ঢাকা      শুক্রবার ১৯, জুলাই ২০১৯ - ৩, শ্রাবণ, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. মাহফুজুর রহমান রাজ

ডেন্টাল সার্জন

রাজশহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে


‘অপ্রয়োজনীয়’ সিজার নিয়ে রিট ও আমার একটি অভিজ্ঞতা

সিজার নিয়ে যে রিট হয়েছে তার পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি নিয়ে কোনো কথা বলার ইচ্ছা ছিল না। কারণ এ বিষয়ে আমার জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত। তারপরও নিজের অভিজ্ঞতা থেকে প্রাসঙ্গিক কিছু কথা বলবো। 

রাজশাহীর একটি উপজেলায় একটি প্রাইভেট ক্লিনিক পরিদর্শনে গিয়েছিলাম মূলত ব্যক্তিগত কাজে। ক্লিনিকের মালিক পরিচিত; কথা বলার এক পর্যায়ে তিনি বললেন, স্যার একটু বসেন আমি আসছি। 

ফিরে আসার পরে যা বললেন, তাতে আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলাম। বিষয় হলো: তাঁর এখানে যে গাইনি চিকিৎসক ম্যাডাম আসেন, তিনি রাজশাহী থেকে আসেন। কিন্তু সন্তান অসুস্থ হওয়ার জন্য সেদিন আসতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন। এ অবস্থায় হাসপাতালে যে দুটো সিজারের রোগী ছিলেন তাদের অপারেশন ক্লিনিকের মালিক নিজেই করে ফেলেছেন।  

আমি তাঁকে প্রশ্ন করলাম, আপনি সিজার করলেন? আপনি তো চিকিৎসক নন। উনি জবাবে বললেন, এটি কোন বিষয় না, অনেকদিন ধরে দেখতে দেখতে এখন আমি করতে পারি, তাও ম্যাডামের জন্য রেখে দিই। তাঁকে বললাম, তাহলে কালকের জন্য রেখে দিলেন না কেন?তিনি জানালেন, সিজারের রোগী রেখে দেওয়া যাবে না, কারণ এগুলো দালালকে দিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম কিভাবে? ক্লিনিকের মালিক জানালেন, দালালরা গ্রামে গ্রামে যেসব গর্ভবতী মহিলারা থাকেন তাদের ব্যথা উঠলে বা কোনো সমস্যা হলে তারা প্রথমে রোগীকে ভয় দেখান—হার্ট বিট পাওয়া যাচ্ছে না, পানি কমে গেছে, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলেন, বাচ্চা নড়ছে না ইত্যাদি। এরপর স্বজনেরা আতঙ্কে রোগীকে নিয়ে ক্লিনিকে চলে আসেন।  

ক্লিনিকের মালিক আরও জানালেন, রোগী নিয়ে হাসপাতালে আসার পর তাদের বোঝাতে হয়, অনতিবিলম্বে সিজার করতে হবে, না হলে বাচ্চা বাঁচানো যাবে না। সুতরাং ম্যাডাম যেহেতু আসতে পারবেন না, সেহেতু আমার কোনো উপায় নাই, তাই করে দিলাম। 

এমনকি অপারেশনগুলোয় ম্যাডামের সঙ্গে অ্যানেসথেশিওলজিস্ট হিসেবে কাজ করেন জানিয়ে অচিকিৎসক ওই ক্লিনিক মালিক দাবি করেন, অনেক অ্যানেসথেশিওলজিস্টের চাইতে যথেষ্ট পারদর্শী তিনি। 

আমার কথাগুলো বিশ্বাস হোক বা না হোক—আমার কিছু করার নাই। বাংলাদেশের উপজেলা এবং জেলায় চিপা গলির মধ্যে গড়ে ওঠা অনেক ক্লিনিক, নার্সিং হোমে দালালদেরকে দিয়ে রোগী নিয়ে এসে এভাবে সিজার করানো হয়। এই ক্লিনিকগুলোতে বিভিন্ন চিকিৎসক ও সার্জন অপারেশনগুলো করেন বটে, কিন্তু বাস্তবতা হলো—দালালদের দিয়ে বিভিন্ন রোগী নিয়ে এসে সার্জনদেরকে ফোন দিয়ে ডেকে এনে অপারেশন করিয়ে দেওয়া হয়।

এই অবস্থা ঢাকা শহরের বিভিন্ন হাসপাতাল বা জেলা শহরের নামী হাসপাতালগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নাও হতে পারে। সুতরাং এই বড় হাসপাতালগুলোতে আমাদের যে সকল গাইনি সার্জন, ম্যাডাম আছেন তাদেরকে এসব ঘটনার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না। তবে গ্রামের মানুষ কতটা সরল ও অনেক ক্ষেত্রে কী পরিমাণ অসচেতন তা উপজেলায় কাজ করা জুনিয়ার চিকিৎসকরা খুব ভালো করেই জানেন। অবশ্য এ কারণে সকল মানুষই বোকা এবং ভালো না তা না, কিছু খারাপ মানুষ আছে কিন্তু সেটি খুব কম সংখ্যায়।  তারা প্রতিবাদ করতে গেলে, তাদেরকে বাদ দিয়ে নতুন জুনিয়র ডাক্তার রাখা হয়। অনেক ক্লিনিকে কোনো ডাক্তারও রাখা হয় না। মূলত বড় হাসপাতালগুলোতে প্র্যাকটিস জমাতে ব্যর্থ হওয়া কিছু চিকিৎসক, সার্জন ক্ষ্যাপ মারার মতো এই ক্লিনিকগুলোতে গিয়ে অপারেশনগুলো করে থাকেন। 

ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন কি চিন্তা থেকে এ সংক্রান্ত একটি রিট করেছেন আমি সেটি জানি না। তবে বিষয়টি যদি এরকম হয় যে, কোনো রোগী যদি মনে করেন তার রোগীর সিজার না করলেও চলতো, তাহলে সে ক্ষেত্রে যদি আইন থাকে তাহলে রোগীর স্বজনেরা তখন আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্টসহ বিভিন্ন পরীক্ষায় লেখার কাগজপত্র নিয়ে মামলা করতে পারবেন। 

তবে কোনটি সিজার করতে হবে কোনটি হবে না এটি ব্যারিস্টার সাহেবরা ঠিক করবেন কিনা বলে যারা বলছেন তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, যদি একটি ভালো আইন হয় সেই ক্ষেত্রে কেউ যদি মামলা করেন, তাহলে ডাক্তারদের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্যানেল কাগজপত্র দেখে নির্ধারণ করবেন সেটি সিজার করা প্রয়োজন ছিল কিনা। মহামান্য আদালত তার নির্দেশনায় এ রকম বিশেষজ্ঞ প্যানেল নির্ধারণ করে দিতে পারেন।

মূল কথা মানুষকে সচেতন করতে হবে, যাতে তারা গর্ভবতী হবার পর ধাপে ধাপে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলা করে রাখেন। এই প্রসঙ্গটি আসলে এই মামলায় চিকিৎসকদের একটা সুবিধা হবে, তাহলো: কোয়াক প্রাকটিস নিয়ে কথা হবে। কারণ অনৈতিকভাবে বেশিরভাগ সিজার কোয়াক চিকিৎসকরা ও নামমাত্র ক্লিনিক ও নার্সিংহোমগুলাতেই করা হয়ে থাকে। 

রিটের বিষয়টি চিকিৎসকদের মান-সম্মানের বিষয় হিসাবে না দেখে মানবতার স্বার্থে, গ্রামের গরিব মানুষদের স্বার্থে বিষয়টি সবাই যদি বিবেচনা করেন এবং আদালতে চিকিৎসক প্রতিনিধিও তার মতামত দিয়ে বক্তব্য রাখতে পারেন। তাহলে সবকিছুর মধ্য দিয়ে একটি চমৎকার ও জনবান্ধব আইন বা মহামান্য আদালতের নির্দেশনায় বের হয়ে আসবে বলে আমাদের ধারণা।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে

হাসপাতালের সকলে মিলে সমাজকে অনেক কিছুই দিতে পারে। সাধারণত যে মানুষ যেভাবে…

মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় ইরানের এগিয়ে চলার গল্প 

মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় ইরানের এগিয়ে চলার গল্প 

যতদিন যাচ্ছে ইরানের মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় যুক্ত হচ্ছে অভূতপূর্ব সব অবিষ্কার। বিশ্ব…

বিদেশে চিকিৎসা: শোনা কথায় কান দিবেন না

বিদেশে চিকিৎসা: শোনা কথায় কান দিবেন না

যখন গাইনী আউটডোরে চাকরি করি তখন এক জুনিয়র এসে বলল "আপু তোমরা abnormal…

সাইমন্ড্স ডিজিজ রোগ ও তার প্রতিকার

সাইমন্ড্স ডিজিজ রোগ ও তার প্রতিকার

আমাদের মাথার ভেতরে পিটুইটারি গ্রন্থির অবস্থান। পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নানা রকম হরমোন…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর