বাচ্চাদের স্কুল ফোবিয়া ও অভিভাবকদের করণীয়


আমার এখনও মনে আছে, ক্লাস সিক্সে যখন পড়ি অংক ফাইনাল পরীক্ষার দিন ৯৫ নম্বর মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে নির্ভুলভাবে আনসার করার পর ঐকিক নিয়মের একটা অংকে কি যেন প্রবলেম হচ্ছিল (মনে হয় অংকটা সাজাতে পারছিলাম না)। এদিকে সময়ও প্রায় শেষ হয়ে আসছে। পরীক্ষার হলে আরেকটু হলে কান্না শুরু করে দিব এমন অবস্থা। যেই স্যার রুমে ছিল তিনি আমার অবস্থা বেগতিক দেখে পাশের সীটে যে বসেছিল তাকে বলল- দেখো তো, ওকে একটু হেল্প করো।

পড়ালেখার প্রতি এই উপচে পড়া মায়াটা ক্লাস এইট পর্যন্ত তীব্র ছিল। স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সাথে আমার আব্বার কি একটা ঝামেলা হওয়ায় সিদ্ধান্ত হয় ক্লাস নাইনে আমাকে নতুন আর এর চেয়ে অনেক বেশী ভাল একটা স্কুলে ভর্তি করা হবে। ভর্তি হই শহরের সবচেয়ে নামকরা স্কুলের একটিতে। আব্বা আম্মা তো বেজায় খুশি। ভাল স্কুল, ভাল পরিবেশ। কিন্তু একটা মফস্বলের স্কুল থেকে গিয়ে ঐ শহুরে স্কুলের পরিবেশ, সহপাঠী কোন কিছুর সাথেই আমার এডজাস্ট হচ্ছিল না।

সহপাঠীরা দেখি সারাক্ষণ হিন্দি গান গায়, হিন্দি সংলাপ কিছুই বুঝি না। টিচাররাও নতুন মুখ দেখে খুব একটা মনোযোগী না। নিজেকে স্কুলে গেলে কেমন জানি ভিনগ্রহের বাসিন্দা মনে হতে লাগল। স্কুলে যাওয়া একেবারে কমিয়ে দিতে লাগলাম। আব্বা আম্মা স্কুলে যেতে বললে সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে হাজারটা উজর আপত্তি। ফলশ্রুতিতে রেজাল্ট চূড়ান্ত পর্যায়ের খারাপ। এসএসসির টেষ্টে ফিজিক্সে ফেল। পরে গার্ডিয়ান কল করে বিশেষ বিবেচনায় অবশ্য মূল পরীক্ষায় বসতে দিয়েছিল। পরে অবশ্য এসএসসির আগে শুধু বাসায় পড়ে, রেজাল্ট যেমনই হোক ফিজিক্সে এ+ পেয়েছিলাম।

এখন আসি ধান ভানতে শিবের গীত কেন গাইলাম সেই প্রসঙ্গে। বাচ্চাদের স্কুল ভীতি বা স্কুল ফোবিয়া। প্রথম স্কুলে ভর্তি, বাবা মায়ের ইচ্ছায় স্কুল পরিবর্তন করে ভাল স্কুলে ভর্তি, বাবা মায়ের চাকুরীর সুবাদে বাচ্চাদের স্কুল পরিবর্তন বাবা মায়ের কাছে খুব স্বাভাবিক ঘটনা হলেও একজন বাচ্চার কাছে ঘটনাগুলো অতটা স্বাভাবিক আর সাবলীল নাও হতে পারে।

⇒ স্কুল ফোবিয়া কী:

এটা এক ধরনের anxiety disorder. যার দরুন আপনার বাচ্চা কারণে-অকারণে (যদিও এটা নিজেই একটা কারণ) পরপর অনেকদিন স্কুলে যেতে চাইবে না বা স্কুলে যেতে ভয় পাবে।

⇒ স্কুল ফোবিয়ার কারণ:

১. স্কুলের কারণে বাবা মায়ের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এই ভীতি।

২. সাধারণত যারা খুব বেশী পারফেক্ট কিংবা পড়ালেখার ব্যাপারে মনোযোগী ছিল বাট হঠাৎ করে আর আগের মতো পারফরমেন্স আশানুরূপ মেইনটেইন করতে পারছে না সেসব বাচ্চারা স্কুল ফোবিয়ায় ভোগে।

৩. ফ্যামিলিয়াল ট্রোমা: এই যেমন ধরেন ফ্যামিলিতে ডিভোর্স, সেপারেশন, প্রিয়জনের মৃত্যু, আর্থিক দৈন্যতার কারণে বাচ্চারা স্কুল ফোবিয়ায় ভোগে।

৪. ট্রোমাটাইজিং ট্রান্সিশন: আমার ক্ষেত্রে যেটা ঘটেছিল আরকি।স্কুল পরিবর্তন। 

৫. আপনার সন্তান যদি স্কুলে শারীরিক কিংবা মানুষিকভাবে বন্ধুদের দ্বারা হেনস্তার শিকার হয় তবে এইসব যাতে এড়িয়ে চলা যায় এজন্যেও কিন্তু সে স্কুলে যেতে চাইবে না।

৬. স্কুলের শিক্ষকরা সব সময় নেগেটিভ ক্রিটিসাইজ করলে কিংবা অন্য কোনভাবে শারীরিক বা মানসিক শাস্তি দিলে বাচ্চা স্কুলে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। 

৭. শিশুরা তার বাবা মায়ের ইমোশন দ্বারা খুব সহজে প্রভাবিত হয়। তাই বাবা-মা দুশ্চিন্তা কিংবা উদ্বেগে ভুগলে শিশুও এসব নিজের মধ্যে ধারণ করতে শুরু করে আর স্কুলে যেতে চায় না।

৮. বাবা মায়ের অতিরিক্ত আদর ও কিন্তু স্কুল ফোবিয়ার একটা কারণ। কারণ এতে বাচ্চার কনফিডেন্স লেভেল কমে যায় আর বাচ্চা মা বাবার প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীল হওয়ার ফলে নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে সমস্যা হয়।

৯. শারীরিক অসুস্হতা বা অন্য কোন কারণে বাচ্চা অনেকদিন স্কুলে না গেলে পরে আর যেতে চায় না।

এ মুহূর্তে যা মনে পড়ল লিখলাম এমন আরো কিছু কারণ আছে।

⇒ কিভাবে বুঝবেন আপনার শিশু স্কুল ফোবিয়ায় ভোগছে কিনা:

আপনার বাচ্চা সবসময় স্কুলে যেতে অনীহা প্রকাশ করবে। ভাবুন তো, দুশ্চিন্তা হলে আপনার কি কি হয়? যেহেতু স্কুল ফোবিয়া অতিরিক্ত উদ্বেগ থেকে হয় তাই বাচ্চাদেরও এসব লক্ষণ হয়। স্কুলে যাওয়ার সময় হলে মাথা ব্যাথা, পেট ব্যাথা, বমি বমি ভাব, বমি হওয়া, অনেক সময় অজ্ঞান পর্যন্ত হয়ে যাবে। যদি আপনি তার স্কুলে না যাওয়াতে সায় দেন তবে কিছুক্ষণের মধ্য সে ভাল বোধ করবে। এর মানে কিন্তু এই নয় যে সে সব সময় ভান করছে। তাই আপনি এই বিষয়গুলো কিন্তু এড়িয়ে যেতে পারবেন না। এছাড়াও অন্ধকারে ভীতি, ঘুমের সমস্যা, দুঃস্বপ্ন দেখা, নিজের নিরাপত্তা নিয়ে সব সময় উদ্বিগ্ন থাকাও স্কুল ফোবিয়ার লক্ষণ।

⇒ বাচ্চার স্কুল ফোবিয়ায় আপনার করণীয়:

আপনাকে প্রথমেই বের করতে হবে আপনার বাচ্চা কি সত্যিই অসুস্থ না স্কুল ফোবিয়ার কারণে এসব হচ্ছে। যদি স্কুল ফোবিয়ার কারণে হয়ে থাকে, তবে আপনাকে সমস্যার মূল সন্ধান করতে হবে যে কি কারণে তার এই অনীহা তৈরী হয়েছে। এবং কারণটি যথাযথভাবে প্রতিকার করতে হবে। বাচ্চাকে প্রথমেই কিন্তু জোরজবরদস্তি করা যাবে না স্কুলে যাওয়ার জন্য, এতে হিতে বিপরীত হতে পারে। সর্তকভাবে জিজ্ঞেস করতে হবে বাচ্চার স্কুল পছন্দ কি না, তার পড়ালেখায় কোন সমস্যা হচ্ছে কি না, সহপাঠী বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক কেমন যাচ্ছে, কেউ বিরক্ত করছে কি না এসব আর কি।

স্কুলের টিচাদের সাথে বিষয়টি নিয়ে বসে কার কি করণীয় এ বিষয়ে বাচ্চার গার্ডিয়ানের আলাপ করে নিতে হবে। ক্লাসের বন্ধুদের সাথে অন্তরঙ্গতা বাড়ানোর ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে। স্কুল রিলেটেড অ্যাক্টিভিটিসে বেশী বেশী উৎসাহ প্রদান করতে হবে। ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে যদি ফোবিয়ার বিষয়টি খুব বেশী সিরিয়াস পর্যায়ে চলে যায়, তবে গার্ডিয়ানের উচিত কষ্ট করে হলেও কিছুদিন তার সাথে গিয়ে ক্লাসরুমে বসে থাকা। তাকে এডজাস্ট হতে সহায়তা করা। সবকিছু ফেল করলে গার্ডিয়ানের উচিত বাচ্চাসহ একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে যোগাযোগ করে পরামর্শ নেয়া।

"স্কুল ফোবিয়া" যদিও অনেকে ভাবেন স্বাভাবিক একটি বিষয় কিন্তু অনেকদিন ধরে চলতে দিয়ে দৃষ্টিগোচরে না আনলে এতে বাচ্চার একাডেমিক পারফরমেন্স খারাপসহ অন্যান্য সাইক্রিয়াট্রিক ডিসঅর্ডার দেখা দিতে পারে যা বাচ্চাকে বড়বেলায়ও ভোগাবে।