ঢাকা শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ৩ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৬ ঘন্টা আগে
ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

বিভাগীয় প্রধান, প্যাথলজি,

শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ।


০৯ অগাস্ট, ২০১৯ ১১:৪৬

জ্বরের নানান কারণ ও তার পরীক্ষা

জ্বরের নানান কারণ ও তার পরীক্ষা

জীবনে প্রায় সবারই জ্বর হওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে। জ্বর কিন্তু কোন রোগের নাম নয়। জ্বর হলো রোগের একটি লক্ষণ। যে পর্যন্ত কি রোগের লক্ষণ হিসাবে জ্বর হয়েছে তা জানা না গেছে সে পর্যন্ত রোগীকে পাইরেক্সিয়া অব আননোন অরিজিন হিসাবে চিহ্নিত করে রোগীকে ইনভেস্টিগেশন করে জ্বরের কারণ নির্নয় করা হয়। সাধারণত শরীরে জীবাণু প্রবেশ করে ইনফেকশন হওয়ার কারণে জ্বর হয়। ইনফেকশন থেকে ইনফ্লামেশন হয়। ইনফ্লামেশন স্থানে শরীর গরমকারী কেমিকেল মেডিয়েটর তৈরি হয়ে রক্তে প্রবাহিত হয়ে শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে শরীর গরম হয়। যাকে বলা হয় জ্বর।

যারা ডাক্তার নন তারা সাধারণত রোগীর কপালে ডান হাতের তালু রেখে গরম অনুভুত হলে জ্বর বলে থাকেন। মায়েরা সন্তানের পেটে হাতের তালু রেখে বলেন যে তার সন্তানের জ্বর হয়েছে। আসলে হাত দিয়ে জ্বর দেখতে হলে হাতের আঙ্গুলের পিঠের দিক রাখতে হবে কপালে। হাতের তালুয় সঠিক তাপমাত্রা অনুভুত হয় না। তাপমাত্রা সঠিক নির্নয় করার জন্য থার্মোমিটার প্রয়োজন। থার্মোমিটার বড়দের মুখে এবং বাচ্চাদের মলদ্বারে থার্মোমিটার রাখলে তাপমাত্রা বা জ্বর সঠিক মাপা হয়।

ইনফ্লামেশন হয়ে জ্বর হলে চিকিৎসার জন্য ভালো। জ্বর হয় বলেই রোগী ডাক্তার দেখায়। ডাক্তার জ্বরের কারণ নির্নয় করে চিকিৎসা দেন। ইনফেকশন হয়ে জ্বর না হলে রোগী ডাক্তার দেখাত না। তাতে ইনফেএকশন আরও ছড়িয়ে পড়তো। প্যারাসিটামল খেলে জ্বর কমে যায়। কিন্তু ইনফেকশন থেকে যায়। ডাক্তার সাধারণত জ্বরের প্রকৃতি দেখে কারণ নির্ধারণ করেন। একেক রোগের জ্বরের প্রকৃতি একেক রকম। প্যারাসিটামল খেলে সেই প্রকৃতি নষ্ট হয়ে যায়। একেক রোগের প্যাথলজিকেল টেস্ট একেক রকম। ডাক্তার প্যাথলজিকেল পরীক্ষা করে জ্বরের কারণ নির্নয় করেন। কি কারণে জ্বর হয়েছে জ্বরের প্রকৃতি দেখে প্যাথলজিকেল পরীক্ষা করালে পরীক্ষার সংখ্যা কম লাগতো। খরচও কমে যেতো। না জানতে পারলে সবগুলো জ্বরের পরীক্ষাই করাতে হয়।

সাধারণ ইনফেকশনের জন্য জ্বর হলো কিনা জানার জন্য রক্তের টিসি, ডিসি পরীক্ষা করাতে হয়। বেশীরভাগ ইনফেকশনে রক্তের টিসি (অব ডব্লিওবিসি) বেড়ে যায়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে কমে যায়। ডাক্তারগন জানেন কোন কোন জ্বরে বেড়ে যায় এবং কোন কোন জ্বরে কমে যায়। ডিসি (অব ডব্লিওবিসি) পরীক্ষায় বিভিন্ন জ্বরে বিভিন্ন রকম ডিফারেন্সিয়াল কাউন্ট হয়। বেশীরভাগ ইনফেকশন জ্বরে নিউট্রোফিল পার্সেন্ট বেড়ে যায়। কিছু কিছু জ্বরে কমে যায়। বেশীর ভাগ ভাইরাল জ্বরে লিম্ফোসাইট পার্সেন্ট বেড়ে যায়। এলার্জিক জ্বরে ইউসিনোফিল পার্সেন্ট বেড়ে যায়। ব্লাড ক্যান্সার হলেও জ্বর হয়। টিসি ডিসি পরীক্ষায় ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়ে। কয়েকটি দীর্ঘস্থায়ী জ্বর আছে যেখানে রক্তের ইএসআর বেড়ে হয়।

জ্বরের বিভিন্ন প্রকার: এতক্ষণ যে জ্বরের কথা বলা হলো সে জ্বর হলো ননস্পেসিফিক ইনফেকশন বা অনির্দিষ্ট ইনফেকশন জ্বর। বেশ কিছু নির্দিষ্ট নামে জ্বর আছে, যেমন, টাইফয়েড, পারাটাইফয়েড, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, ডেঙ্গু জ্বর, বাতজ্বর ইত্যাদি।

টাইফয়েড জ্বর হয় সালমোলেনা টাইফি নামক ব্যাক্টেরিয়ার ইনফেকশনের কারনে। এই জ্বর চিকিৎসা না করালে সাধারণত ২০ দিন পর এমনি ভালো হয়ে যায়। তাই, এই জ্বরকে গ্রামে মেয়াদী জ্বর বলা হতো। এই জ্বরের সাধারণ পরীক্ষা রক্তের ভিডাল টেস্ট। জ্বর হবার এক সপ্তাহ পর সাধারণত ভিডাল টেস্ট পজিটিভ হয়। অনেকে না বুঝে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই একদিনের জ্বরে ভিডাল টেস্ট করায়। তাতে নেগেটিভ হয়। মনে করে নেয় তার টাইফয়েড হয় নাই। আবার এন্টিবায়োটিক সেবন করলেও এই টেস্ট নেগাটিভ হয়। তাই, সে মনে করে নেয় টাইফয়েড হয় নাই। তবে জ্বর হবার সাথে সাথে টাইফয়েডের পরীক্ষা করাতে চাইলে ব্লাড কালচার করাতে হবে। তবে এটা ব্যয়বহুল ও সময় সাপেক্ষ পরীক্ষা। সব ল্যাবে হয় না। সময় লাগে কমপক্ষে ৪৮ ঘন্টা।

টাইফয়েডের অনুরূপ আরেকটা জ্বর হলো প্যারাটাইফয়েড। এই জ্বর সালমোনেলা প্যারাটাইফি ব্যাক্টেরিয়ার ইনফেকশনের জন্য হয়। পরীক্ষাও একই রকম অর্থাৎ ভিডাল টেস্ট ও ব্লাড কালচার। সালমোলেনা জীবাণু খাবার ও পানির সাথে দেহে প্রবেশ করে ক্ষুদ্রান্তে ইনফেকশন করে জ্বর হয়। রক্তের টিসি সাধারণত বাড়ে না। ডিসিতে সাধারণত লিম্ফোসাইট পারসেন্ট বেশী থাকে।

ম্যালেরিয়া জ্বর হয় প্লাজমোডিয়াম প্যারাসাইটিক ইনফেকশনের কারনে। এই রোগের জীবাণু রক্তের আরবিসির ভিতর থাকে। তাই, এক ফোটা রক্ত স্লাইডে নিয়ে স্মিয়ার তৈরি করে সেই স্মিয়ার স্টেইন করে মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখে আরবিসির ভিতর এই প্যারাসাইট পাওয়া যায়। ফিমেল এনোফিলিস মশা এই প্যারাসাইট ক্যারি করে। তাই এই মসা কামরালে ম্যালেরিয়া জ্বর হয়। এক সময় সারাদেশে মশানাষক কেমিকেল এক যোগে স্প্রে করা হয়। তাই, এখন দেশে ম্যালেরিয়া খুব কম পাওয়া যায়। আগের দিনে টেকনোলোজিস্টদেরকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল স্লাইড দেখে ম্যালেরিয়া সনাক্তকরণ করতে।

জ্বর হলেই ম্যালেরিয়া টেস্ট করা হতো এই কারনে যে ম্যালেরিয়া নির্মুল হচ্ছে কি না। কোন কোন অল্প ট্রেনিং প্রাপ্ত টেকনোলজিস্ট আরবিসির অন্যান্য ইনক্লুশনকেও ম্যালেরিয়ার জীবাণু মনে করে ম্যালেরিয়া পজিটিভ কেইস লিখে দিতো। অনেকে তাকেই বেশী এক্সপার্ট মনে করতো এই কারনে যে সে ঘন ঘন ম্যালেরিয়া জীবাণু ধরতে পারে। আরবিসিতে ম্যালেরিয়া জীবাণু খোজা সময় সাপেক্ষ। এখন আইসিটি মেথডে অল্প সময়ে রক্তে ম্যালেরিয়া রোগের জীবাণু আছে কিনা তা জানা যায়।

কালাজ্বর হয় লেইশমেনিয়া ডনোভানি প্যারাসাইটের ইনফেকশনের কারনে। এই জীবাণু সংক্রমণ হয় সেন্ডফ্লাই বা বালু মাছির দ্বারা। এই জীবানু আক্রান্ত বালু মাছি কাউকে কামড়ালে কালাজ্বর হয়। এই জ্বরে শরীর কালো হয়ে যায়। কয়েক মাস পর্যন্ত এই জ্বর থাকে। এই জ্বরে প্লিহা বা পিলা বড় হয়ে যায়। এই জীবাণু প্লিহা ও বোন ম্যারো (অস্থিমজ্জা) -এর ম্যাক্রোফেজ কোষের ভিতরে পাওয়া যায়। তাই এই রোগ পরীক্ষার জন্য বুকের হাড় থেকে সুই দিয়ে বোন ম্যারো নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। গ্রাম এলাকায় রক্ত নিয়ে এল্ডিহাইড টেস্ট করা হয়। তবে এই পরীক্ষাটা তেমন কার্যকরী না। আইসিটি মেথডে অল্প সময়ে রক্ত থেকে এই রোগ ডিটেক্ট করা যায়।

ডেঙ্গুজ্বর হয় ভাইরাস দিয়ে। ডেঙ্গু ভাইরাসবাহী এডিস মশায় কামড়ালে ডেঙ্গুজ্বর হয়। এই জ্বরে রক্তের প্লেটলেট কাউন্ট কমে যেতে পারে। তাই প্লেটলেট কাউন্ট করা হয়। রক্তের হিমাটোক্রিট বেড়ে যায়। তাই হেমাটোক্রিট পরীক্ষা করা হয়। জ্বরের প্রথম দিকে রক্তের ডেঙ্গু এনএস-১ এন্টিজেন ডিটেক্ট করা হয় আইসিটি অথবা এলাইজা মেথডে। শেষের দিকে রক্তের ডেঙ্গু এন্টিবডি আইজি-এম এবং আইজি-জি ডিটেক্ট করা হয় আইসিটি অথবা এলাইজা মেথডে।

বাতজ্বর হয় গলায় গ্রুপ এ স্ট্রেপ্টোকক্কাস ইনফেকশনের কারনে। এই জ্বরে শরীরের বড় বড় গিড়ায় প্রদাহ হয়ে ব্যাথা হয়। এক গিড়ার ব্যাথা কমে গিয়ে আরেক গিড়ায় ধরে। শেষের দিকে হার্টেও প্রদাহ হয়। হার্টের বালব নষ্ট হতে পারে। এই রোগে থ্রট কালচার করা হয় একটিভ স্ট্রেপ্টোকক্কাস ইনফেকশন আছে কি না জানার জন্য। অন্যান্য ক্রাইটেরিয়ার সাথে তুলনা করার জন্য রক্তের এএসও টাইটার পরীক্ষা করা হয়। টাইটার বেশী হয় সাধারণত বাত জ্বরে। তবে টাইটার বেশী হলেই বাতজ্বর না।

প্রস্রাবে ইনফেকশন থাকলেও জ্বর হয়। প্রস্রাবে ইনফেকশন থাকলে পাস সেল বেশী থাকে। সাধারণত মাইক্রোস্কোপে প্রতি হাই পাওয়ার ফিল্ডে ৫ টার উপরে হলে ইনফেকশন আছে ধরে নিতে হয়। কিডনি, ইউরেটার, ইউরিনারি ব্লাডার, ইউরেথ্রা ও প্রস্টেটের ইনফেকশনের কারনে প্রস্রাবে পাস সেল বেশী পাওয়া যায়। ইউরিন বা প্রস্রাব কালচার করে সঠিক জীবাণু ডিটেক্ট করা হয়। তবে তাতে কম পক্ষে ৪৮ ঘন্টা সময়ের প্রয়োজন। এন্টিবায়োটিক প্রয়োগ হয়ে গেলে কালচার নেগেটিভ হতে পারে।

হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি ও ই ভাইরাস দিয়ে লিভার আক্রান্ত হলে জন্ডিস জ্বর হয়। আইসিটি ও এলাইজা মেথডে রক্ত পরীক্ষা করে এই সব ভাইরাস সহজেই ডিটেক্ট করা যায়।

বিভিন্ন রকম ব্যাক্টেরিয়া ও ভাইরাস দিয়ে গলা ইনফেকশন হলে ফেরিঞ্জাইটিস হয়ে জ্বর হয়। নাকের আশেপাশের সাইনাস ইনফেকশন হলে সাইনোসাইটিস বলে। তাতেও জ্বর হতে পারে। এক্সরে করে সাইনাস দেখা হয়। গল ব্লাডার বা পিত্তথলিতে ইনফেকশন হলে কলিসিস্টাইটিস বলে। তাতেও জ্বর হয়। মেয়েদের ডিম্বনালীতে ইনফেকশন হলে সালফিঞ্জাইটিস বলে। তাতেও জ্বর হয়। ব্রেইনের পর্দার ভিতর মেনিঞ্জাইটিস হলেও জ্বর জয়। মেরুদন্ডের ভিতরে সুই দিয়ে সিএসএফ এনে পরীক্ষা করে মেনিঞ্জাইটিসের কারন নির্নয় করা হয়। কোথাও ফোড়া হলে তো জ্বর হবেই। টিউবারকিউলোসিস বা যক্ষা রোগে অল্প অল্প জ্বর হয় সাধারণত বিকেল বেলা।

তাতে দেখা যাচ্ছে জ্বরের আছে নানান কারণ। অনেকে জ্বর কমানোর জন্য প্যারাসিটামল ঔষধ সেবন করেন। তাতে জ্বরের প্যাটার্ন পরিবর্তন হয়ে যায়। ডাক্তারের কাছে গেলে তখন ক্লিনিকালি জ্বর নির্নয় করতে পারেন না। প্যাথলজিকাল টেস্ট করে ডাক্তারকে জ্বরের কারণ নির্নয় করতে হয়। কেউ কেউ ডাক্তারের ফি বাচানোর জন্য নিজে নিজেই ল্যাবরেটরিতে গিয়ে জ্বরের পরীক্ষা করান। তাতে, সব সময় সঠিক পরীক্ষাটি করাতে পারেন না। পরীক্ষা করাতে হলে আগে জানতে হবে কি কারনে তার জ্বর হতে পারে, এই সময়ে রোগীর কোন পরীক্ষাটি প্রয়োজ্য। কাজেই আগে ডাক্তার দেখাতে হবে। ডাক্তারই নির্বাচন করবেন রোগীর জন্য কোন পরীক্ষাটি প্রযোজ্য।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত