ডা. গুলজার হোসেন উজ্জল

ডা. গুলজার হোসেন উজ্জল

হেমাটোলজি বিশেষজ্ঞ।


২৬ জুলাই, ২০১৯ ০৪:৫৭ পিএম

ডেঙ্গু নির্মূল ও নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি পরামর্শ

ডেঙ্গু নির্মূল ও নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি পরামর্শ

রাজধানীসহ সারাদেশেই ডেঙ্গু এখন একটি আতঙ্কের নাম। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী চলতি বছরের এক জানুয়ারি থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ৯ হাজার ২৫৬ জন। ব্যাপক সংখ্যক মানুষের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এ অবস্থায় এডিস মশা নির্মূল আরও কার্যকরি ওষুধ ছিটানোর পাশাপাশি নানা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। 

মশা নির্মূলের মাধ্যমে ডেঙ্গু নির্মূল করা সম্ভব। যদি এই শহরের সবগুলো মশাকে মেরে ফেলা যায়, তাহলে সাতদিন পর আর এই শহরে ডেঙ্গু রোগী থাকবে না৷ কারণ মশা ছাড়া ডেঙ্গুর আর কোনো বাহক নেই। তাই মশা নির্মূলই এর একমাত্র প্রতিরোধক। হয়ত পুরোটা সম্ভব না৷ কিন্তু অনেকখানিই তো সম্ভব।

এজন্য সিটি করপোরেশনের আশায় বসে থাকবেন না৷ নিজের ঘর নিজেই পরিষ্কার করুন। ঘরের কোথাও আবদ্ধ জল আছে কিনা দেখে নিন। থাকলে ধ্বংস করুন। বাড়ির সামনের রাস্তায়, কোনায় কানায় কোথাও খানাখন্দ আছে কিনা দেখুন৷ থাকলে ধ্বংস করুন। টায়ার, জেরিক্যান, খোলা পাত্র থাকলে নষ্ট করুন। ওসব জায়গায় পানি জমেই এডিস মশা হয়।

এডিসের প্রজনন ক্ষমতা যত উচ্চই হোক প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস হলে তো নির্বংশ হতে সময় লাগবে না। রিপেলেন্ট ব্যবহার করুন। এছাড়া বাজারে গায়ে মাখার কিছু ওষুধও পাওয়া যায়, সেগুলোও ব্যবহার করতে পারেন। দিনে রাতে মশারি খাটান। এক কথায় নিজেকে সুরক্ষিত রাখার সকল উপায় অবলম্বন করুন।

পাড়ায়-মহল্লায় তরুণ-তরুণীরা গ্রুপ করে মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করার কাজে নেমে পড়ুন। এটি করতে পারলে ডেঙ্গু নির্মূলে অনেক বড় একটা কাজ হবে। এ লক্ষ্যে একটা ক্রাশ প্রোগ্রাম হাতে নিলে এক সপ্তাহের ভেতর ফল পাবেন। বলার অপেক্ষার রাখে না—এটি যারা করবেন, তারাই এ সময়ের শ্রেষ্ঠ দেশপ্রেমিক।

সর্বোপরি সতর্ক হোন, আতঙ্কিত হবেন না৷ এতে করণীয় কাজটিও ভুল হয়ে যাবেন। একটি কথা মনে রাখবেন, তাহলো: ডেঙ্গুর শারীরিক লক্ষণ নিয়ে মাথা ঘামানো যাবে না। লক্ষণ মিলিয়ে আসলে জ্বর আসে না সব সময়। এই আউটব্রেকের মৌসুমে জ্বর এলেই, মানে জ্বরের প্রথম দিনেই ডাক্তারের কাছে যাবেন। সিবিসি ও ডেঙ্গু এনএসওয়ান পরীক্ষা করবেন। Dengue NS1 ১-৩ দিনের ভেতর পজিটিভ থাকে। এর সেনসিটিভিটি ৬৬-৭০ ভাগ। ত্রিশ ভাগ ডেঙ্গু হবার পরও নেগেটিভ দেখাতে পারে৷ তাই চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে গুরুত্ব দিন।

ডেঙ্গু হলেই শিরায় স্যালাইন দিতেই হবে এমন নয়। মুখে আড়াই থেকে তিন লিটার পানি বা খাবার স্যালাইন খেতে পারলে শিরায় না দিলেও চলবে৷ শকের হিসাব আলাদা। বমি, পাতলা পায়খানা হলেও বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। চিকিৎসকের পরামর্শ মতে তখন শিরায় স্যালাইন নিতে হতে পারে।

ডেঙ্গু হলেই হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে তাও না। প্রাইমারি কেয়ার সেন্টার বা আপনার নিয়মিত চিকিৎসকের চেম্বারে গেলেই চলবে। তিনি রক্তের রিপোর্ট, শারীরিক পরীক্ষা, ব্লাড প্রেসার, পালস ইত্যাদি পরীক্ষা করে তবেই সিদ্ধান্ত দেবেন ভর্তি হবেন কি হবেন না৷ নিজে নিজে হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি হবার জন্য চেষ্টা করবেন না। হাসপাতালগুলো এমনিতেই ভারাক্রান্ত। সবার হয়তো দরকারও নেই, তবু গিয়ে ভর্তি হয়েছে৷

"প্লেইটলেট কমে গিয়ে রক্তক্ষরণ হয়ে রোগী শকে চলে যায়"—এরকম প্রচারণায় বিশ্বাস করবেন না। ফেসবুকে যা দেখবেন তাই বিশ্বাস করবেন না৷ অমুক প্রফেসর বলেছেন বলে যেগুলো প্রচার হচ্ছে সেগুলোও না। মনে রাখবেন, ভারতের নামকরা হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ দেবী শেঠির নামেও ফেসবুকে অনেক বাকোয়াজ কথা প্রচার করা হয়।

প্লেইটলেট নিয়ে অযথা ভীত হবেন না। প্লেইটলেট কাউন্ট ডেঙ্গুর আরলি প্রেডিকশনে সহায়তা করে। এর বেশি কিছু নয়। প্লেইটলেট ভালো থাকা বা খারাপ থাকা দিয়ে রোগীর ভাল-মন্দ বা রোগের তীব্রতা নির্ধারণ করা যায় না। ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম একদম ভিন্ন জিনিস। প্লেইটলেট কম বেশির সঙ্গে এর তেমন সম্পর্ক নেই।

ডেঙ্গুতে প্লেইটলেট শরীরে দেওয়া খুব কমন ট্রেন্ড হলেও আসলে খুব কম ক্ষেত্রেই প্লেইটলেট লাগে। দিলেও কাজে লাগে কিনা সেটা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে৷ এ ব্যাপারে ডাক্তারকেই সিদ্ধান্ত নিতে দিন। প্রভাবিত করবেন না। প্লেইটলেট কমে গেলেই আতঙ্কিত হয়ে প্লেইটলেট দিচ্ছেন না কেন বলে পীড়াপীড়ি করবেন না। প্রেসার, পালস ও হিমাটোক্রিট বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম খুব জটিল একটি পর্যায়। আইসিইউতে ম্যানেজ করা উচিত। লিভার, কিডনি, হার্ট ও লাংস সব দিকেই সমস্যা হতে পারে। সব কিছু পরীক্ষা করে মনিটর করতে হয়। হিসাব করে শিরায় ফ্লুইড দিতে হয়৷ তারপরও কেউ কেউ মারা যেতে পারে। এটা মাথায় রাখতে হবে৷

জ্বর কমে যাওয়ার পরই মূলত ক্রিটিক্যাল ফেইজ শুরু হয়। তাই জ্বর কমলেই সব কিছু ভালো হয়ে গেল—এটা মনে করবেন না।

ডাক্তার ভাইদের বলবো, ন্যাশনাল গাইডলাইন হাতের কাছে না থাকলে আজই সংগ্রহ করুন। পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণ করুন। প্রতিটি লাইন পড়ুন। মনগড়া কথা প্রচার করবেন না৷
 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না