ঢাকা      শুক্রবার ১৯, জুলাই ২০১৯ - ৪, শ্রাবণ, ১৪২৬ - হিজরী



কামারুজ্জামান নাবিল

ছাত্র, ডক্টর অব মেডিসিন, ইস্পাহান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ইরান


মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় ইরানের এগিয়ে চলার গল্প 

যতদিন যাচ্ছে ইরানের মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় যুক্ত হচ্ছে অভূতপূর্ব সব অবিষ্কার। বিশ্ব যখন এগিয়ে চলছে সেই মুহূর্তে ইরানের আবিষ্কারগুলো অনেকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে নাও হতে পারে। কিন্তু পশ্চিমাদের এতো অবরোধের মাঝেও তাদের এমন সব আবিষ্কার শুধু মুসলিম বিশ্বকে নয়, গোটা বিশ্বকে চমকিয়ে দেবার মতো।  

কিন্তু এমন সব আবিষ্কার কিভাবে সম্ভব হচ্ছে—এ নিয়ে ইরানের ইস্ফাহান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিওলজি ডিপার্টমেন্টের একজন শিক্ষক জানিয়েছিলেন, একজন শিক্ষার্থী শুধুমাত্র একজন শিক্ষার্থী নয়, একজন গবেষকও হবেন। আর এমন নতুন নতুন গবেষকদের গবেষণার ফলই হচ্ছে অভূতপূর্ব সব আবিষ্কার। 

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা বলি, আমার ডক্টর অব মেডিসিন (এমডি) ডিগ্রির চার বছর পেরিয়েছে, এখনো বাকি তিন বছর। সাত বছরের এই কোর্সে গবেষণা সম্পর্কিত অ্যাকাডেমিকভাবে আমাদের ৬ ক্রেডিট পাস করতে হয়। তিন বছর বাকি থাকতেই সেদিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রপোজাল লেখা নিয়ে নক দেওয়া শুরু হয়েছে।   

সেই সূত্র ধরে, আমার প্রিয় ডিপার্টমেন্ট পেডিয়েট্রিক‬‏ ডিপার্টমেন্টের কয়েকজন অধ্যাপককে রিসার্চ নিয়ে কাজ করতে চাই বলে মেইল করেছিলাম। কিছুটা বিরতিতে তাঁদের কয়েকজনের কাছ থেকে ইমেইল রিপ্লাই পেলাম। তাঁদের মাঝ থেকে একজন অধ্যাপককে নির্বাচন করে সময় নিয়ে তাঁর সঙ্গে হাসপাতালে গিয়ে দেখা করলাম এবং আমার প্রপোজালের টাইটেল ঠিক করলাম। এই প্রপোজালের টাইটেলের উপরেই আমাকে সাত বছর শেষে ডিফেন্স করতে হবে, তাই এমন বিষয় নির্ধারণ করা উচিত, যে ফিল্ডে নিজের ভালো লাগা বা পছন্দ কাজ করে।  

ইরানের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদাভাবে শিক্ষার্থীদের নিয়ে গবেষণা কেন্দ্রিক একটি কমিটি আছে, যাদের কাজ হচ্ছে গবেষণা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রবন্ধ লেখা নিয়ে ওয়ার্কশপ করা এবং শিক্ষার্থীদের গবেষণা করতে উদ্বুদ্ধ করা। আমাদের প্রপোজাল টাইটেল লেখা থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত এই কমিটিই শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ে সর্বাত্মক সাহায্য করে থাকে।

এছাড়াও ইরানের মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার ক্ষেত্রে শিক্ষকগণ প্রায় ক্লাসেই শিক্ষার্থীদের গবেষণা নিয়ে উৎসাহ দিয়ে থাকেন—এমন উৎসাহ প্রদান একজন শিক্ষার্থীকে শুধুমাত্র একজন শিক্ষার্থী হিসেবেই না একজন গবেষক হিসেবেও গড়ে তুলতে সাহায্য করে।   

বলাবাহুল্য, ইরানের বিজ্ঞান গবেষণা ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও গবেষণার জন্য প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা একটা অর্থনৈতিক বাজেট থাকে, যা প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ গবেষণার ক্ষেত্রে সরবরাহ করে থাকে।  

মেডিকেল জার্নাল ওয়েবসাইট পাবমেড’র একটি আর্টিকেলের সূত্র মতে, ইরান ১৯৬৫ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত মেডিকেল সায়েন্স সব বিভাগে দুই লাখ ৪৪ হাজার ২৯০টি প্রকাশনা বের করেছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র ক্লিনিক্যাল, বায়োমেডিকেল এবং জনস্বাস্থ্য নিয়ে ৭২ হাজার ৬৮৬টি প্রকাশনা বের করেছে। সবচেয়ে বেশি গবেষণা হয়েছে পেডিয়েট্রিক ও ডেন্টাল বিভাগে। এর পরেই রয়েছে ক্যান্সার, ডায়াবেটিস এবং ফার্মেসি বিভাগ। 

এছাড়াও গবেষণায় উল্ল্যেখযোগ্য সাফল্যগুলোর মাঝে রয়েছে, 
১. প্লাস্টিক সার্জারির ক্ষেত্রে অন্যতম গবেষক ইরানের।
২. তেহরানের শহীদ বেহেশতি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টায় প্লাস্টিক সার্জারির ক্ষেত্রে শক্তিশালী আঠালো টিস্যু তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।
৩. আগুনে পুড়ে যাওয়া শরীরের ক্ষতস্থান লেজারের মাধ্যমে কৃত্রিম চামড়া উৎপাদনের মাধ্যমে তা পূর্ণ হয়ে যাওয়ার মতো পদ্ধতির আবিষ্কারকও ইরানের ডাক্তারগণ।
৪. প্রায় ১০ বছর গবেষণা চালিয়ে কৃত্রিম শ্বাসনালী তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন ইরানের মেডিকেল সায়েন্সের গবেষকগণ।
৫. Three-Dimensional Medical Images নামক নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন ইরানি চিকিৎসকগণ।
৬. কার্ডিও-ওনকোলজি গবেষণায় ইরান এগিয়েছে, এরই ধারাবাহিকতায় কিছুদিন আগে এশিয়ার প্রথম কার্ডিও-অনকোলজি গবেষণা কেন্দ্রটি ইরানের তেহরানে উদ্বোধন করা হয়েছে।  
৭. ভ্যাকসিন উৎপাদনে মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে ইরান। স্টেম সেল গবেষণার ক্ষেত্রে ইরানের অবস্থান প্রথম সারির ১০টি দেশের মাঝে।

এমন সব আবিষ্কারে আন্তর্জাতিক প্রবন্ধ ডাটাবেজ গুগল স্কলার, স্কোপাস এবং ওয়েব অব সায়েন্স কোর কালেকশান ইত্যাদি সবখানেই ইরানি গবেষকদের উল্ল্যেখযোগ্য একটি অবস্থান তৈরি হয়েছে। যা মেডিকেল সায়েন্স গবেষণাকে উজ্জ্বল করেছে বা করছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


আন্তর্জাতিক বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

১০০ চিকিৎসকের রুদ্ধশ্বাস অস্ত্রোপচার: আলাদা হলো জমজ মাথা

১০০ চিকিৎসকের রুদ্ধশ্বাস অস্ত্রোপচার: আলাদা হলো জমজ মাথা

মেডিভয়েস রিপোর্ট: দুই বোনের দেহ দু’দিকে, তবে মাথা জোড়া লাগানো। পৃথীবিতে আসার…

ভারতে যাওয়া বিদেশি রোগীদের ৪৫ ভাগই বাংলাদেশি

ভারতে যাওয়া বিদেশি রোগীদের ৪৫ ভাগই বাংলাদেশি

মেডিভয়েস রিপোর্ট: সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশ, ইরাক ও ওমান থেকে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ভারতে…

ফ্রান্সে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় অর্থায়ন বন্ধ হচ্ছে

ফ্রান্সে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় অর্থায়ন বন্ধ হচ্ছে

মেডিভয়েস রিপোর্ট: ২০২১ সাল থেকে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় অর্থায়ন বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্স।…

ডিম্বাশয় ক্যান্সার প্রতিরোধক আবিষ্কার

ডিম্বাশয় ক্যান্সার প্রতিরোধক আবিষ্কার

মেডিভয়েস ডেস্ক: উচ্চ ক্ষমতার ডিম্বাশয় ক্যান্সার নারীদের জন্য একটি সাধারণ বিষয়। বেশিরভাগ মানুষের…

আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর