চার.

আজ তৃতীয় কেমো শেষ হল। প্রথম ও দ্বিতীয় কেমো ভালোভাবেই সহ্য করেছি। কিন্তু আজ শরীর বড্ড জ্বলছে। শরীর জ্বললে আমি কী করতে পারি ! কেন সে এসব মৃত্যুকণা লুকিয়ে রাখল এতদিন? এত এত সৈন্যসামন্ত রক্ষীবাহিনী শরীরের। তবে কি দায়িত্বে অবহেলা? নাকি বিনাযুদ্ধে আত্মসমর্পন?

শরীরের শক্তি রহিত হয়েছে। মনের জোর কোথায় গেল? সেই উদ্দাম দিনগুলো তবে কি কেবলই স্মৃতি? সেই টিএসসি। সেই হুডখোলা রিকসা। সে আর আমি।

গভীর রাত। আইসিইউ নিস্তব্ধ। কয়েকজন নার্স আর একজন জুনিয়র ডাক্তার আমাদের কয়েকজন রুগ্নভগ্ন মানুষকে পাহারা দিচ্ছেন। বাইরে শ্রাবণের অঝোর ধারা বইছে। হাসপাতালের পুরো গ্লাস ভেদ করে মাঝে মাঝে বিদ্যুৎঝলক দেখা যাচ্ছে। আমরা তাহলে কার অপেক্ষায়, কিসের অপেক্ষায় আছি?

“বহুকাল হল বসন্তদিন এসেছিল এক অতিথি নবীন,
আকুল জীবন করিল মগন অকূল পুলকপাথারে।

আজি এ বরষা নিবিড়তিমির, ঝরোঝরো জল, জীর্ণ কুটীর-
বাদলের বায়ে প্রদীপ নিবায়ে জেগে বসে আছি একা রে।

অতিথি অজানা, তব গীতসুর লাগিতেছে কানে ভীষণমধুর-
ভাবিতেছি মনে যাব তব সনে অচেনা অসীম আঁধারে।”

আমি কি কোন আর্ত চিৎকার করেছিলাম? ডিউটি ডাক্তার দ্রুত উঠে এসে বললেন, “আপনার কি কষ্ট হচ্ছে?

-ডক্টর, আজকের রাতটি এত দীর্ঘ কেন?

-কই না তো! বাইরে চমৎকার বৃষ্টি হচ্ছে।

-কিন্তু আমার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। আমাকে কি আরো কেমো দিতে হবে?

-আরো তিনটি কেমো শেষ করতে হবে।

-তিনটির আগেই যদি শেষ হয়ে যাই?

-শেষ হতে দিলে তো!

এই বলে ডাক্তার তাঁর ডান হাতখানি দিয়ে আমার ডান হাতখানি মুষ্টিবদ্ধ করে বললেন, “আমরা হারবার জন্য মাঠে নামিনি।”

হঠাৎ আমি ঈশ্বরকে দেখতে পেলাম। তিনি মিটিমিটি হেসে দেয়ালের পুরো গ্লাস ভেদ করে মুহূর্তে অদৃশ্য হলেন!

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

সারভাইক্যাল ক্যান্সার: কারণ, লক্ষণ ও করণীয় 

সারভাইক্যাল ক্যান্সার: কারণ, লক্ষণ ও করণীয় 

সারভাইক্যাল ক্যান্সার আমাদের দেশে খুব পরিচিত রোগ। তবে বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং সচেতনতার…

ভিআইপি রোগী

ভিআইপি রোগী

এমবিবিএস পাস করে কেবল ১৯৮৫ সনের নভেম্বর মাসে ইন-সার্ভিস ট্রেইনিং শুরু করেছি।…

রোগীকে যখন শান্তনা দেয়ার কোন ভাষা থাকে না

রোগীকে যখন শান্তনা দেয়ার কোন ভাষা থাকে না

আমার চেম্বারে একজন ভদ্রমহিলা আসলেন বুকে ব্যাথা নিয়ে। তার প্রেশার আনকন্ট্রোলড। আমি…

একটা দুইটা অ্যান্টিবায়োটিক খেলে কি হয়?

একটা দুইটা অ্যান্টিবায়োটিক খেলে কি হয়?

আমাদের শরীরের কিছু কিছু অসুখ আছে যেগুলো জীবাণুর কারণে হয়। বলা হয়…

গর্ভবতী মায়ের সন্তানের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কতটুকু, করণীয় কী?

গর্ভবতী মায়ের সন্তানের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কতটুকু, করণীয় কী?

ডেঙ্গু বিষয়ক নানা প্রশ্নের একটি হচ্ছে, গর্ভবতী মায়ের ডেঙ্গু হলে সন্তানেরও তা…

বুদ্ধিজীবী

বুদ্ধিজীবী

আমার সামনে বসা মধ্যবয়সী এক অত্যাধুনিক ভদ্রলোক! ঘাড় পর্যন্ত ঝুলানো লম্বা চুল,…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর