ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯, ৭ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৪৯ মিনিট আগে
ডা. মুহাম্মাদ আনিসুর রহমান

ডা. মুহাম্মাদ আনিসুর রহমান

চিকিৎসক, প্রাবন্ধিক


০৭ অগাস্ট, ২০১৯ ১৮:৪৫

আপনার শিশুকে কখন কোন টিকা দেবেন

আপনার শিশুকে কখন কোন টিকা দেবেন

‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’, কবি গুণাকর ভারত চন্দ্র রায়ের মতো সকল বাবা-মা তাদের স্রষ্টার কাছে এই প্রার্থণাই করেন৷ সন্তানের সুস্থ সবল বেড়ে উঠাই তাদের একান্ত কামনা৷

পৃথিবীর আলোর মুখ দেখার সঙ্গে সঙ্গেই শিশুরা নানান সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্তের ঝুঁকিতে থাকে৷ এসব ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু ও পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে কোটি কোটি শিশুকে৷ তাদের বেড়ে উঠাকে সুন্দর ও সাবলীল করতে শত শত বছর ধরে বিজ্ঞানীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন৷ ইতোমধ্যে আবিষ্কার করেছেন বেশ কিছু রোগের প্রতিষেধক ভ্যাক্সিন বা টিকা, যা কোটি কোটি শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে সহায়তা করেছে৷ বাংলাদেশ সরকারও বিভিন্ন সংস্থা ও দেশীয় অর্থায়নে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিসহ (ইপিআই) বিভিন্ন টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে৷

আজ আপনাদের জন্য আলোচনা করবো টিকাদানের বিভিন্ন দিক নিয়ে৷ আপনার সম্তানকে কখন কোন টিকা দিবেন এবং কেন দিবেন৷

জন্মের পর পর: বিসিজি (BCG) টিকা, এটি যক্ষার টিকা৷ যেসব অঞ্চলে যক্ষা ও কুষ্ঠরোগের প্রাদুর্ভাব সেসব এলাকায় শিশুদের এই টিকা দেয়া হয়৷ এটি শিশু জন্মের পর পরই দিতে হয়৷ তবে কোন কারণে জন্মের পর দেয়া সম্ভব না হলে ৬ সপ্তাহের মধ্যে অবশ্যই দেয়া উচিত৷ এটি শিশুর বাম বাহুর উপরের অংশের চামড়ার মধ্যে দেয়া হয়৷

যক্ষা আমাদের দেশে কতটা ভয়াবহ তা একটি রিপোর্টে চোখ বুলালেই পাওয়া যাবে৷ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৬ রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর নতুন করে তিন লক্ষ ৬২ হাজার মানুষ যক্ষায় আক্রান্ত হচ্ছে এবং প্রতিবছর প্রায় ৭৩ হাজার মানুষ এতে মৃত্যুবরণ করছে৷ তাই আপনার শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিসিজি টিকার কোনো বিকল্প নেই৷

৬ সপ্তাহ বয়সে: শিশুর বয়স যখন ৬ সপ্তাহ হবে তখন তাকে পেন্টাভ্যালেন্ট, ওপিভি, আইপিভি এবং পিসিভি টিকার প্রথম ডোজ দিতে হবে৷ পেন্টাভ্যালেন্ট পাঁচটি রোগের প্রতিষেধক৷ ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, ধনুষ্টঙ্কার, হেপাটাইটিস-বি এবং হেমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা-বি হতে শিশুকে সুরক্ষা দিবে, যা বাম উরুর মাংশপেশীতে দেয়া হয়৷ ওপিভি ও আইপিভি সুরক্ষা দিবে পোলিও হতে৷ যা যথাক্রমে মুখে ও ডান বাহুর উপরের অংশের চামড়ার মধ্যে দেয়া হয়৷ এছাড়া নিউমোকক্কাল নিউমোনিয়া হতে সুরক্ষা দিবে পিসিভি টিকা৷ এটি ডান উরুর মাংশপেশীতে দেয়া হয়৷

বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচির একটি অন্যতম সাফল্য হলো ব্যাকটেরিয়াঘটিত রোগ ডিপথেরিয়া নির্মূল করা৷ সর্বশেষ ১৯৮৩ সালে দেশে ডিপথেরিয়া রোগী শনাক্ত করা হয়৷ তারপর থেকে আর কোনো রোগীকে শনাক্তকরা যায়নি৷ তবে ২০১৭ সালের ৩ নভেম্বর কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা শিবিরে একজন নারীর দেহে ডিপথেরিয়া শনাক্ত করা হয়৷ এরপর থেকে এই সংখ্যা বাড়ছেই৷ সেহেতু ডিপথেরিয়ার টিকা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা এখনও রয়েছে বলা যায়৷

হুপিং কাশি শিশুদের শ্বাসযন্ত্রের অন্যতম অসুখ৷ প্রতিবছর পৃথিবীতে বিভিন্ন বয়সী প্রায় ৫১ কোটি মানুষ হুপিং কাশিতে আক্রান্ত হচ্ছে৷ এর মধ্যে প্রায় ৬ লক্ষ মানুষ মৃত্যুবরণ করছে৷ তাই হুপিং কাশির টিকা গ্রহণ শিশুদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ৷

ধনুষ্টঙ্কার বা টিটেনাস একটি মারাত্মক রোগ—যা খিচুঁনি তৈরি করে৷ বিশ্বব্যাপী টিটেনাস টিকাদানের ফলে নবজাতকের ধনুষ্টঙ্কারে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার কমে এসেছে৷ ১৯৯৯ সালে যেখানে মৃত্যুর সংখ্যা ছিলো দুই লক্ষ, ২০১০ সালে তা নেমে আসে ৫৮ হাজারে৷ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২০১৬ সাল নাগাদ পৃথিবীতে নবজাতকের টিটেনাসে আক্রান্তের সংখ্যা শতকরা ৯৭ ভাগ কমানো সম্ভব হয়েছে৷

হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা-বি খুবই মারাত্মক ইনফেকশন, এতে মৃত্যু ঘটতে পারে৷ ২০০০ সালে বিশ্বব্যাপী ইনফ্লুয়েঞ্জা-বিতে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ছিলো প্রায় ৮১ লক্ষ৷ এর মধ্যে মৃত্যুবরণ করে প্রায় তিন লক্ষ ৭০ হাজার শিশু৷

ইপিআইয়ের অন্যতম সাফল্য পোলিওমুক্ত বাংলাদেশ৷ ২০১৪ সালের ২৭ মার্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশকে পোলিও মুক্ত ঘোষণা করে৷ এর আগে সর্বশেষ ২০০০ দেশে একজন পোলিও রোগী শনাক্ত করা হয়৷ ২০০৬ সালে দেশে ১৮ জন পোলিও রোগী শনাক্ত করা হয়, যা ভারত থেকে এসেছে বলে পরবর্তীতে নিশ্চিত হওয়া যায়৷ দক্ষিণ এশিয়ার ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে খাদ্য ও পানিবাহিত এই রোগ প্রতিরোধে পোলিও টিকার উপযোগিতা এখনও রয়েছে বলা যায়৷

নিউমোনিয়া শিশুর শ্বাসযন্ত্রের অন্যতম রোগ৷ ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৯২ লক্ষ শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিল৷ বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর শতকরা প্রায় ২৮ ভাগ হয় নিউমোনিয়ার কারণে৷ পিসিভি টিকা শিশুর নিউমোনিয়া প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে৷

১০ সপ্তাহ বয়সে: পেন্টাভ্যালেন্ট, ওপিভি এবং পিসিভি টিকার দ্বিতীয় ডোজ দিতে হবে৷

১৪ সপ্তাহ বয়সে: পেন্টাভ্যালেন্ট ও ওপিভির তৃতীয় ডোজ এবং আইপিভির দ্বিতীয় ডোজ দিতে হবে৷

১৮ সপ্তাহ বয়সে: পিসিভির তৃতীয় ডোজ দিতে হবে৷

নয় মাস পূর্ণ হলে: এমআর টিকার প্রথম ডোজ দিতে হবে৷ এটি ডান উরুর চামড়ার নিচে দিতে হয়, যা হাম ও রুবেলা হতে শিশুকে সুরক্ষা দিবে৷

হাম ও রুবেলা মারাত্মক সংক্রামক রোগ৷ এ রোগ হাঁচি ও কাশির মাধ্যমে একজন হতে অন্যজনে সংক্রমিত হয়৷ বাংলাদেশে ২০১০ সালে প্রতি দশ লাখ মানুষে ৮৭ জন, ২০১১ সালে ৩৮ জন এবং ২০১২ সালে ২১ জন হারে রুবেলা রোগী পাওয়া যায়৷ একইসাথে ২০১০ সালে ৫ জন, ২০১১ সালে ৩৮ জন এবং ২০১২ সালে ১৩ জন হারে হামে আক্রান্ত রোগী পাওয়া যায়৷

১৫ মাস পূর্ণ হলে: এমআর টিকার দ্বিতীয় ডোজ দিতে হবে৷

উপরোল্লেখিত টিকাসমূহ বাংলাদেশ সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) অধীনে সকল শিশুকে বিনামূল্যে প্রদান করা হয়৷ এছাড়াও কিছু টিকা রয়েছে, যা আপনার শিশুকে বিভিন্ন রোগ হতে সুরক্ষা প্রদান করবে৷ নিচে তা আলোচনা করা হলো৷

★ দুই মাস বয়সে: রোটা ভাইরাসের টিকার প্রথম ডোজ দিতে হবে৷ এটি রোটা ভাইরাল ডাইরিয়া হতে সুরক্ষা প্রদান করবে৷

চার মাস বয়সে: রোটা ভাইরাসের টিকার দ্বিতীয় ডোজ দিতে হবে৷

১২ মাস বয়সে: এমএমআর, হেপাটাইটিস-এ এবং চিকেন পক্সের প্রথম ডোজ দিতে হবে৷

১৮ মাস বয়সে: হেপাটাইটিস-এ টিকার দ্বিতীয় ডোজ দিতে হবে৷

দুই বছর পূর্ণ হলে: টাইফয়েড ও ওরাল কলেরা টিকা দিতে হবে৷

ছয় বছর বয়সে: এমএমআর ও চিকেন পক্সের দ্বিতীয় ডোজ দিতে হবে৷

১০ বছর বয়সে: মেয়েদের ১০ থেকে ৫০ বছর বয়সের মধ্যে যেকোনো সময় হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV) টিকা দিতে হবে৷ এটি হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস দ্বারা ঘটিত জরায়ু ক্যান্সার হতে সুরক্ষা প্রদান করবে৷ এইচপিভি টিকার ডোজ মোট তিনটি৷ প্রথম ডোজ টিকা দেয়ার এক মাস পর দ্বিতীয় ডোজ এবং প্রথম ডোজের ৬ মাস পর তৃতীয় ডোজ টিকা দিতে হবে৷ প্রতিটি টিকা মাংশপেশীতে দিতে হবে৷

১৫ বছর বয়সে: মেয়েদের ১৫ থেকে ৪৯ বছর বছর বয়সের মধ্যে যেকোনো সময় টিটেনাস টক্সয়েড (টিটি) টিকা দিতে হবে৷ টিটি টিকার ডোজ মোট পাঁচটি৷ প্রথম ডোজ দেয়ার এক মাস পর দ্বিতীয় ডোজ৷ দ্বিতীয় ডোজের ৬ মাস পর তৃতীয় ডোজ৷ তৃতীয় ডোজের এক বছর পর চতুর্ত ডোজ এবং চতুর্থ ডোজের এক বছর পর পঞ্চম ডোজ টিকা দিতে হবে৷ প্রতিটি টিকা মাংশপেশীতে দেয়া হয়৷

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত