০৫ অগাস্ট, ২০১৯ ০২:৩৮ এএম

ডেঙ্গুর জন্য নতুন বরাদ্দের টাকা এখনও পৌঁছেনি হাসপাতালে

ডেঙ্গুর জন্য নতুন বরাদ্দের টাকা এখনও পৌঁছেনি হাসপাতালে

মুন্নাফ রশিদ: ডেঙ্গুর বিস্তার বাড়তে থাকায় রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে রোগীদের স্থান সংকুলান হচ্ছে না। ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ সরকারি হাসপাতালগুলোতে নির্ধারিত শয্যার বাইরেও মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে রোগীদেরে। তবে গত এক মাসে ধরে ডেঙ্গু রোগীর চাপ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় ওষুধসহ অন্য সব সামগ্রী বিনামূল্যে দিতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলো এক প্রকার হিমশিম খাচ্ছে।

তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এসব ব্যয় মেটাতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে বাজেটের বাইরে আরও ৩৬ কোটি ৪৭ লাখ টাকা চাওয়া হয়। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় অর্থমন্ত্রীকে চিঠি দেয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে গত মঙ্গলবার অর্থ বিভাগ অতিরিক্ত এ অর্থ বরাদ্দের অনুমোদন দেয়।

জানা গেছে, যে ছয়টি হাসপাতালগুলো এ অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয় তার মধ্যে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল রয়েছে। এ হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ৬ কোটি ৬২ লাখ টাকা।

তবে এ বরাদ্দ এখোনো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পায়নি বলে মেডিভয়েসকে জানিয়েছেন হাসপাতালটির পরিচালক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়।

হাসপাতালগুলোর এসব বরাদ্দের টাকা দিয়ে রোগীদের সেবার মান আরও উন্নত করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রোববার সরেজমিনে হাসপাতালটি ঘুরে দেখা গেছে, ওয়ার্ডগুলোর বাইরে বারান্দাতেও বিছানা পেতে আশ্রয় নিয়েছে রোগীরা। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ডেঙ্গু রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালে অন্য রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসা দিতেও সমস্যা হচ্ছে।

ছেলের চিকিৎসা করাতে আসা ফাতেমা বেগম নামে এক নারী মেডিভয়েসকে বলেন, অসুখ হলে বড় লোকেরা বেসরকারি হাসপাতালে যেতে পারে। এখানে যাদের সামর্থ্য আছে তারা পেয়িং বেড বা কেবিনে থাকছে। কিন্তু আমাদের মত গরিবদের সে সামর্থ্য না থাকায় খোলা বারান্দায় পড়ে থাকতে হচ্ছে। প্রতিদিন অন্তত কয়েক হাজার মানুষ অসুস্থ ছেলেকে মাড়িয়ে চলাচল করছে। এতে ছেলেটা আরো অসুস্থ হয়ে পড়ছে।

রোববার (৪ আগস্ট) জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মিরপুর এক নম্বর থেকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আসেন রুমা বেগম (৩০)। দ্বিতীয় তলার রিপোর্ট ডেলিভারি কক্ষের সামনে প্রায় ২ ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অসুস্থবোধ করায় জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান তিনি। কয়েকজন মিলে ট্রলিতে তুলে লিফটে করে নামাতে গিয়ে সেটাও অকেজো পান। পরে জরুরি বিভাগে গেলে দায়িত্বরত চিকিৎসকরা ভর্তির পরামর্শ দিয়ে ৪ নম্বর ওয়ার্ডে যোগাযোগ করতে বলেন। সেখানে গেলে বারান্দাতেও জায়গা নেই জানিয়ে ওয়েটিং খাতায় নাম লিখে শয্যা খালি হওয়ার অপেক্ষায় থাকতে বলেন। পরে রোগীকে নিয়ে মেডিসিন ওয়ার্ডের ভর্তি কক্ষে গেলে কয়েকটা ওষুধ লিখে দিয়ে মাদুর কিনে কোথাও জায়গা করে শুয়ে পড়ার পরামর্শ দেয়া হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অধিক রোগীর চাপে হাসপাতালগুলোর ব্যয় বেড়ে যায়। ডেঙ্গুর ভয়াবহতা বেড়ে যাওয়ায় সরকারি হাসপাতালে এ রোগের পরীক্ষা ও ওষুধপত্র বিনামূল্যে করার ঘোষণা দেয় স্বাস্থ্য অধিদফতর। এ কারণে সরকারের নির্ধারিত ছয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বাড়তি অর্থ বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কাছে।

পরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে এ দাবি উপস্থাপন করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে। সেখানে বলা হয়, সারা দেশে বিশেষ করে ঢাকা মহানগরীতে ডেঙ্গু মারাত্মকভাবে বিস্তার লাভ করেছে। রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর উপচেপড়া ভিড়। হাসপাতালের সংশ্লিষ্টরা ডেঙ্গু রোগ চিকিৎসায় আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে।

ডেঙ্গুসহ আরও কয়েকটি রোগের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে ঢাকার ছয়টি সরকারি হাসপাতালকে প্রায় ২৭১ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে ছয়টি হাসপাতালকে প্রথমে ২৩৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। তবে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় ওষুধসহ অন্য সব সামগ্রী বিনামূল্যে দেয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে বাজেটের বাইরে আরও ৩৬ কোটি ৪৭ লাখ টাকা চাওয়া হয়।

এ ব্যপারে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা মেডিভয়েসকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে জনসাধারণের মধ্যে মাহামারীর মত ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ায় সরকারের অর্থ বিভাগ চলতি অর্থবছরের বাজেটের অপ্রত্যাশিত খাত থেকে টারশিয়ারী মানের ছয়টি হাসপাতালকে নতুন করে ৩৬ কোটি ৪৭ লাখ অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ১৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ৬ কোটি ৬২ লাখ, শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটকে চার কোটি ১০ লাখ, স্যার সলিমুল্লাহ কলেজ হাসপাতালকে তিন কোটি ৭০ লাখ, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালকে তিন কোটি ৫৫ লাখ ও মুগদা জেনারেল হাসপাতালকে দুই কোটি ৯০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।

তবে এসব বরাদ্দের টাকা এখনও (৪ আগস্ট, রোববার) সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নিকট পৌঁছায়নি বলে মেডিভয়েসকে জানিয়েছেন হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া।

তিনি বলেন, মূল সমস্যা হচ্ছে রোগীর তুলনায় জনশক্তিও নাই, যন্ত্রপাতিরও ধারণক্ষমতা কম। প্রতিদিন আমাদের এখানে ১২০০ থেকে ১৩০০ জনকে ডেঙ্গুর জন্য টেস্ট করাতে হচ্ছে। এছাড়া হাসপাতালে ১৫০০-১৬০০ রোগীর টেস্ট করাতে হচ্ছে। এর বাইরে আউটডোরে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার রোগী প্রতিদিনই থাকে। যাদেরও অনেক পরীক্ষা রয়েছে।

অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া বলেন, সবকিছু মিলিয়ে আমাদের খুব হিমশিম খেতে হচ্ছে। তারপরও স্বল্প জনবলে আমাদের চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্টসহ অন্যান্য কর্মচারীরা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত