ঢাকা      সোমবার ২৩, সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ৭, আশ্বিন, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. সাঈদা ইসলাম

চিকিৎসক ও লেখক    


বিদেশে চিকিৎসা: শোনা কথায় কান দিবেন না

যখন গাইনী আউটডোরে চাকরি করি তখন এক জুনিয়র এসে বলল "আপু তোমরা abnormal uterine bleeding (জরায়ু থেকে অস্বাভাবিক রক্তপাত) -এ কি কি দেও?" তারপর আমি জিজ্ঞেস করলাম- "কি জন্যে রে? "বলল- ওর (অন্য একজনকে দেখিয়ে) আম্মু মালেশিয়ায় থাকেন। উনার বিগত সাত আট মাস ধরে Excessive Abnormal Uterine Bleeding হচ্ছে। ওখানে অনেক কষ্টে ডাক্তারের এপোয়মেন্ট জোগাড় করলেও ডাক্তার নাকি খালি টেষ্ট দিয়েছেন, কোন ঔষধ দেননি। হিমোগ্লোবিন নাকি ৬/৭ এ চলে আসছে কিন্তু অন্যকোন রির্পোটে কোন প্রবলেম না আসায় ডাক্তার কোন ঔষধ দেয় না। 

Endometrial tissue histopathology (জরায়ুর ভিতর থেকে টিস্যু নিয়ে বিশেষ এক ধরনের পরীক্ষা) তে পাঠাইছে, রিপোর্ট আসতে একমাস লাগবে। আর ততদিন কোন ঔষধ দেওয়া হবে না। এদিকে আন্টির অবস্হা কাহিল।

ঘটনা-২:

তখন এক ইনফার্টিলিটি স্পেশালিষ্ট ম্যাডামের চেম্বারে কাজ করি। লন্ডন প্রবাসী এক রোগীর হাজবেন্ড রোগীর সমস্ত কাগজপত্রসহ চেম্বারে এসেছে। সাথে রোগী আসে নাই। বলল উনার স্ত্রী ১০ সপ্তাহের প্রেগন্যান্ট বাড়ি থেকে রাস্তা খারাপ দেখে সাথে নিয়ে আসেন নাই। বললাম- তাহলে আপনি এখানে কেন? আপনাদের তো বন্ধ্যাত্বের সমস্যা না। রোগীর হাজবেন্ডের ভাষ্য ও কাগজপত্র ঘেঁটে যা বুঝলাম, মহিলার এই প্রেগন্যান্সির আগে incomplete abortion, missed abortion (বাচ্চা নষ্টের বিভিন্ন ধরণ) মিলিয়ে ৮/৯ টা বাচ্চা মিসক্যারেজ হয়েছে। এমন না উনারা ডাক্তারের কাছে যান নাই, প্রতিবারই গেছেন।

ডাক্তার এন্টিফসফোলিপিড এন্টিবডি থেকে শুরু করে ক্যারিওটাইপিং (বারবার বাচ্চা নষ্টের কারণ নির্ণয়ে আধুনিক পরীক্ষা) পর্যন্ত সবই করিয়েছেন, এমনকি একটা 20 weeks এর missed abortion বাচ্চার autopsy (পোষ্টমর্টেমের মতো একটি পরীক্ষা) ও করা হয়েছে। কিন্তু কোন কারণ না পাওয়া যাওয়ায় ডাক্তাররা কোন প্রেগন্যান্সিতেই ফলিক এসিড ছাড়া আর অন্যকোন ঔষধ দেননি। এখন রোগী দেশে আসছে এই প্রেগন্যান্সিতে আল্লাহর উপর ভরসা আর বাংলাদেশের ডাক্তারের কাছে একটু আশ্বস্ত হওয়ার জন্য।

ঘটনা ৩:

আমার পরিচিত এক বড় ডাক্তারের বোনের ল্যাপরোস্কোপিক কলেসিস্টেক্টমি (মেশিনের সাহায্যে ছিদ্র করে পিত্তথলি অপারেশন) হয়েছে আমেরিকায়। পরে কোন একটা ব্লিডিং পয়েন্ট, না ভ্যাসেল লাইগেটে (রক্তনালী বাঁধতে) জানি প্রবলেম হয়ে peritonitis (পেটের ভিতর ইনফেকশন হয়ে পেট ফুলে যাওয়া) ডেভেলপ করে। আমেরিকার ডাক্তার উনাকে অবজারভেশনে রাখতে রাখতে এতো সময় পার করলেন যে ল্যাপারোটমি (পেট কাটা) করার আগেই উনি ভবো লীলা সাঙ্গ করেন। এতো দূর যাওয়া আর টাইম পাওয়া যায়নি।

ঘটনা-৪:

আমার হাজবেন্ডের আমেরিকা প্রবাসী এক বন্ধুর দুইটা বাচ্চার সেরিব্রাল পালসি। কথা প্রসঙ্গে যা জানলাম আর বুঝলাম, সুদীর্ঘ অবজারভেশন আর জান-প্রাণ সঁপে দিয়ে এনভিডি (নরমাল ডেলিভারী) করানো ফসল (ইন্স্যুরেন্সও কিন্তু একটা বড় ফ্যাক্টর এখানে)।

ঘটনা-১ এর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ডাক্তাররা কিছু দিক আর না দিক রক্ত বন্ধের জন্য Tranexamic Acid টা আর এ্যানিমিয়া কারেকশনের (রক্তশূন্যতা পূরণ) ব্যবস্হা করতো। ঘটনা-২ এ ম্যাডাম কিন্তু আল্লাহর উপর ভরসা করে প্রজেস্টেরণ সাপ্লিমেন্ট আর chorionic gonadotrophin  inj. (হরমোনাল ঔষধ) এড করেছেন।

আর ঘটনা ৩ এর ক্ষেত্রে আর যাই হোক অবজারভেশনে এতো টাইম বাংলাদেশী ডাক্তাররা নিত না এ বিষয়ে হলফ করে বলতে পারি। এবং ঘটনা ৪ এর ক্ষেত্রে বাসায় ট্রায়াল ছাড়া সরাসরি হাসপাতালে ডেলিভারি হইছে এমন ক্ষেত্রে বাংলাদেশে সেরিব্রাল পালসির বাচ্চার হার অনেক উন্নত দেশের চেয়ে কিন্তু কম। সিজারকে বৈধ করা আমার লক্ষ্য না, তবে সবদিক খেয়াল রাখাও কিন্তু জরুরী। কারণ আপনার ক্ষেত্রে হয়তো বৈধতার অজুহাত জিরো পার্সেন্ট কিন্তু যার জীবনে ঘটলো তার জন্য ১০০%।

অতি সতর্কতা কিন্তু বিদেশী ডাক্তাররা রোগীর জন্যে যতটুকু নেয়, নিজের জন্যে তার চেয়ে বেশী নেয়; স্যু খাওয়ার ভয়ে। দামটা কিন্তু রোগীকেই দিতে হয়। আমাদের গ্রামের বাড়িতে একটা প্রবাদ প্রচলিত আছে- "অতি ছইওলের তুলি উদাম।" যার জীবনে বিদেশ বাড়ীর এরকম দুই একটা ইন্সিডেন্ট ঘটেছে সে আমার কথার যথার্থ ভাবটা সহজে বুঝবে।

সৌভাগ্যক্রমেই হোক আর দুর্ভাগ্যক্রমেই হোক বাংলাদেশের ডাক্তাররা এতো রোগী হ্যান্ডেল করেন যে, রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে তাদের অনেকের চোখ শকুনের চোখের মতোই তীক্ষ্ণ হয়। বিদেশের সেবার পরিবেশ ভাল, ডাক্তাদের আচরনও হয়তো আমাদের চেয়ে উৎকর্ষ (কারণ সেটার জন্যেও পরিবেশ লাগে), ইনভেস্টিগেশন ফ্যাসিলিটি আর কোয়ালিটিও হাই কিন্তু চিকিৎসা আমাদের চেয়ে ভাল বললে আসলে বলতেই হবে- "শোনা কথায় কান দিবেন না।" কারণ কয়টা মানুষের সামর্থ্য আছে বিদেশ যেয়ে চিকিৎসা করানোর, সবাই তো শুনে শুনেই বলে।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

সন্তানের থ্যালাসেমিয়ার জন্য পিতা-মাতার অজ্ঞতাই দায়ী!

সন্তানের থ্যালাসেমিয়ার জন্য পিতা-মাতার অজ্ঞতাই দায়ী!

সিএমসি, ভেলোরে আমি যে রুমে বসে রোগী দেখছি সেখানে ইন্ডিয়ার অন্যান্য রাজ্যের…

আধুনিক মায়েরা সিজার ছাড়া বাচ্চা প্রসবের চিন্তাই করেন না

আধুনিক মায়েরা সিজার ছাড়া বাচ্চা প্রসবের চিন্তাই করেন না

সমাজে কিছু মানসিকভাবে অসুস্থ ডাক্তার বিদ্বেষী মানুষ আছে। অসুখ হলে ইনিয়ে বিনিয়ে…

আনিসের প্রত্যাবর্তন 

আনিসের প্রত্যাবর্তন 

রাস্তায় একজনের মুখে সরাসরি সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে দিলো আনিস। আচমকা এ আচরণে…

কনজেনিটাল হার্ট ডিজিজ: গল্পে গল্পে শিখি

কনজেনিটাল হার্ট ডিজিজ: গল্পে গল্পে শিখি

স্রষ্টার সৃষ্টি বড় অদ্ভুত, মেডিকেল সায়েন্স পড়লে এটা ভাল বুঝা যায়। মাছের…

বদ লোকের গল্প!

বদ লোকের গল্প!

উপজেলায় নতুন তখন। সবাইকে ঠিকঠাক চিনিও না। হঠাৎ একদিন আমার রুমে পেট…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস