ঢাকা      মঙ্গলবার ২০, অগাস্ট ২০১৯ - ৫, ভাদ্র, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. কাওসার উদ্দিন

সহকারী সার্জন

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।


ভুতের হাসপাতাল!

হুট করেই ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেল। পড়ার টেবলে অন্যমনস্ক আমি যেই না সামনে তাকাই, অমনি বুকের ভেতরটা ছ্যাত করে ওঠে! ওইতো ওই, কাকে যেন নড়তে দেখা যায়! কে, কে ওখানে, এমন চ্যাঙদোলা হয়ে এপাশ ওপাশ দুলছে? ভূত-টুত হবে নিশ্চই! আসলে ওরকম কিছু না! চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার, তার মাঝে পাশের বিল্ডিং থেকে ঠিকরে পড়া সোলারের অল্প আলোতে দড়িতে ঝুলানো ট্রাউজারটাকে বাতাসে এপাশ ওপাশ দুলতে দেখি! হঠাৎ দেখেছি, তাই ওটাকেই মনে করেছি কি না কি! আজকাল কি যে হচ্ছে সব! ভীতুর ডিম আমি, অল্পতেই তাই চমকে উঠি...

উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সের এরিয়াটা খুব বেশি বড় না। এরিয়ার মধ্যে হাসপাতাল বিল্ডিংসহ গোটা কয়েক কোয়ার্টার শুধু। আমাদের কোয়ার্টারে হাসপাতাল বিল্ডিং থেকে একটু দূরে এক কোণার দিকে। আর হসপিটালে যাওয়ার সময় ভাঙাচোরা পরিত্যক্ত পুরনো তিন তলা হসপিটাল বিল্ডিংটা পথে পড়ে। সেদিন আসতে আসতে শুনলাম, ব্যডমিন্টন মাঠে খেলতে থাকা বাচ্চারা ওটাকে ভুতের হাসপাতাল বলে ডাকছে! ওদের কথা শুনে হরর ম্যুভির ভৌতিক লাশকাটা ঘর আর ভুতুড়ে অপারেশন থিয়েটারের কথা মনে পড়লো। আগে এক সময় প্রচুর ভুতের গল্প পড়তাম, ভুত এফএমও শুনতাম। আগে বেশ ভয় পেতাম, এখন সব সয়ে গেছে।

রাত ১২ টা বেজে ৩০ মিনিট। মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট বললো, 'স্যর ঘুমান গিয়ে, আর থাকা লাগবে না, আমরাও ঘুমাই, রোগী আসলে ডাক দিবো।' একটু আগেও অনেকগুলো ফিজিক্যাল এসল্টের রোগী ছিলো। 'বেশি রাত হলে সিকিউরিটি গার্ডরে পাঠাইয়া দিয়েন, অন্ধকার বর্ষা রাত, একা আসতে ভয় লাগতে পারে!' এই বলে রাস্তায় নামলাম।

অল্প একটু হাঁটার পরই পুরাতন হসপিটাল বিল্ডিং এর পিছনের রাস্তায় চলে আসি। এখানে বেশ কিছু নারিকেল আর কাঁঠাল গাছ আছে। হঠাৎ একটু সামনে যেতেই সামনের নিচু গাছটার মধ্যে বেশ জোরে কেমন যেন ঝপঝপ একটা শব্দ শুরু হল! আমি চমকে দাঁড়িয়ে গেলাম। হঠাৎই টুপ করে কিছু একটা নিচে পড়ে আবার সাথে সাথে উপরে উঠে গেলো। সেটার লাল চোখদুটো আমার দিকে চেয়ে অল্প কিছুক্ষণ জ্বলজ্বল করছিলো! না, একটুও ভয় পাইনি! কারণ ওটা ভুত প্রেত জ্বীন কিচ্ছু না, শুধু একটা হুতুম পেঁচা!

এমন যে হতে পারে সে পূর্বাভাস এক বড় ভাই আগেই দিয়েছিলেন। এর আগে একদিন এমন হইছে, বলা নেই কওয়া নেই হুতুম পেঁচাটা টুপ করে ঠিক তার মাথার উপর পড়ছে। ভাগ্যিস ওটা আমার মাথায় উপর পড়েনি, পড়লে এই সাহসী ঘোড়া নিমিষেই গাঁধার মত অজ্ঞান হয়ে পড়ে যেত!

খুব সাবধানে পা ফেলছি। চারপাশে বেশ পানি জমে আছে, ইদানিং আবার সাপের উপদ্রব বেশি। এইতো সেদিনও সাপে কাটা রোগী ব্রডডেড হয়ে হাসপাতালে আসে, এই থানা শহরে এন্টি ভেনমও পাওয়া যায় না। এসব ভেবেচিন্তে গুটি গুটি পা ফেলে সামনে এগুচ্ছি। রাস্তাটাও বেশ পিচ্ছিল, বেশ কয়েকবার স্লিপ করে পড়ি পড়ি করেও কোন রকমে নিজেকে সামলে নিয়ে হেঁটে চলছি। হতচ্ছাড়া বিদ্যুৎটাও এখনো আসেনি, মোবাইলের আলোটুকু যা ভরসা। হাঁটতে হাঁটতে যেইনা টিউবওয়েলটার কাছে গেছি, অমনি কয়েকটা কুকুর কোথ্যেকে যেন দৌড়ে এসে সামনে দিয়ে পুরাতন হাসপাতালে ঢুকলো। এরপর পরই শুরু হল ছোট বাচ্চার নাকি সুরে কান্নার আওয়াজ! এই কান্নার শব্দেও এখন আর ভয় লাগেনা, প্রথমে লাগতো! যে বাচ্চাটা কাঁদছে ওর মা ওর জন্মের সময়ই মারা যায়, বাচ্চাটা থাকে ওর খালাদের কাছে। ওইই এরকম রাতবিরাতে পালা করে বেশ কান্নাকাটি করে।

এই কুকুর বিড়াল, বৃষ্টি রাত, হাসি কান্না, আর ভয়কে সাথী করে রাতগুলো সব ভোর হচ্ছে, পার হচ্ছে এই নির্বাসনের দিনগুলি...

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থোপেডিক হাসপাতাল নিটোরের গল্প

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থোপেডিক হাসপাতাল নিটোরের গল্প

সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় নিটোর নিয়ে কিছু কথা উঠেছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থোপেডিক হাসপাতালটির…

মৃত্যুর আগে কথোপকথন

মৃত্যুর আগে কথোপকথন

হাতির মতন বিশাল মেশিনটি আমার বুকের উপর দিয়ে বার কয়েক চক্কর দিয়ে…

সরকারি হাসপাতালে নানা অনিয়মই যখন নিয়ম!

সরকারি হাসপাতালে নানা অনিয়মই যখন নিয়ম!

একজন কনসালটেন্ট তার মামাতো ভাইকে দেখাতে এসেছে। রোগীর সাথে কথা বলছি, এই…

মানহীন মেডিকেলের প্রাদুর্ভাব বন্ধে মেডিকেলিয় ভূমিকা

মানহীন মেডিকেলের প্রাদুর্ভাব বন্ধে মেডিকেলিয় ভূমিকা

আমরা সবাই জানি এবং প্রতিনিয়ত বলে বেড়াচ্ছি ব্যাঙের ছাতার মতো মানহীন মেডিকেল…

স্বাস্থ্যখাতে নৈরাজ্য সৃষ্টির পাঁয়তারা ‘অশনিসংকেত’

স্বাস্থ্যখাতে নৈরাজ্য সৃষ্টির পাঁয়তারা ‘অশনিসংকেত’

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সৈন্যের সংখ্যা বিশ্বে তৃতীয়! অথচ জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ কোনো…

ভিআইপি রোগী

ভিআইপি রোগী

এমবিবিএস পাস করে কেবল ১৯৮৫ সনের নভেম্বর মাসে ইন-সার্ভিস ট্রেইনিং শুরু করেছি।…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর