০৯ অগাস্ট, ২০১৯ ০৮:৩৭ পিএম

ঝুঁকি নিয়ে ডেঙ্গু চিকিৎসায় ডাক্তাররা, ভাতার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

ঝুঁকি নিয়ে ডেঙ্গু চিকিৎসায় ডাক্তাররা, ভাতার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

মো. মনির উদ্দিন: সারাদেশে ডেঙ্গুর বিস্তার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রায় প্রতিদিন রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে রেকর্ড সংখ্যক রোগী ভর্তি হচ্ছেন। আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি নিয়েই সেবা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন ডাক্তার, নার্স ও হাসপাতালের কর্মীরা। পেশাগত জীবনে কোনোরূপ ঝুঁকিতে পড়লে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সদস্যদের জন্য ভাতাসহ বিভিন্ন সুবিধার ব্যবস্থা রয়েছে। অথচ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেবা দিয়ে যাওয়া চিকিৎসকদের জন্য কোনো ভাতার ব্যবস্থা নেই। ভাতা না পেলে এতো চমৎকার সেবা ব্যাহত হতে পারে আশঙ্কা করে বিশেষজ্ঞরা বলেন, ছুটি বাতিল হওয়ায় তাদেরকে একটি ইনসেনটিভ দেওয়া উচিত। তারা আরও বলেন, সরকারের উচিত ডাক্তারি পেশার ঝুঁকি রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের জন্য ভাতার প্রচলন করা। 

এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ মেডিভয়েসকে বলেন, ‘নিরাপত্তা না পেলে ভালোভাবে কাজ করবে কিভাবে? এতো খাটনি, তার মধ্যে যদি একটু নিরাপত্তা না পায়, তাহলে তো সমস্যা। এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। কর্মস্থল যদি নিরাপদ না হয়, যে কাজ তাদের করতে হয়, ডাবল-ট্রিপল দায়িত্ব পালন, এতো রোগী, কতগুণ বেশি কাজ করতে হচ্ছে, ঝুঁকি তো আছেই। সেজন্য সরকারের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। তারা যদি স্বাচ্ছন্দবোধ না করে তাহলে এতো সুন্দর চিকিৎসা সেবা ব্যাহতও হতে পারে।’

এ ভাতা কোন প্রক্রিয়ায় হতে পারে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে সরকারই সিদ্ধান্ত নিবে। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কর্মস্থলে পুলিশ-আনসার নিয়োগ দিতে পারে। সেক্ষেত্রে তারা একটি কমিটি করতে পারে, আইন করতে পারে। আইনের ব্যত্যয় ঘটলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে।’

এ নিয়ে নিজের ভাবনার কথা জানিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. শুভাগত চৌধুরী মেডিভয়েসকে বলেন, ‘পেশাগত সংগঠনগুলো এ নিয়ে কথা বলবে। ব্রিটেনে সুরক্ষা আইন বাস্তবায়নে ব্রিটিশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন সহায়তা করছে। সেখানে ব্রিটিশ ডক্টরস সোসাইটি আছে, তাদেরকে ব্রিটিশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন সহযোগিতা করে। এজন্য সরকারকে বলে লাভ নেই, আগে এ রকম প্রোটেকশন সোসাইটি গড়ে তুলতে হবে। তারা সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। তাদের আইনি পরামর্শকও থাকবে। বিএমএ গঠনের শুরুতে আমরা এরকম একটি উদ্যোগ নিয়েছিলাম। এজন্য বিএমএতে আইনজীবীও ছিল।’

অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী বলেন, প্রত্যেক পেশায়ই ঝুঁকি আছে। তবে চিকিৎসক পেশায় ঝুঁকি বেশি। এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ পেশা, অন্য পেশার মতো না।

চিকিৎসকদের যে কোনো ঝুঁকিতে প্রোটেকশন সোসাইটি কাজ করবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গুতে চিকিৎসকদের মৃত্যু হচ্ছে। এতগুলো মানুষ মারা গেলো, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো দুঃখ প্রকাশ করলো না। একজন পুলিশ আক্রান্ত হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কথা বলেন, কিন্তু এখানে কোনো দুঃখ প্রকাশ নাই। এ পেশার উল্লেখযোগ্য কেউ এ নিয়ে কথা বলেনি। অনুজ চিকিৎসকদের নাম কেউ নিতে চাচ্ছে না।’

অন্য পেশার লোকদের ঝুঁকি ভাতা প্রদান করা হলে চিকিৎসদের কেন দেওয়া হবে না জানতে চেয়ে তিনি বলেন, ‘অন্যদের মতো চিকিৎসকরাও একটা পেশার মানুষ। একজন চিকিৎসক প্রাইভেট প্রাকটিসও করতে পারে, সরকারি চাকরিও করতে পারে। সরকারি চিকিৎসক তো সরকারি অন্য পেশার মতোই। সুতরাং অন্য পেশায় দিলে চিকিৎসকদেরও দেবে। তাদেরও বিধিবদ্ধ থাকা উচিত। তবে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে এ ভাতা প্রদান করা হয় কিনা, তা আমি নিশ্চিত নই।’

চিকিৎসকদের অন্যতম সংগঠন ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি অ্যান্ড রাইটসের (এফডিএসআর) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আবুল হাসনাত মিল্টন মেডিভয়েসকে বলেন, ‘যেসব পেশার সঙ্গে ঝুঁকি জড়িত, তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে ঝুঁকি ভাতা পায়। কিন্তু চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি ভাতার বিষয়ে আমরা আগে থেকে বলিনি। সম্প্রতি এ ধারণাটা এসেছে। এ ডেঙ্গুর সময়ে চিকিৎসকরা নিজের জীবন বাজি রেখে, জীবন বিপন্ন করে দিন-রাত পরিশ্রম করে সেবা দেওয়ার প্রেক্ষাপটে দাবিটা এসেছে। তারাও ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে, তারাও ঝুঁকি ভাতা পাওয়ার যোগ্য।’

তিনি বলেন, ‘এফডিএসআর এই দাবিটি জানিয়েছে। কিন্তু ডাক্তাররা এই মুহূর্তে ঝুঁকি ভাতার দিকে তাকিয়ে নেই। শুধু ডেঙ্গুতে না, বরং যে কোনো বিপর্যয়ে তারা মানুষের সেবা, রোগীর চিকিৎসাটাকে প্রাধান্য দিয়েছে। একটা অসাধারণ মানবিক পেশাজীবী শ্রেণী—যারা শুধু দিয়েই গেছে, নিজের পাওয়ার দিকটি দেখেনি। এর ফলে ডাক্তাররা শুধু ঝুঁকি ভাতা না বিভিন্ন সময় বঞ্চিত হয়েছে।’ 

ভাতা না পেলে তারা নিরুৎসাহিত হবেন কিনা—এমন প্রশ্নে জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি না, ডাক্তাররা তা ভাবছেনই না। আমি মনে করি, রাষ্ট্রের এটা দায়িত্ব ডাক্তারি পেশার যে ঝুঁকি আছে এটা সরকারিভাবে স্বীকৃতি দিয়ে ডাক্তার ঝুঁকি ভাতার প্রচলন করা। এটি সরকারি-বেরসকারি সব খাতেই নিশ্চিত করতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, সরকারই এটি বিবেচনায় নিয়ে দাবিটি মেনে নেবেন।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে এ দাবিটা পৌঁছাতে পারলে, এটি পূরণে তিনি যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন বলে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। 

এ প্রসঙ্গে হেমাটোলজি বিশেষজ্ঞ ডা. গুলজার হোসেন উজ্জ্বল মেডিভয়েসকে বলেন, ‘অবশ্যই তাদের ঝুঁকি ভাতা পাওয়া উচিত। একবার ভাবুন, যক্ষ্মা হাসপাতালে যেসব ডাক্তার কাজ করেন, তাদের কী অবস্থা? যক্ষ্মা ও কলেরা হাসপাতালে যেসব ডাক্তার কাজ করেন, তারা রোগের একটি এনডেমিক জোনে থাকে। সেটা নিঃসন্দেহে জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। যক্ষ্মা হাসপাতালে যে জীবানুটা আছে সবগুলো কিন্তু মাল্টি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট। চিকিৎসকরা ওষুধ খেয়ে রেজিস্ট্যান্ট থাকে।  এবং অনেক ডাক্তারের টিবি হয়েছে। হয়তো তারা চিকিৎসা করে ভালো হয়ে যায়। কিন্তু মাঝখানে যে ঝুঁকিটা গেলো, খরচ হয়ে গেলো। এটা তো অনাকাঙ্খিত। যক্ষ্মার জীবানু তাদের সারাজীবন বয়ে যেতে হয়। যারা রেডিয়েশনে (রেডিওথেরাপি) কাজ করেন, তাদের কথা ভাবুন, সেখানে সব সময় এক ধরনের রেডিয়েশন থাকে। যে রেডিয়েশনের কারণে তারও ক্যান্সার হতে পারে। যারা ক্যাথল্যাবে কাজ করে, কার্ডিওলজিস্ট যে অ্যানজিওগ্রাম করেন, তাদের কেউ কেউ ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ক্যাথল্যাবের সূচনা করেছেন যিনি—অধ্যাপক ডা. আবু সিদ্দিক, তিনি মারা গেছেন এমডিএসে। আমাদের দেশের হাসপাতালগুলোতে রেডিয়েশনের প্রটেকশন যথাযথ না। সুতরাং ডাক্তারদের ঝুঁকি ভাতা সব জায়গাতেই জরুরি।’

চিকিৎসকদের পেশাগত হয়রানি অনেক বেশি বলে মনে করেন এ বিশেষজ্ঞ। 

তিনি বলেন, ‘ছুটি বাতিল করা হয়েছে। এ ব্যাপারে কারও কোনো আপত্তি ও অসন্তোষ নাই। এ জায়গায় যেন শূন্যতা সৃষ্টি না হয়—সেজন্য চিকিৎসকরাই আরও সচেষ্ট। তবে সরকারেরও এই ভদ্রতা দেখানো উচিত, এ সময়ে যেসব ডাক্তার দায়িত্ব পালন করবেন, তাদের খাওয়া-দাওয়ার বিষয়ে খোঁজ রাখা। এছাড়া ঈদের ছুটি বাতিল হওয়ায় তাদেরকে একটি ইনসেনটিভ দেওয়া উচিত।’

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম-সচিব মেডিভয়েসকে বলেন, ‘বিষয়টি এখনও প্রস্তাবনা আকারে আছে। এ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এজন্য বড় অংকের অর্থ প্রয়োজন। এ কারণে এটি সময় সাপেক্ষ।’

সিন্ডিকেট মিটিংয়ে প্রস্তাব গৃহীত

ভাতা পাবেন ডিপ্লোমা-এমফিল কোর্সের চিকিৎসকরা

প্রস্তুতির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

অক্টোবর-নভেম্বরে ২য় ধাপে করোনা সংক্রমণের শঙ্কা

সিন্ডিকেট মিটিংয়ে প্রস্তাব গৃহীত

ভাতা পাবেন ডিপ্লোমা-এমফিল কোর্সের চিকিৎসকরা

প্রস্তুতির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

অক্টোবর-নভেম্বরে ২য় ধাপে করোনা সংক্রমণের শঙ্কা

সিন্ডিকেট মিটিংয়ে প্রস্তাব গৃহীত

ভাতা পাবেন ডিপ্লোমা-এমফিল কোর্সের চিকিৎসকরা

প্রস্তুতির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

অক্টোবর-নভেম্বরে ২য় ধাপে করোনা সংক্রমণের শঙ্কা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি