ঢাকা      মঙ্গলবার ১৭, সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ২, আশ্বিন, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. তাইফুর রহমান

কনসালটেন্ট কার্ডিওলজি

জেনারেল হাসপাতাল, কুমিল্লা।


ভুতুড়ে এক হৃদরোগের নাম SVT

মধ্যরাতে হঠাৎ তোলপাড় শুরু হলো বুকে। মনে হচ্ছে বুকটা ফেটে যাচ্ছে, শ্বাসকষ্ট হচ্ছে খুব । ধরফর করে উঠে বসে, পানি খায় শাহনাজ নাজু। বুকে চাপ দিয়ে বসে থাকে সে। ঘেমে নেয়ে যাচ্ছে। দোয়া-দরুদ পড়ছে সে। পাশের রুম থেকে শশুড়-শাশুড়িও ছুটে আসে, আয়াতুল কুরসি পড়ে ফু দেয়।

মাত্র ২০ বছরের মেয়ে নাজু। চার বছর হলো বিয়ে হয়েছে। বাচ্চাও একটা আছে। স্বামী সেই যে বিয়ের দুই মাস পর বিদেশ গেলো আর আসার নামটা নাই। একা ঘরে একটা বাচ্চা নিয়া থাকে, জ্বীন-ভূতের আছরতো হইতেই পারে।

হুজুর চলে আসে এর মধ্যেই। হুজুর ঘরে ঢুকতেই হঠাৎ ক্যামন যেন বুকটা হালকা হয়ে গেল নাজুর। ক্লান্তিতে নেতিয়ে পড়লো নাজু। হুজুর বিজয়ের হাসি দিয়ে বিদায় নেন। নিজেকে আজ বেশ কামেল পীর মনে হচ্ছে।

তারপর মাঝে মধ্যেই এমন হতো, আবার নিজ থেকেই ঠিক হয়ে যেতো। এর কোন সময় অসময় নাই। হঠাৎ ঝড়ের মতো আসে, আবার হঠাৎই সবকিছু তছনছ করে দিয়ে শান্ত পরিবেশ, সুনসান নিরবতা।

সবাই যেন কেমন চোখে তাকায় তার দিকে! শশুর বাড়ির লোকজন তো তুচ্ছতাচ্ছিল্য শুরু করে দিয়েছে, ইশ্, ঢঙ দেখ মেয়ের! আর মানুষের জামাই বিদেশ থাকেনা! চোখে অন্ধকার দেখে নাজু। কত দোয়া কালাম পড়ে সারাদিন, তাবিজ লাগিয়েছে কতগুলো, মন শক্ত করার চেষ্টা করে। কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। হঠাৎ হঠাৎ শরীরটা যেন কেমন হয়ে যায়!

আমার চেম্বারে একদিন নিয়ে আসে মেয়েটির মা। অল্প বয়স, মেয়ে মানুষ, স্বামী বিদেশে সব মিলিয়ে মানসিকই মনে হলো। তবুও ইসিজি, ইকো করলাম। সব নরমাল। কিছু ঘুমের ঔষধ দিয়ে বিদায় করলাম। SVT সন্দেহ হওয়াতে বলে দিলাম এই অস্থিরতা চলাকালীন সময়ে একটা ইসিজি করাতে। এটা এমন এক রোগ নরমাল সময়ে সব পরীক্ষাই নরমাল আসবে।

একদিন ঠিকই ইসিজি করিয়েই নিয়ে আসলো। এখনো তার অস্থিরতা চলছে। পালস্ পাওয়া গেলোনা, ব্লাড প্রেসার নন রেকর্ডেবল। ইসিজিতে হার্ট রেট ২০০. ভর্তি করলাম সিসিইউ তে। এডেকার্ড ইনজেকশন দেয়ার সাথে সাথে রেট কমে গেল। সব কিছু স্বাভাবিক।

কেন হয় এ রোগটা?

প্রধান কারণ জন্মগত ত্রুটি। হার্টের ইলেক্ট্রিক লাইনের অতিরিক্ত বাইপাস লাইন থাকে। এই বাইপাস লাইন থাকাতে হঠাৎ হঠাৎ একটা এক্সট্রা সার্কিট তৈরী করে, শর্ট সার্কিট। ইলেক্ট্রিক ওয়েভ তখন ঘুরতে থাকে অলিন্দ- নিলয়- নিলয়- অলিন্দের এবনরমাল ঘূর্ণিবৃত্তে। যেন এক মরুঝড়, এক ঘূর্ণীবাত, বানকুড়ালী।

চিকিৎসাঃ

SVT চলাকালীন সময়ে বুঝতে পারলে ডাক্তার বা হাসপাতালে পৌঁছানো পর্যন্ত কিছু মেনিউবার করতে পারেন-

১. নাক, মুখ বন্ধ করে জোরে নিশ্বাস ছাড়ার চেষ্টা করবেন।

২. বরফ ঠান্ডা পানি দিয়ে মুখ ধুতে পারেন, ঘারের রগে মেসাজ করা যায়, তবে স্টেথো দিয়ে পরীক্ষা না করে এবং ডাক্তার ছাড়া অন্য কারো ম্যসাজ না দেয়াই ভালো।

৩. হাসপাতালে আসার পর এডেনোসিন, ভেরাপামিল ইনজেকশন দেয়া যায়। তাতে না হলে বা কখনো কখনো শুরুতেই ইলেক্ট্রিক শক দেয়া লাগতে পারে।

৪. হঠাৎ হঠাৎ, কালেভদ্রে হলে দীর্ঘমেয়াদি ও সিরিয়াস সিম্পটম না থাকলে ঔষধ সেবনই যথেষ্ট।

স্থায়ী চিকিৎসাঃ

ইলেক্ট্রো ফিজিওলজি স্টাডি করে এবনরমাল পথটা খুঁজে বের করা হয়। তারপর রেডিও ফ্রিকোয়েন্সী এব্লেশন করা হয়। তাহলে চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় এই এক্সট্রা পথ। আর কখনো হয়না এই SVT.

সুতরাং, হাসি ঠাট্টা নয়, উদার মন নিয়ে দেখুন, সঠিক চিকিৎসা করান। দেখবেন জীবনের দুঃসহ ঝড় থেমে গেছে, দিগন্তরেখায় জেগে উঠছে সাতরঙা রংধনু।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ডাক্তাররা রোগের চিকিৎসা করে, মৃত্যুর নয়

ডাক্তাররা রোগের চিকিৎসা করে, মৃত্যুর নয়

: ব্যাটসম্যানদের ভুলে আজ খেলাটা চলে গেল! : ভুল বলছেন কেন? বল…

এক্সাম ফোবিয়া ও ডিপ্রেশন: মুক্তির সহজ সমাধান

এক্সাম ফোবিয়া ও ডিপ্রেশন: মুক্তির সহজ সমাধান

প্রশ্ন: স্যার আমি মেডিকেলের ৩য় বর্ষের ছাত্রী। মেডিকেলে ইতিমধ্যেই ১ বছর লস…

সন্তানের থ্যালাসেমিয়ার জন্য পিতা-মাতার অজ্ঞতাই দায়ী!

সন্তানের থ্যালাসেমিয়ার জন্য পিতা-মাতার অজ্ঞতাই দায়ী!

সিএমসি, ভেলোরে আমি যে রুমে বসে রোগী দেখছি সেখানে ইন্ডিয়ার অন্যান্য রাজ্যের…













জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর