ডা. তারাকী হাসান মেহেদী

ডা. তারাকী হাসান মেহেদী

মেডিকেল অফিসার, বিসিএস (স্বাস্থ্য)।


১১ জুলাই, ২০১৯ ০১:৩০ পিএম

শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ: আমার দেখা একটি বিভৎস ঘটনা

শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ: আমার দেখা একটি বিভৎস ঘটনা

শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ কাজ করাকে পেডোফেলিয়া বলে। আর যাদের এই আকর্ষণ কাজ করে তাদের পেডোফিল বলে। এটা একটা সেক্সুয়াল পারভার্সন বা বিকৃত যৌনাচার। কিছু পেডোফিল আছে সিডাকটিভ, কিছু আছে স্যাডিস্টিক।

সিডাকটিভ যারা, তারা শিশুদের টাকা, চকোলেট, বিস্কুট, মিষ্টি ব্যবহার ইত্যাদি দিয়ে প্রলোভন দেখিয়ে যৌন সম্পর্ক করে। অপরদিকে, স্যাডিস্টিকরা আবার উল্টো। এরা জোর করে, অত্যাচার করে যৌন সম্পর্ক করে। আবার খুনও করে। আবার, পেডোফিলদের কেউ কেউ আছে শুধুমাত্র শিশুদের প্রতিই আকৃষ্ট হয়, আবার কেউ আছে যারা শিশু- বড় উভয়ের প্রতি হয়।

শিশুদের রেপ যে কত বিভৎস হতে পারে, তা নিজে চোখে দেখি ২০১৬ সালে। উপজেলা হাসপাতালে তখন পোস্টিং ছিল। বিকেলের দিকে কয়েকজন লোক একটা বাচ্চাকে তড়িঘড়ি করে নিয়ে আসলো। বয়স আর কত হবে, বড়জোর সাড়ে তিন বছর। ছিল মায়ের কোলে, হাতে খেলনা নিয়ে। ফোলা ফোলা চোখ দেখেই বুঝা যাচ্ছিল প্রচুর কান্না করেছে।

ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ শুনে বাচ্চাটিকে পরীক্ষা করলাম। তাকে এমনভাবে রেপ করেছে যে জায়গাটা ছিঁড়ে গিয়ে প্রচুর রক্ত বের হয়েছে। বেশ গর্ত হয়ে আছে, তখনও রক্ত বের হচ্ছিল। ভয়াবহ এক অবস্থা। ডাক্তারি জীবনে আঘাত, ক্ষত, রক্ত এতো দেখেছি যে, এগুলো দেখে কখনো কিছু মনে হয় না। কিন্তু কেন জানি সেদিন তাকানোরও সাহস হচ্ছিল না।

ক্ষতটার কিছু একটা ব্যবস্থা করার জন্য কাছে এগিয়ে যেতেই নিষ্পাপ বাচ্চাটির ভয় ও সন্দেহ মিশ্রিত চোখের চাহনি আমাকে থমকে দিল।

হাসি দিয়ে নির্ভয় দেওয়ার চেষ্টা করলাম, তবুও তার ভয়। তাড়াতাড়ি জায়গাটা পরিষ্কার করে প্রাথমিকভাবে রক্তক্ষরণ বন্ধ করে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করে দিলাম বাকি মেডিকো লিগ্যাল ব্যবস্থার জন্য।

ধর্ষণকে সবাই ঘৃণা করে। তবে যারা এ দৃশ্য কখনো দেখেনি, তারা এই শিশু ধর্ষণের নৃশংসতা তেমন উপলব্ধি করতে পারবে না।

ঐ ঘটনার পরবর্তীতে পত্রিকায় প্রতিদিন চোখ রাখতাম কিছু আসে কি না। কিন্তু কোন পত্রিকায় নিউজটি পাইনি।

আসলে, আমাদের দেশে ধর্ষণ আগে থেকেই ছিল। কিন্তু এখন মিডিয়ায় বেশি আসছে বলে কিংবা থানাগুলোতে মামলা বেশি হচ্ছে বলে আমাদের মনে হচ্ছে ধর্ষণ বেড়ে গেছে। তবে হ্যাঁ, প্রচারে যেমন সচেতনতা বাড়ে, তেমনি সেই অপরাধের প্রসারও হয়। দেখা যায়, যার মাথায় ধারণাই ছিলনা ব্যাপারগুলোর, তখন সেটা তার মাথায় ঢুকে যায়।

ভারতে চলন্ত বাসে ধর্ষণের ঘটনার পর আমাদের দেশেও তার প্রচার হয়। এরপর একের পর একে বাসে ধর্ষণ হতে শুরু হয় এদেশে। ফেনীর নুসরাতকে কেরোসিন দিয়ে পুড়িয়ে মারার পর বেশ কয়েক জায়গায় এমন ঘটনা নজরে আসে। সবশেষে চট্টগ্রামে এক ভার্সিটির শিক্ষককে আক্রমণ করে কেরোসিন ঢালার চেষ্টার খবর চলে আসে।

সবচেয়ে নেতিবাচক দিক হল, অপরাধের খবর আমরা যেভাবে ঘটা করে প্রচার করি শাস্তির খবর সেভাবে করা হয় না। বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসুত্রতার কারণে ঘটনা ঘটার পাঁচ দশ বছর পর অপরাধীর চুড়ান্ত শাস্তি হচ্ছে। মাঝখানে জামিন, নিম্ন আদালত, আপিল, উচ্চ আদালত নানা রকম ব্যাপারে অনেক সময় কেটে যায়।

শাস্তি হয়তো ঠিকই হয়, কিন্তু সেই শাস্তির প্রচারও যেমন পায় না, সমাজে এর প্রভাবও তেমন থাকেনা।

গুলশানের শাজনীনকে রেপ করে হত্যা করা হয় ১৯৯৮ সালে। আসামীও ধরা পরে। কিন্তু আসামীর ফাঁসি দেওয়া হয় এর উনিশ বছর পর ২০১৭ সালে। শাজনীন রেপ ও খুন হওয়ার পর সারাদেশ যে রকম জানতো, তার আসামীর ফাঁসি হওয়ার খবর এখন কয়জন জানে? অপরাধের খবর জানার পর কিছু কিছু মানুষের মনে কৌতূহল হবে, আবার কেউ এতে নতুনভাবে উৎসাহিত হবে। এটা একটা মনুষ্য প্রবৃত্তি।

কিন্তু ধর্ষণের পরপরই যদি বিচার কাজ দ্রুত শেষ করে শাস্তি নিশ্চিত করা হত, তাহলে সেটার প্রচারে মানুষ ধর্ষণ করতে সাহস পেত না।

যে কাজটা এখন ক্রসফায়ারের মাধ্যমে হচ্ছে, সেটাই বিচারিক প্রক্রিয়ায় হতে পারে। ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে দ্রুত বিচার করে জনসম্মুখে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদন্ড দেওয়া যেতে পারে। (এখানে ধর্ষণ বলতে প্রেম করে মিউচুয়াল সেক্সকে বুঝাচ্ছি না, যেটার মামলাই বেশি হয়। এটি সত্যিকার ধর্ষণের গুরুত্বকে কমে দিয়েছে) বেশিরভাগ মানুষ যা দেখে সেটাই গ্রহণ করে। যদি একবার সবার মাইন্ড সেটআপে ঢুকানো যায় যে ধর্ষণ করলে তার শাস্তি এভাবে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যু, ঠিক এটাই তার মাথায় ঢুকে যাবে।

তখন সে জলদি বিয়ে করবে, পতিতালয়ে যাবে, ঘন ঘন বাথরুমে যাবে, দুইটা চারটা বিয়ে করবে, টাকা খরচ করে বিদেশের নাইট ক্লাবে ঢু মারবে, পারলে নিজেকে সকল যৌনতা থেকে দূরে রাখবে কিন্তু ধর্ষনের চিন্তা কখনোই মাথায় আনবে না।

ধর্ষক, মাদক ব্যবসায়ী আর ছিনতাইকারী হল সমাজে ক্যান্সারের মত। এরা মানুষের জীবন থেকে সুখ শান্তি নিরাপত্তা কেড়ে নেওয়ার মূল হোতা। এদের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি দরকার। তবেই একটি সুন্দর সমাজ, নিরাপদ দেশ গড়ে উঠবে।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত