০৪ অগাস্ট, ২০১৯ ০৮:১৬ পিএম

অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে সোহরাওয়ার্দীতে পুলিশ মোতায়েন

অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে সোহরাওয়ার্দীতে পুলিশ মোতায়েন

মুন্নাফ রশিদ: সারাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি এতোটাই নাজুক যে ঢাকার সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে তিল ধারনের ঠাই নাই। ঢাকার যে কয়েকটি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের চাপ রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

রোববার সরেজমিনে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ভিড় লক্ষ্য করা গেছে রিপোর্ট ডেলিভারি কক্ষের সামনে। তবে হাসপাতালের প্যাথলজি পরীক্ষার কিট, রিএজেন্ট, ল্যাব ও টেকনেশিয়ান সংকট থাকায় ডেঙ্গু শনাক্তকরণে আসা মানুষের লাইন প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে।

এসব লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা রক্তের স্যাম্পল দেওয়া ও রিপোর্ট সংগ্রহে রোগীর স্বজনদের মধ্যে বাকবিতন্ডা, এমনকি হাতাহাতির ঘটনা ঘটছে। তাই অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে পুলিশের দ্বারস্থ হতে হয়েছে।

হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, হাসপাতালের প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় সহস্রাধিক মানুষকে ডেঙ্গু জ্বরের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও রিপোর্ট সংগ্রহের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে দুএকজন সিরিয়াল ভেঙে রিপোর্ট নিতে গেলে অপেক্ষামান অন্যান্যদের মধ্যে শোরগোল পড়ে যায়। স্বেচ্ছাসেবকের কাজে দায়িত্বরতদেরকেও বিষয়টি সমাল দিতে হিমসিম খেতে দেখা যায়। গত কয়েকদিন ধরে এমন উদ্ভুত পরিস্থিতি মোকাবেলায় শেষ পর্যন্ত হাসপাতালটির পরিচালক শেরে বাংলা নগরের পুলিশকে ফোন করে ফোর্স পাঠাতে বলেন।

বিষয়টি নিয়ে রোগীদের সঙ্গে কথা বললে তারাও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এদেরই একজন সুমন আহেম্মদ অভিযোগ করেন, জ্বরের কারণে তার ভাই হাসপাতাল বারন্দায় ভর্তি হলে চিকিৎসক দ্রুত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে বলেন। তবে চারদিন আগে রক্ত পরীক্ষার স্যাম্পল দিয়েও রিপোর্ট পাননি। গরিব মানুষ টাকার অভাবে বাইরেও পরীক্ষা করাতে পারছেন না।

রিপোর্ট নিতে আসা মোহাম্মাদপুরের বাসিন্দা ওয়ালীউল্লাহ অভিযোগ করেন, ডেঙ্গু সন্দেহে হাসপাতালে আসলে ডাক্তার রক্ত পরীক্ষার পরামর্শ দেন। মঙ্গলবারে রক্তের স্যাম্পল দিয়ে চারদিন ধরে ঘুরেও রিপোর্ট সংগ্রহ করতে পারেনি।

দ্বিতীয় তলায় মেয়েদের রিপোর্ট নিতে আসা সুমি নামে মিরপুরের এক বাসিন্দা বলেন, রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট নেওয়ার জন্য আজ দিয়ে ৪ দিন আসছেন। বাসায় হৃদরোগ আক্রান্ত স্বামীকে একা রেখে এসেছেন। রিপোর্টের জন্য  একেকজন একেক জায়গায় যেতে বলেন, কিন্তু কোন লাইনে দাঁড়ালে রিপোর্ট পাওয়া যাবে বুঝতে পারছেন না।

রোগীর সংখ্যা বিষয়ে হাসপাতালের পরিসংখ্যান বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত জুন মাসে বহিঃ ও জরুরি বিভাগে চিকিৎসা ৯৯৭ জন জ্বরের রোগীর মধ্যে ৪৬২ জনের ডেঙ্গু ও ৫৩৫ জনকে সাধারণ জ্বর শনাক্ত করা হয়েছে। জুলাই মাসে ভর্তি হওয়া ২ হাজার ৮৭৩ জনের মধ্যে ১ হাজার ৪৩৮ জনের ডেঙ্গু এবং ১ হাজার ৪৩৫ জনের সাধারণ জ্বর শনাক্ত করা হয়েছে। সর্বশেষ গত ৩ দিনে  (১ থেকে ৩ আগষ্ট) ১ হাজার ৩৪৮ জনের মধ্যে ৭৫৫ জনের ডেঙ্গু এবং ৫৯৫ জনের সাধারণ জ্বর শনাক্ত করা হয়েছে।

আর জুন মাসে ১ হাজার ১৫১ জনের এনএস-১ পরীক্ষা করে ২২৯ জনের ডেঙ্গু পজেটিভ ও ৬৫২ জনকে আইজিজি, আইজিএম টেস্ট করে ৯৮ জনের পজেটিভ ধরা পড়েছে।

একইভাবে জুলাই মাসে ৯ হাজার ২৬৬ জনকে এনএস-১ পরীক্ষা করে ৩ হাজার ৭০৪ জন পজেটিভ ও ২ হাজার ৪৩৭ জনের আইজিজ ও আইজিজিএম টেস্ট করে ৭৩১ জন ডেঙ্গু পজেটিভ রোগী পাওয়া গেছে।

সর্বশেষ ১ থেকে ৩ আগষ্ট পর্যন্ত ২ হাজার ২১৫ জনের এনএস-১ পরীক্ষা করে এক হাজার ১২ জনের ও এক হাজার ১৪ জনের আইজিজি,আইজিএম পরীক্ষা করে ৩৩১ জনের ডেঙ্গু জ্বর নির্ণয় করা হয়েছে।

বিষয়টি সম্পর্কে হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া মেডিভয়েসকে বলেন, সমস্যা হচ্ছে একজন রোগীর সঙ্গে তিন-চারজন স্বজন ভিড় করেছে। ফলে জনসমাগম বেড়ে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। এখন পুলিশ ডাকা ছাড়া কোন উপায় দেখছেন না তারা। রোগী ভর্তী নিয়ে গত বৃহস্পতিবার (১ আগস্ট) সন্ধ্যায় মারামারি হয়েছে। গত শুক্রবার (২ আগস্ট) রাত আড়াইটা ও শনিবার (৩ আগস্ট) রাত ১টায় মারামারি হয়েছে। এভাবে আমাদের মারামারিও ঠেকাতে হচ্ছে। সবকিছু খেয়াল রাখতে হচ্ছে। ফলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি সামাল দিতে আবার নতুন একটি ওয়ার্ড খোলার চেষ্টা করছি।

তিনি বলেন, মূল সমস্যা হচ্ছে আমাদের রোগীর তুলনায় জনশক্তিও কম। আবার মেশিনেরও এতো ধারণ ক্ষমতা নাই। তারপরও কাউকে ফেরত দিচ্ছি না। তবে সকালের দিকে দেখা যাচ্ছে এনএস-১ পজিটিভ মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ রোগীর। তাহলে বাকি ৯০ জন রোগী অন্য রোগের তারাও টেস্ট করাচ্ছে। আবার সন্ধ্যার দিকে দেখা যাচ্ছে ৪৫ শতাংশের এনএস-১ পজিটিভ। অর্থাৎ প্রতিদিন ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ জনকে ডেঙ্গুর জন্য টেস্ট করাতে হচ্ছে। এছাড়া হাসপাতালে ১ হাজার ৫০০-১ হাজার ৬০০ রোগীর টেস্ট করাতে হচ্ছে। এর বাইরে আউটডোরে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার রোগী প্রতিদিনই থাকে। যাদেরও অনেক পরীক্ষা রয়েছে।

রিপোর্ট ডেলিভারির ক্ষেত্রে অভিযোগের বিষয়ে ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া বলেন, শনিবার থেকে আমরা প্রতিদিনের রিপোর্ট প্রতিদিন দেয়ার চেষ্টা করছি। এর আগের ২৬-৩১ জুলাই পর্যন্ত রিপোর্ট জমা পড়ে আছে। এগুলো ছাড়া রিপোর্ট ডেলিভারির ক্ষেত্রে আর কোনো সমস্যা নাই।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরিচালক বলেন, মানুষ এতো অতঙ্কিত হয়ে গেছে যে, সবাই চাচ্ছে ডেঙ্গু টেস্ট করাতে, ভর্তি করাতে। তবে সবাইকে তো ভর্তি করানো সম্ভব না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী ভর্তিযোগ্য রোগী ভর্তি করা হবে। হাসপাতালে আসার পর পরীক্ষা পর ডাক্তার নির্দেশনা দিচ্ছে যে কাকে ভর্তি করাতে হবে আর কাকে বাসায় চিকিৎসা নিতে হবে। তারপরও রোগীরা চাপ প্রয়োগ করছে ভর্তি হওয়ার জন্য। এ জন্য প্রতিদিন জরুরী বিভাগে মারামারি হচ্ছে। ডাক্তারকে পর্যন্ত মেরেছে। মারামারি ঠেকাতে হাসপাতালে ২০ জন পুলিশ সার্বক্ষনিক মোতায়েনের জন্য আজ রোববার পুলিশ কমিশনারে কাছে আবেদন করা হয়েছে।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত