ডা. মুহাম্মাদ সাঈদ এনাম ওয়ালিদ

ডা. মুহাম্মাদ সাঈদ এনাম ওয়ালিদ

চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট, জনস্বাস্থ্য গবেষক।


০১ অগাস্ট, ২০১৯ ০৯:২৯ এএম

ডেঙ্গু কর্নার ও আমার ডেঙ্গু অভিজ্ঞতা

ডেঙ্গু কর্নার ও আমার ডেঙ্গু অভিজ্ঞতা

ডেঙ্গু শব্দটি  পূর্ব আফ্রিকার সোয়াহিলি জাতির মুখের ভাষা। তারা জ্বর হলে বলতো 'কা ডিংগা পেপো'  যার অর্থ 'দুষ্ট আত্মায় সৃষ্ট রোগ'। ওয়েস্ট ইন্ডিজের কতিপয় ক্রীতদাস ডেঙ্গু ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত হয়ে তীব্র ব্যথায় কুকড়ে ডাংডি নৌকার মতো চলা ফেরা করতো বলে একে তখন 'ডাংডি জ্বর' ও বলা হতো। 'কা ডিংগা পেপো' বা 'ডাংডি জ্বর' এখন কালক্রমে 'ডেঙ্গু জ্বর' বলে  বিশ্বে পরিচিত। 

এই ডেঙ্গু জ্বর সম্পর্কে আমি প্রথম জানি ঢাকা মেডিকেলে থার্ড ইয়ারে থাকতে। সারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় তখন। পত্রিকায় ডেঙ্গু জ্বর এ চোখ লাল হয়ে যাওয়া রোগী ছবিতে ভরা থাকতো প্রথম পাতা। অনেকের গা'য়ে তখন ঘামাচির মতো র‍্যাশ হতে দেখেছি।

পরবর্তীতে ডেঙ্গুর সাথে পরিচিত হই ২০০২ সালে। আবারও ঢাকা শহরে ডেঙ্গু ভয়াবহ আকারে। আমি তখন মেডিসিনে ইন্টার্নিশিপ করি। ঢাকা মেডিকেলের মেডিসিন ওয়ার্ড গুলোতে ডেঙ্গু কর্নার খোলা হয়। আমি অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ স্যারের অধীন তিন নাম্বার ওয়ার্ডে ডাক্তারদের রোস্টার অনুযায়ী ডেঙ্গু কর্নারের 'বেড ডক্টর'।

এডমিশনে ওয়ার্ড মানে সারাদিন-রাত রোগী ভর্তি। মিনিটে মিনিটে রোগী। রোগী মানে সারাদেশ আর পেরিফেরির সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে রেফার্ডকৃত মারাত্মক খারাপ সব রোগী। 

আমরা দল বেধে গ্রুপে গ্রুপে ভাগ হয়ে রিসিভ করা, হিস্ট্রি লেখা, ইনভেস্টিগেশন প্রোফাইল তৈরী করা এই কাজ করতে থাকতাম। সাথে গাইড হিসেবে সিএ স্যার, রেজিস্ট্রার স্যার আর প্রফেসর সারেরা থাকতেনই। আমরা কেউ কেউ ওয়ার্ডেই থাকতাম সিএ স্যারের রুমে।

পোস্ট এডমিশন দীর্ঘ রাউন্ড মানে ঐতিহাসিক ব্যাপার স্যাপার। খাতা কলম নিয়ে চার পাঁচ ঘন্টা দাড়িয়ে দাড়িয়ে, বেডে বেডে গিয়ে ভর্তিকৃত নতুন রোগীদের যাবতীয় হিস্ট্রি, রিপোর্ট, আনুষাঙ্গিক বিষয় সব কিছু মুখস্ত বলতে হতে। তোতলালেই যত সমস্যা। ক্লান্ত হয়ে পড়তাম সবাই।

এক পোস্ট এডমিশন রাতে তিনটার দিকে পেরিফেরির মেডিকেল থেকে রেফার্ড হয়ে এলো রোগী। জ্বর রক্ত বমি। প্রতিবার বমিতে রক্তে সয়লাভ। আরজেন্ট সিবিসি করানো হলো। প্লাটেলেট কাউন্ট দশ হাজার। রোগী শকে। রাত তিনটায় দৌড়াদৌড়ি করে সব কিছুর ব্যবস্থা করা হলো। আশ্চর্য রোগীটা ভালো হয়ে গেলো ক'দিনের চিকিৎসায়। 

রোগীর আত্মীয়স্বজন যারপরনাই খুশি। বিদায়ের সময় রোগীর আত্মীয়রা আমাদের কাছে টেনে, হাতে, কপালে, চিবুকে স্পর্শ করে কান্নাজড়িত কান্না জড়িত আশির্বাদ, 'বাবা'রা, মা'রা আপনাদের ঋণ আমরা শোধ করতে পারবো না, দিন রাত আপনারা যা করলেন...'

ডেঙ্গু কর্নারে ভর্তি হওয়া সেদিনের রোগীদের একজনই মারা যাননি। প্রিকোশন নেয়াতে আমাদের কারোই তখন আর ডেঙ্গু ছড়ায়নি।

ডেঙ্গু কিভাবে ছড়ায়?

ডেঙ্গু বিশেষ মশাবাহিত বিশেষ ভাইরাস গঠিত রোগ। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে স্ত্রী এডিস মশা কামড় দেয়। চার-পাঁচ দিন তা সুস্থ মানুষকে কামড়ালে তবেই তার ডেঙ্গু ভাইরাস রোগ হবে।

সুতরাং ডেঙ্গু ছড়াতে হলে ডেঙ্গু রোগী ও স্ত্রী-এডিস মশা একসাথে থাকতে হবে। শুধু ডেঙ্গু, শুধু স্ত্রী এডিস মশা থাকলে লাভ হবেনা। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ডেঙ্গু ছড়াতে গেলে ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব অঞ্চল থেকে আসা রোগী সাথে বাস, ট্রাক, লঞ্চ, ষ্টীমার, ট্রেন ও প্লেন যাই আসুক সে বাহনকে মশা মুক্ত রাখতে হবে। ডেঙ্গু মশা দিনে কামড়ায় আর বাস করে ও বংশ বিস্তার করে ঘরে জমে থাকা তিন চারদিনের ছোট পাত্রের অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার পানিতে।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না