ওষুধ বানায় কি দিয়ে?


প্রায় সব রোগই যেমন প্রাকৃতিক কোন না কোন কারণে হয়, তেমনি প্রায় সব রোগের ওষুধই প্রকৃতিতে আছে। বেশীরভাগ রোগ শরীরে জীবাণু সংক্রমণের জন্য হয়। তাই শরীরে জীবাণু ধ্বংসকারী এন্টিবায়োটিক ওষুধ প্রয়োগ করে সংক্রমণ ভালো করা হয়। শরীরে হরমোন কমে গেলে রোগ হয়। শরীরে হরমোন প্রয়োগ করে তাই চিকিৎসা করা হয়। নানান কারণে রক্তের প্রেসার বেড়ে হাইপারটেনশন রোগ হয়। এন্টিহাইপারটেনসিভ ড্রাগ দিয়ে ব্লাড প্রেসার কমানো হয়। নানান কারনে শরীরে জ্বর হয়, শরীর ব্যাথা হয়। প্যারাসিটামল খেয়ে জ্বর কমানো হয়, ব্যথা কমানো হয়। এমন হাজারো সমস্যার আছে হাজারো ওষুধ।

সবারই মনের একটা ইচ্ছা আছে 'আমি যদি সব রোগের ওষুধ জানতে পারতাম! 'ডাক্তারগণ অনেক রোগের কারণ জানতে পেরেছেন, যেগুলো আবিষ্কার হয়েছে। আবার বেশ কিছু রোগের কারণ এখনও আবিষ্কার হয়নি। এইগুলোকে বলা হয় ইডিওপ্যাথিক রোগ। অনেক রোগের ডায়াগনোসিস ডাক্তারগণ করতে পারেন। কিন্তু সব রোগের চিকিৎসা করতে পারেন না। কারণ, কিছু কিছু রোগের ওষুধ এখনো আবিষ্কার হয় নাই। হলেও কিছু কিছু ওষুধের ক্ষেত্রে ভেজাল ঢুকে গেছে। চিকিৎসার জন্য যেমন ভালো ডাক্তার চাই, তেমনি ভালো ওষুধেরও প্রয়োজন। সবাই চায় হাতের কাছেই যদি ভালো ওষুধ পাওয়া যেতো।

প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই মানুষ অসুস্থ হলে গাছ গাছরার পাতা লতা গুল্ম খেয়ে বা পাতার রস খেয়ে সুস্থ হবার চেষ্টা করেছে। এখনো এই বিজ্ঞানের যুগে কিছু কিছু শিক্ষিত লোকদের মধ্যেও গাছের পাতা ছেঁচে রস করে খেয়ে রোগমুক্তি হবার প্রবনতা লক্ষ্য করা গেছে।

মনে করেন, একজন জানতে পারলেন ডেঙ্গু ভাইরাসের কার্যকরী কোন এলোপ্যাথিক ওষুধ নেই। শুধু সিমটোমেটিক চিকিৎসা দিতে হয় এবং কম্পলিকেশন বা জটিলতার চিকিৎসা দিয়ে মৃত্যুঝুঁকি কমিয়ে আনা যায়। এই রোগে রক্তের প্লেটলেট কাউন্ট কমে যায়। তিনি ডেঙ্গু জ্বর হয়ে প্লেটলেট কমে গেলে পেঁপের পাতার রস খেয়ে দুই এক দিন পর প্লেটলেট কাউন্ট করিয়ে দেখলেন প্লেটলেট বেড়েছে। তাই, তিনি তার আত্বীয়স্বজন আরো যাদের ডেঙ্গু হয়ে প্লেটলেট কাউন্ট কমেছে তাদেরকেও পেঁপে পাতার রস খাওয়ালেন। দুই এক দিন পর তাদেরও প্লেটলেট কাউন্ট বেড়ে গেলো। এই সংবাদ তিনি বন্ধু মহলে প্রচার করাতে সবাই তার কথা মতো পেঁপে পাতার রস খেলেন। পেঁপে পাতা সাবার হয়ে গেলো বাগান থেকে। পেঁপে উৎপাদন কমে গেলো। মুল্যবান একটি অর্থকড়ি সবজি পেলোনা জনগণ!

আসলে কি তাই? পেঁপে পাতা রসে কি প্লেটলেট কাউন্ট বাড়ায়? যেই সেই কেউ বললেই হবে না। গবেষণা করে প্রমাণ করে সাইন্টিফিক জার্নালে প্রকাশ করে ফুড এন্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন থেকে অনুমোদন নিয়ে যে ইনগ্রেডিএন্ট-এ প্লেটলেট কাউন্ট বাড়ায় তা মানুষের শরীরে অন্য কোন ক্ষতি করে কিনা বা অন্য ওষুধের সাথে ইন্টারেকশন করে কিনা, এর নিরাপদ ডোজ কি তা নিশ্চিত হবার পর এটা ডাক্তারগণ রোগীর জন্য প্রেস্ক্রিপশন করতে পারবেন।

মানুষের শরীরে যেমন রোগ হয় তেমনি শরীরেরও নিজস্ব ক্ষমতা আছে রোগ সারিয়ে তোলার। শরীর থেকে ভাইরাস নির্মুল করে শরীরেরই কোষে। শরীরের প্লেটলেট বাড়ায় শরীরেরই রসে। অনেক ভাইরাস ও ব্যাক্টেরিয়া জনিত রোগ শরীরের নিজস্ব ক্ষমতায় তিন দিন বা সাত দিন বা দশ দিনেই ভাল হয়ে যায় শরীরের নিজস্ব ক্ষমতায়। কোন পাতার রসে নয়। প্লেটলেট বাড়ে শরীরের নিজস্ব ক্ষমতায়। পাতার রসে না। সে ক্ষেত্রে গজারি গাছের পাতার রস খাওয়ালেও প্লেটলেট বেড়ে গেছে মনে হবে।

এইভাবে মানুষের পর্যবেক্ষণ থেকেই মূলত রিসার্চ করে পাতা গুল্মের নির্জাস থেকে অনেক ওষুধের মূল উপাদান আবিষ্কার করা হয়েছে। যখন কোন একটি নির্দিষ্ট গাছের উপাদানে রোগ নিরাময় হয় বলে মানুষ অনুমান করেছে তখনি বিজ্ঞানীরা তা নিয়ে রিসার্চ করেছে। রিসার্চ করে কার্যকরী কোন উপাদান পেলে তারা তা এনিমাল (ইদুর ও গিনিপিগ) -এ প্রয়োগ করে নিশ্চিত হয়েছে। কার্যকরীতা দেখেছে। সাইড ইফেক্ট ও ড্রাগ ইন্টারেকশন দেখেছে। তারপর কিছু রোগীর উপর পরীক্ষা করে নিরাপদ কিনা তা নিশ্চিত হয়ে ফুড এন্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন থেকে অনুমোদন নিয়ে বাজারজাত করেছে ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, সিরাপ ও ইঞ্জেকশন আকারে। ওষুধ শুধু গাছে থেকেই না, প্রাণী ও খনিজ উপাদান থেকেও আবিষ্কার ও উৎপন্ন হয়েছে।

আমাদের বাড়ির আসে পাসে এমন ওষুধি গাছ গাছড়া আছে। অনেকেই নিজেরা তুলে খান রোগ নিরাময়ের জন্য। শুনেছি, কেউ কেউ থানকুনির পাতা খান ডায়াবেটিস কমামোর জন্য। ধরে নিলাম থানকুনির পাতায় ডায়াবেটিসের ওষুধ আছে। কিন্তু কি পরিমান আছে তা কি আমরা জানি? কার জন্য কয়টি পাতা খেতে হবে তা কি আমরা জানি? এই পাতায় অন্য কোন ওষুধ আছে কিনা যা আমার শরীরের অন্য কোন ক্ষতি হয়। গাছের পাতাই হোক আর কেমিকেল সাবস্টেন্সই হোক শুধু রোগ সারালেই আমরা খাব না। শুধু খাব রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে উৎপাদিত ও বাজারজাতকৃত ঔষধ প্রেস্ক্রিপশনে নির্দেশ অনুযায়ী।