ঢাকা শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ৪ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ১ ঘন্টা আগে
ডা. গুলজার হোসেন উজ্জল

ডা. গুলজার হোসেন উজ্জল

হেমাটোলজি বিশেষজ্ঞ।


২৩ জুলাই, ২০১৯ ০৯:২১

আমরা কি মাস হিস্টিরিয়ায় ভুগছি?

আমরা কি মাস হিস্টিরিয়ায় ভুগছি?

মনোবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় মাস হিস্টিরিয়া হলো একধরণের কালেক্টিভ অবসেসশনাল বিহেভিয়ার। একটা কোহেসিভ গ্রুপের মানুষের মধ্যে যখন একই ধরণের অস্বাভাবিক আচরণ ছড়িয়ে পড়ে তখন তাকে বলে মাস হিস্টিরিয়া। এখানে একধরণের ইলিউশন বা ভুল বিশ্বাস কাজ করে। কোন একটা গুজব বা হুমকি যা কাল্পনিক হতে পারে আবার সত্যও হতে পারে, তা থেকে সম্মিলিত সমাজে একই ধরনের ইলিউশন বা ভুল বিশ্বাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। মূলত তখনই মাস হিস্টিরিয়ার সৃষ্টি হয়।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একাধিক ব্যক্তির মধ্যে একই সময়ে স্বতঃস্ফুর্তভাবে একইরকম বা কাছাকাছি রকমের (শরীরে রাসায়নিক পরিবর্তন জনিত) লক্ষণ প্রকাশিত হওয়াটাই হলো মাস হিস্টিরিয়া।

এর আরো কিছু নাম আছে- মাস সাইকোজেনিক ইলনেস, এপিডেমিক হিস্টিরিয়া ইত্যাদি। যে কোনো গুজবে বিশ্বাস করে সবাইকে ছেলেধরা ভাবা এগুলো মাস হিস্টিরিয়ার লক্ষণ।

বাংলাদেশে মাঝে মাঝে কিছু অজ্ঞাত রোগের উদ্ভব হয়। বছর কয়েক আগে একই এলাকার কয়েকটি স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা স্কুল টাইমে অজ্ঞান হয়ে যেতে শুরু করেছিল। এগুলোও মাস হিস্টিরিয়া। আজ একটি খবরে দেখলাম কোন এক স্কুলে ক্লাশে শিক্ষকের কোন এক হাসির কথায় হাসতে হাসতে প্রায় গোটা পঞ্চাশেক ছাত্রছাত্রী একে একে ঢলে পড়ল। অজ্ঞান হয়ে গেল। তারা সবাই হাসপাতালেও ভর্তি হলো।

ইতিহাসে মাস হিস্টিরিয়ার অসংখ্য উদাহরণ আছে। পনের শতকে স্ট্রসবুর্গ (রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত) এর একদল মানুষ নৃত্য রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। ড্যান্সিং ম্যানিয়া। মানুষগুলি অবিশ্রাম নাচতে শুরু করেছিল। প্রথমে অল্প কয়েকজন। আস্তে আস্তে অনেকেই। এভাবে নাচতে নাচতে অনেকে হার্ট অ্যাটাক হয়ে মারাও গিয়েছিল। এর নাম দিয়েছিল তারা ড্যান্সিং প্লেগ। নৃত্য যখন সংক্রামক।

এরকম অসংখ্য অদ্ভুত ও উদ্ভট ঘটনা আছে। বেশিরভাগ ঘটনাই স্কুলে। বছর দশেক আগে ম্যাক্সিকোর প্রায় বিশটি স্কুলের শ’খানেক ছাত্রছাত্রী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল ভারটাইগো বা তীব্র মাথা ঘোরা অসুখ নিয়ে। এরকম আরো রহস্যময় মজার মজার উদাহরণ আছে। দুঃখজনক উদাহরণও আছে। বছর দুইয়েক আগে বিশেষ একটি ভিডিও গেম খেলতে গিয়ে বেশ কয়েকটি শিশুর কাছাকাছি সময়ে আত্মহত্যা করতে শোনা গেছে।

মাস হিস্টিরিয়ার কারণ আসলে কী?

সমাজের কোহেসিভ গ্রুপের মানুষগুলো যখন একই রকম মানসিক যন্ত্রণায় ভূগতে থাকে তখন মাস হিস্টিরিয়ার উদ্ভব হয় বলে মনে করেন সাইকো সোশালিস্টরা। বায়ু দূষণ, পানি দূষণ, দারিদ্র্য, জীবন যাপনের যন্ত্রণা ইত্যাদিকে কারণ হিসেবে ভাবা হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণ ঘটনাগুলির দিকে লক্ষ্য করুন। কিংবা ছেলেধরা সন্দেহে নিরীহজনকে পিটিয়ে মেরে ফেলা। প্রায় সবগুলো ঘটনার কেন্দ্রতে যারা ছিলেন তারা প্রায় একই সামাজিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত। অভিযুক্তদের বড় অংশ (প্রায় সবাই) সমাজের সুবিধা বঞ্চিত অংশেরই সদস্য।

বাংলাদেশের মানুষ কি তবে মাস হিস্টিরিয়ায় ভুগছে?

দিনের পর দিন অনিয়ম, বিচারহীনতা, দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বঞ্চনা, দুষণ, খাদ্যে ভেজাল কি তাকে গণমানসিকভাবে অসুস্থ করে তুলছে? আমরা কি সম্মিলিতভাবে ভয়ংকর মনোবৈকল্যের কবলে পড়েছি? আমি মনোবিজ্ঞানী নই। তাই সিদ্ধান্ত দিতে পারছিনা প্রশ্ন রেখে গেলাম।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত