১৭ জুলাই, ২০১৯ ০১:১৭ পিএম

১০০ চিকিৎসকের রুদ্ধশ্বাস অস্ত্রোপচার: আলাদা হলো জমজ মাথা

১০০ চিকিৎসকের রুদ্ধশ্বাস অস্ত্রোপচার: আলাদা হলো জমজ মাথা

মেডিভয়েস রিপোর্ট: দুই বোনের দেহ দু’দিকে, তবে মাথা জোড়া লাগানো। পৃথীবিতে আসার মুহূর্তটাও তাদের জন্যে খুব বেশি সুখকর ছিল না। কারণ, জন্ম থেকেই তাদের মাথার খুলি ও রক্তনালি জোড়া লাগানো। পাকিস্তানে জন্ম হওয়া যমজ দুই বোন সাফা ও মারওয়ার সেই মাথা আলাদা করতে সক্ষম হয়েছেন চিকিৎসকরা।

স্কাই নিউজের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘ ৫০ ঘণ্টার সফল অস্ত্রোপচারের পর আলাদা করা হয়েছে সাফা-মারওয়াকে। তিনটি বড় ধরনের অস্ত্রোপচারের পর দুই বছর বয়সী যমজ এ দুই বোনকে আলাদা করা হয়েছে। লন্ডনের গ্রেট অরমন্ড স্ট্রিট হাসপাতালে এই জটিল অস্ত্রোপচার সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন হয়।

পাকিস্তানে জন্ম হওয়া শিশু দুটির অস্ত্রোপচারে ৫০ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর অস্ত্রোপচারে অংশ নেন ১০০ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। গত বছরের আগস্ট থেকে শুরু হয় তাদের চিকিৎসা কার্যক্রম, যা শেষ হয় এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে। সাফা ও মারওয়ার বয়স তখন ১৯ মাস।

বিবিসির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে প্রথম অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। সর্বশেষ অস্ত্রোপচারটি হয় চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি। অস্ত্রোপচার যাতে সফল হয়, সে লক্ষ্যে ভার্চ্যুয়াল রিয়্যালিটি ব্যবহার করে বাচ্চা দুটির দেহতন্ত্রের হুবহু রেপ্লিকা তৈরি করেন বিশেষজ্ঞরা। অনুশীলনের জন্য থ্রিডি প্রিন্টিং ব্যবহার করে বাচ্চা দুটির প্লাস্টিক মডেল তৈরি একটি বিশেষজ্ঞ দল।

সার্জারির শুরুতে বাচ্চা দুটির রক্তনালি আলাদা করে নেন চিকিৎসকেরা। মাথার ভেতর এক টুকরো প্লাস্টিক ঢুকিয়ে মস্তিষ্ক এবং রক্তনালি আলাদা করে ফেলা হয়। স্ক্যান করে দেখা যায়, বাচ্চা দুটির মস্তিষ্ক স্বতন্ত্র হলেও আকৃতি ঠিক নেই। প্লাস্টিক আর কপিকল পদ্ধতি ব্যবহার করে মস্তিষ্ক দুটো সঠিক আকৃতিতে আনা হয়। পরবর্তী অস্ত্রোপচারে সাফার গলার শিরায় রক্ত জমাট বেঁধে যায়। সেই রক্ত তার যমজ বোনের শরীরে প্রবাহিত হতে থাকলে দুজনেরই রক্তক্ষরণ শুরু হয়। এর কিছুক্ষণ পর মারওয়ার হৃৎস্পন্দন কমে যেতে থাকে। তার বাঁচার আশা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়। তাকে সুস্থ করতে যমজদের সংযুক্ত একটি শিরা কেটে মারওয়াকে দেওয়া হয়। কিন্তু এর ফলে ভুগতে হয় সাফাকে। শিরা হারানোর ১২ ঘণ্টার ভেতরে স্ট্রোক করে সাফা।

তবে সর্বশেষ অস্ত্রোপচারে মেয়ে দুটোর হাড় ব্যবহার করে নতুন মাথার খুলি তৈরি করা হয়। খুলির ওপরে যেন নতুন চামড়া তৈরি হয়, তা নিশ্চিত করতে তাদের টিস্যুও ব্যবহার করা হয়। সাফা-মারওয়া যেন আলাদা দুটো মানুষ হিসেবে জীবন যাপন করতে পারে, এ জন্য ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিনিয়োগ করা অর্থে খুঁটিনাটি সব শারীরিক সমস্যার সমাধান করা হচ্ছে।

প্রায় ১০০ সদস্যের সহযোগিতায় ৫০ ঘণ্টার অস্ত্রোপচার সফলভাবে শেষ হয় বলে গত সোমবার এ তথ্য জানিয়েছেনে তার চিকিৎসকরা। ৩৪ বছর বয়সী সাফা ও মারওয়ার মা জয়নাব বিবি বলেন, ‘হাসপাতালের প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছে আমরা ঋণী। তাদেরকে আন্তরিক ধন্যবাদ।’

সংযুক্ত যমজ জন্ম নেওয়ার ঘটনা সারা পৃথিবীতে খুবই বিরল। আড়াই মিলিয়ন শিশুর মধ্যে এক জোড়া এমন দুর্লভ শিশু জন্মে।

অস্ত্রোপচার শেষে ১ জুলাই পিতৃহীন শিশু দুটিকে নিয়ে হাসপাতাল ছাড়েন তাদের মা। আপাতত লন্ডনের একটি বাসায় তাদের সঙ্গে রয়েছেন মা, দাদা ও চাচা। প্রতিদিন ফিজিওথেরাপিস্টরা পুনর্বাসন প্রক্রিয়া দেখভাল করছেন।

এ ধরনের যমজকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ক্র্যানিওপ্যাগাস টুইন্স’। খুলির জটিল গঠন এবং মগজ ও রক্তনালির অবস্থান জানতে আধুনিক প্রযুক্তির শরণাপন্ন হন চিকিৎসকরা।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত