ডা. কাওসার উদ্দিন

ডা. কাওসার উদ্দিন

সহকারী সার্জন

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।


১০ অগাস্ট, ২০১৯ ০৯:৩৫ এএম

স্যারগো কি ছুটি নাই, আহারে..!

স্যারগো কি ছুটি নাই, আহারে..!

আজও ৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হল। সব মিলিয়ে ইনডোরে এখন ১০ জন। এর মধ্যে দুজন ছিল যাদের ট্রাভেল হিস্ট্রি নাই। উপজেলা চেয়ারম্যান দেখতে আসছিলেন। অমুক তমুক সাংবাদিক থানা পুলিশ ফোন দিচ্ছে একের পর এক। একা চিকিৎসা দিতে গিয়ে জান যত না ওষ্ঠাগত, তার চেয়ে বেশি বিরক্ত তাদের প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে।

থানার ওসি সাহেব ফোন দিয়েছেন -ওসি বলছি।

- জি বলুন।

- অমুক নামের এক রোগী ভর্তি আছে আপনাদের হাসপাতালে?

- রোগী তো অনেক ভর্তি। সবার নাম তো মনে নেই।

আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই কর্তৃত্বের সুরে -আপনি চিকিৎসা দিছেন, নাম মনে নেই!

- জি মনে নেই। কবে, কখন, কি সমস্যা নিয়ে ভর্তি হয়েছিল সেটা বলুন।

তিনি এবার বেশ কৈফিয়তের সুরে জোর গলায় বললেন -আপনি চিকিৎসা দিছেন, আপনি জানেন না, আর আমি বলবো কবে কি সমস্যা নিয়ে ভর্তি হইছে?

মেজাজটাই গেল গরম হয়ে। আমি এবার একটু উচ্চস্বরে বললাম -ওসি সাহেব, স্যরি টু সে, আপনি আমার সাথে এই ভঙ্গিতে কথা বলতে পারেন না। এই হাসপাতালে ৫০ জন রোগী ভর্তি আছে, নতুন রোগী আসে, অনেকে ছুটি নিয়ে চলে যায়। সবার নাম ঠিকানা মুখস্থ রাখা আমার দায়িত্ব না। আমি আপনার কাছে জবাবদিহিতা করতেও বাধ্য না। আপনার কিছু জানার প্রয়োজন হলে আপনি হাসপাতালে এসে জানুন!

আমার রিএকশন দেখে উনি একটু চুপসে গেলেন মনে হয়। এবার কিছুটা নরম স্বরে -না, আমার এক কনস্টেবল ভর্তি, ডেঙ্গু হইছে। আমি দেখতে আসবো, আর কি অবস্থা এখানে রাখা যায় কিনা!

- আপনার থানা জনবলে ভর্তি, আর এই হাসপাতালে ২০ জনের কাজ ২ জন দিয়ে চলে, কথাটা মনে রাখবেন। এই বলে গ্যাচাং করে কলটা কেটে ফোনটা বিছানার উপর ছুড়ে মারলাম!

নতুন যন্ত্রণা। ঈদপূর্ব অনেকের মেকি আবেগীয় জিজ্ঞাসা -স্যার বাড়িতে কবে যাবেন? স্যারগো কি ছুটি নাই, আহারে..? গরুর দাম কইতে কইতে মানুষ যেমন বিরক্ত হয়ে চুপ থাকে, আমিও তেমনি এসব প্রশ্নে দাঁত দু'পাটি বের করে একটু কৃত্রিম হাসি দিয়ে চুপ থাকি!

আজ শুক্রবার। তবুও সকাল থেকে অনেক রোগী। দেখতে দেখতে ১.২০। কোন রকম দৌড়ে নামাযে গেলাম, জামায়াত দাঁড়িয়ে গেছে। সুন্নাত নামাযের মধ্যে আবার ইমার্জেন্সি ফোন বাজা শুরু। তাড়াহুড়ায় সাইলেন্ট করতেও মনে নেই। বাম হাত দিয়ে ফোন কাটি, আবার কল, আবার কাটি। কোনরকম নামায শেষে আবার দৌড়। রোগী এটেন্ড করে বেলা ৩.১৫। হোটেলে গিয়ে দেখি তেমন কিছু নাই, একদিকে দেরী হইছে, অন্যদিকে অধিকাংশ অফিস ছুটি, তাই রান্নাও কম, শুধু সিং মাছ আছে।

- স্যার লবনটা আইজ একটু বেশি!

কোন রকম সেটা দিয়ে দুটো ভাত নাকে মুখে গুঁজে কোয়ার্টারে। ঘুম ঘুম পাচ্ছে। বেলা ৪ টা। মাথাটা একটু ধরা, ফোন দিয়ে মেডিকেল এসিস্ট্যান্টকে বললাম, 'ঘুমাবো, একদম ডাকবেন না, রোগী আসলে পারলে ট্রিটমেন্ট করবেন, না পারলে সোজা রেফার!'

আধঘন্টা ধরে গড়াগড়ি খেতে খেতে চোখটা সবেমাত্র বুজেছি, ঠিক তখনি ফোনের শব্দ! ধরমড়িয়ে জেগে উঠি। হঠাৎ জেগে ওঠায় বেশ পালপিটেশন হচ্ছে। ফার্মেসি দোকানদারের ফোন, 'স্যার একটা পয়জনিং রোগী ছিলো! একটু যদি কষ্ট করে আসতেন!'

- রোগী আসছে, তো আপনি ফোন দিছেন কেন? ফোন তো দিবে স্যাকমো!

মেজাজটা ভাল হওয়ার কোন সুযোগই নাই। হাজির হই হাসপাতালে। ওয়াশ, অর্ডার লেখে শেষে দেখি মাথাটা বেশ জিমজিম করছে, চোখটাতেও বেশ ব্যাথা, জানি না কেন।

সন্ধ্যা ৬ টা। রুমে এসে পড়ার টেবিলে বসি। টেবিলটা জানালার পাশেই। মেইন রাস্তাটা দেখা যায়। ঢাকা ফেরত বাসগুলো সাই সাই করে একটু পরপর এসে থামছে। বিষন্ন সন্ধ্যায় সেদিকে চেয়ে থেকে নবাগত মানুষের কোলাহল দেখি শুধু, এই যা আনন্দের...

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত