ঢাকা      রবিবার ২৫, অগাস্ট ২০১৯ - ১০, ভাদ্র, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. ইসমাইল আযহারী


ঢাকা কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ 
সেশন: ২০১৩-১৪


আইবিএস উপসর্গ: কারণ ও প্রতিকার

ইরিটেবল বাউয়েল সিনড্রোম (আইবিএস) হচ্ছে মানবদেহের কোলনের একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ, যা মূলত কোলনের কিংবা বৃহদান্ত্রের অস্বাভাবিক ফাংশনের কারণে তথা কোলনের স্বাভাবিক কাজের ব্যাঘাতের কারণে হয়ে থাকে। বাংলাদেশে প্রায় ৯-১০ শতাংশ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে  নারীদের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।

কোলনের কাজ কি?
কোলন বা বৃহদান্ত্র হচ্ছে মানুষের খাদ্য পরিবহনতন্ত্রের একটি অংশ, যা একদিকে ক্ষুদ্রান্ত্রের সঙ্গে এবং অপরপ্রান্তে রেকটামের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে।
আমরা যেইসব খাবার খেয়ে থাকি, তা পাকস্থলীতে ডাইজেস্ট হয়ে ক্ষুদ্রান্ত্রে চলে যায়, সেখান থেকে শারীররিক চাহিদা মোতাবিক একটি অংশ শোষণের মাধ্যমে Circulation এ চলে যায়।  বাকি অংশ ফ্লুইড অবস্থায় বর্জ্য পদার্থ হিসাবে বৃহদান্ত্রে চলে যায়।

কোলনের কিংবা বৃহদান্ত্রের কাজ হচ্ছে ফ্লুইড বর্জ্য পদার্থ থেকে (পানি শোষণ) করে এই ফ্লুইড বর্জ্য থেকে শক্ত মল তৈরি করে রেকটামে পাঠিয়ে দেওয়া। পানির সঙ্গে কিছু ভিটামিন ‘বি’ এবং ‘কে’ শোষিত হয়।

বৃহদান্ত্রের এই পরিবহন কাজের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর বৃহদান্ত্র সংকুচিত হতে থাকে, কোলনের এই সংকোচনের সময় বর্জ্য পদার্থ সমূহের পরিবহন হয়, এবং তা ধীরে ধীরে রেক্টামে চলে যায়। একজন সুস্থ মানুষের বৃহদান্ত্রে এই ধরনের সংকোচনের একটি নির্দিষ্ট সময় থাকে, যার কারণে সুস্থ মানুষের মল তৈরি ও মলাশয় পূর্ণ হবার একটি নির্দিষ্ট সময় থাকে, এবং এক পর্যায়ে তাদের মলত্যাগেরও একটি রুটিন থাকে।

তবে যদি কারো বৃহদান্ত্রের সংকোচনের পুনরাবৃত্তির পরিবর্তন হয়ে যায়, তাহলে তার অন্ত্রের অভ্যাস এ পরিবর্তন হয়ে যাবে। বৃহদান্ত্রের স্বাভাবিক ফাংশন যদি অন্ত্রে কোনো প্যাথলজিক্যাল কারণ ছাড়াই পরিবর্তন হয়ে যায়, যথা: কোলনের অভ্যন্তরীণ কোনো ইনফ্লামেশন কিংবা প্রদাহ ছাড়াই যদি কোলনের ফাংশন অস্বাভাবিক হয়ে যায়, এবং সেই কারণে যদি অন্ত্রের অভ্যাসে কোনো পরিবর্তন দেখা যায়, তবে এই অকার্যকর কোলন জনিত অন্ত্রের অভ্যাসের অস্বাভাবিকতাকে irritable bowel syndrome (মানসিক অস্থিরতাজনিত আমাশয় রোগ) বলে।

উপসর্গ:
১. Alternating Stool pattern, অর্থাৎ মল ত্যাগের স্বাভাবিক নিয়ম পরিবর্তন হয়ে যাবে, পূর্বে দিনে দুইবার মলত্যাগ হলে আইবিএস রোগীর পূর্বের অবস্থা পরিবর্তন হয়ে যাবে। দিনে তখন ৫-৬ বার টয়লেটে যাওয়া লাগতে পারে, এমনকি আহার করার কিছুক্ষণ পরেও মলত্যাগের চাপ আসতে পারে।
কারো ক্ষেত্রে আইবিএসে কেবল এই উপসর্গ বেশি থাকে, তখন এটাকে বলে IBS-A (Alternating stool pattern.)

২. দীর্ঘস্থায়ী ডায়েরিয়া হতে পারে। এক্ষেত্রে যদি ডায়েরিয়া উপসর্গ বেশি থাকে, তাহলে এটাকে
বলে IBS-D.

৩. আবার যদি অন্ত্রের সংকোচনের ফ্রিকোয়েন্সি খুব ধীরে যায়, তখন কোষ্টকাঠিন্ন কিংবা
দেখা দেয়। এই প্রকার IBS যেখানে কোষ্টকাঠিন্ন প্রাধান্য পায়, তাকে IBS-C বলে।

৪. কারো ক্ষেত্রে কয়েকদিন ডায়েরিয়া আবার কয়েকদিন কোষ্টকাঠিন্ন আবার ডায়েরিয়া দেখা দিতে পারে।  আবার কারো কারো রাত্রে ডায়েরিয়া হতে পারে। 

৫. মিউকাস মিশ্রিত মলত্যাগ হতে পারে, রোগী বলবে, আমার আমাশয় হচ্ছে, কিংবা তৈলাক্ত পায়খানা হচ্ছে।

৬. দীর্ঘস্থায়ী পেটে ব্যথা হতে পারে, এবং পেট ফুলে থাকতে পারে। এক্ষেত্রে রোগী বলবে, হঠাৎ করে পেট কামড়িয়ে উঠে, এবং হঠাৎ পায়খানায় যাওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। 

৭. গ্যাস জমতে পারে, আবার পায়ুপথে বায়ু নির্গত হতে পারে। 

৮. খাবার রুচি কমে যেতে পারে। 

৯. পায়খানার সাথে রক্ত যেতে পারে। 

১০. ওজন কমে যাবে, 

১১. শারীরিক দুর্বলতা লাগবে, অবসাদগ্রস্ত লাগতে পারে। 

১২. রাত্রে পরিমিত ঘুম হবে না।

১৩. কারো ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু খাবার খেলেই IBS শুরু হয়। যেমন ময়দার তৈরি খাবার কিংবা বেকারি জাতীয় খাবার, যেইসব খাবারে Gulten থাকে, যা মূলত celiac রোগে হয়ে থাকে।

কারণ:
আইবিএসের সঠিক কারণ এখনো জানা যায়নি, তবে এটি হয়ে থাকে মূলত কোলনের কার্যকারিতায় অস্বাভাবিকতার কারণে।

আর অস্বাভাবিক কার্যকারিতা নিম্নোক্ত কারণে হয়ে থাকে। 

১. অজ্ঞাত Etiolog.

২. ব্রেইন থেকে যদি কোনো কারণে বৃহদান্ত্রে নার্ভ সিগনাল আসতে বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে বৃহদান্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটে, এবং আইবিএস ডেভেলপ হয়।

৩. Post infectious IBS, অর্থাৎ যদি গ্যাস্ট্রো-ইন্টেস্টাইনাল ট্র্যাক্টে কোনো মাইক্রো অর্গানিজম দ্বারা ইনফেকশন হয়, তাহলে ইনফেকশন পরবর্তী IBS ডেভেলপ হতে পারে, যেমন V.cholerea, E.Coli সালমোনেলা টাইপি, ইনফেকশন, রোটা ভাইরাস ইনফেকশন, এমন কি ডেঙ্গু ইনফেকশন এর পরেও
IBS হতে পারে।

৪. মানসিক চাপ সম্পর্কিত আইবিএস, দুশ্চিন্তা থেকে কিংবা অতিরিক্ত পেরেশানি, অস্থিরতা, 
ডিপ্রেশন থাকলে আইবিএস হতে পারে। যেমন: কোনো নতুন জায়গায় বাসা নিলে দুশ্চিন্তায় আইবিএস হয়। পরীক্ষার সময়ও দুশ্চিন্তার কারণে আইবিএসের উপসর্গ দেখা দেয়।

৫. Gut Flora সমূহের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে আইবিএস হতে পারে।

ইনভেস্টিগেশন:
১. Stoolculture করে কোনো Identifiable ইনফেকশন আছে কিনা তা Exclude করবে।

২. কোলনোস্কপি:
Inflammatory bowel disease এর কারণেও আইবিএসের মত উপসর্গ দেখে দেয়, তাই কোলনস্কপি করে তা নিশ্চিত হয়ে নিবে।

ম্যানেজমেন্ট

১. রোগীকে কাউন্সেলিং করবে যে, এইটা বড় কোনো রোগ না, আপনি দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবেন, কোনো দুশ্চিন্তা করবেন না, রোগীকে যদি নিশ্চিত করা যায় যে এইটা নিরাময়যোগ্য, তাহলে রোগী দুশ্চিন্তা মুক্ত থাকবে, এবং ৫০ ভাগ রোগ মেডিসিন ছাড়াই সুস্থ হয়ে যাবে।

২. সিম্পটোমেটিক ট্রিটমেন্ট দিবে, যথা: 
#ডায়েরিয়া থাকলে Anti- Diarrhoeal Drugs দিবে।
#Constipation থাকলে laxatives দিবে।
#Alternating Stool pattern থাকলে Anti-spasmodic কিংবা Anti-cholinergic দিবে।

Antispasmodic এর মধ্যে Drotaverine এবং
Mebeverine ভালো কাজ করে।।

৩. দুশ্চিন্তা মুক্ত রাখতে Anxiolytic দিবে, যথা: Clonazepam অথবা Nortriptyline, Amitriptyline ইত্যাদি।

৪. রোগীকে Gulten জাতীয় দ্রব্য তথা ময়দার তৈরি জিনিষ খেতে নিষেধ করবে।

৫. ফাইবার জাতীয় খাবার, যথা: শাক-সবজি বেশি বেশি খেতে বলবে, ইসুপগুলের ভুসি ইত্যাদি খেতে পরামর্শ দিবে।

৬. পরিমিত ঘুম যাবে, নিয়মিত ব্যায়াম করবে।

৭. সব সময় হাঁসিখুশি থাকার চেষ্টা করবে।

সতর্কতা:
আইবিএস হলে নিম্নোক্ত খাবারসমূহ পরিহার করবে, কারণ এই খাবারগুলো আইবিএসে ক্ষতিকর।
১. দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, মিষ্টান্ন খাবার ইত্যাদি, 
২. চকলেট, চা, কফি ও অন্যান্য ক্যাফেইনযুক্ত খাবার, 
৩. ময়দা থেকে তৈরি যেকোন খাবার, যথা: ময়দার রুটি, বিস্কুট ও অন্যান্য বেকারিজাত
খাবার।
৪. যেসব সবজি গ্যাস বাড়ায়, যেমন: বাঁধাকপি, ফুলকপি ও বেগুন ইত্যাদি।

৫. অতিরিক্ত চর্বি জাতীয় খাবার, তৈলাক্ত খাবার, যথা: গরুর গোস্ত, দোকানের পরটা, সিঙ্গারা, কিংবা অন্যান্য তেলে ভাজা খাবার পরিহার করবে।

মোট কথা যেসব খাবার খেলে আইবিএসের উপসর্গ দেখা দেয়, তা পরিহার করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

সারভাইক্যাল ক্যান্সার: কারণ, লক্ষণ ও করণীয় 

সারভাইক্যাল ক্যান্সার: কারণ, লক্ষণ ও করণীয় 

সারভাইক্যাল ক্যান্সার আমাদের দেশে খুব পরিচিত রোগ। তবে বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং সচেতনতার…

ভিআইপি রোগী

ভিআইপি রোগী

এমবিবিএস পাস করে কেবল ১৯৮৫ সনের নভেম্বর মাসে ইন-সার্ভিস ট্রেইনিং শুরু করেছি।…

রোগীকে যখন শান্তনা দেয়ার কোন ভাষা থাকে না

রোগীকে যখন শান্তনা দেয়ার কোন ভাষা থাকে না

আমার চেম্বারে একজন ভদ্রমহিলা আসলেন বুকে ব্যাথা নিয়ে। তার প্রেশার আনকন্ট্রোলড। আমি…

একটা দুইটা অ্যান্টিবায়োটিক খেলে কি হয়?

একটা দুইটা অ্যান্টিবায়োটিক খেলে কি হয়?

আমাদের শরীরের কিছু কিছু অসুখ আছে যেগুলো জীবাণুর কারণে হয়। বলা হয়…

গর্ভবতী মায়ের সন্তানের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কতটুকু, করণীয় কী?

গর্ভবতী মায়ের সন্তানের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কতটুকু, করণীয় কী?

ডেঙ্গু বিষয়ক নানা প্রশ্নের একটি হচ্ছে, গর্ভবতী মায়ের ডেঙ্গু হলে সন্তানেরও তা…

বুদ্ধিজীবী

বুদ্ধিজীবী

আমার সামনে বসা মধ্যবয়সী এক অত্যাধুনিক ভদ্রলোক! ঘাড় পর্যন্ত ঝুলানো লম্বা চুল,…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর