ঢাকা      মঙ্গলবার ১৬, জুলাই ২০১৯ - ১, শ্রাবণ, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. তাইফুর রহমান

কনসালটেন্ট কার্ডিওলজি

জেনারেল হাসপাতাল, কুমিল্লা।


হাইপারটেনশন এক নিরব ঘাতকের নাম

“ভাইয়া আমার প্রেশারের খুব খারাপ অবস্থা” -গ্রাম থেকে আমার এক উদ্বিগ্ন দাদার ফোন। আমি চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করি- “দাদা কি হয়েছে?” দাদার জবাব- “আমার ডান হাতে হাই প্রেশার, বাম হাতে লো প্রেশার।” আমি জানতে চাইলাম- “কে মাপলো আপনার প্রেশার?” দাদা বললো- “গুরুপদ ডাক্তার। আমাদের গ্রামের একজন পল্লী চিকিৎসক। একটা ঔষধের দোকান চালান।”

আমি হাসি দিয়ে বললাম- “ডান হাতে প্রেশারের ওষুধ খান আর বাম হাতে ওরস্যালাইন খান।” দাদা বললেন- “আমার সাথে দুষ্টামি করতেছো?” আমি হাসতে হাসতে বলি চলে আসুন কুমিল্লায়। দেখি কি করা যায়।

চেম্বারে প্রায়ই রোগীরা আসে প্রেসারের সমস্যা নিয়ে। জিজ্ঞেস করি কি সমস্যা?

: স্যার, আমার প্রেসার আপ-ডাউন করে।

প্রায়ই আমি প্রেসার মেপে দেখি হাই প্রেশার। বলি- প্রেশারতো আপ দেখছি, ডাউন হয় কখন?

অনেক রোগী আসে, বিশেষ করে মহিলা। এসেই বলে, স্যার লো প্রেশার। মেপে সাধারণত নরমাল প্রেশার পাই। আবার অনেক রোগীর প্রেশার মেপে প্রেশার হাই বলতেই চিৎকার দিয়ে উঠেন, আগেতো কখনো বেশি পাইনি!

কি হাসি পাচ্ছে? ভুল মাপা, ভুল ধারণা বা মিথ্যা কথা বলছে তারা? না, সবগুলো ঘটনারই ব্যখ্যা আছে।

একবার এক হাসপাতালে কলে রোগী দেখতে গেলাম। রোগী অজ্ঞান, প্রেশার পাওয়া যাচ্ছে না। প্রেশার তোলার জন্য ডোপামিন চলছে। ডান হাতে প্রেশার মেপে দেখলাম সত্যি প্রেশার নাই। কেরোটিড রক্তনালীতে হাত দিয়ে দেখলাম পালস্ বেশ জোড়ালো। অতএব প্রেশার ভালো থাকার কথা। বাম হাতে প্রেশার মেপে দেখা গেল প্রেশার অনেক বেশী। ডোপামিন বন্ধ করা হলো।

আমার একজন রোগী আছে যার দুই হাতে প্রেশার নাই। অথচ প্রেশার সবসময় বেশী থাকে। তার প্রেশার পায়ে মাপতে হয়।

হোয়াইট কোট হাইপারটেনশন বলতে একটা কথা আছে, যেখানে বাসায় প্রেশার নরমাল থাকে কিন্তু ডাক্তারের চেম্বারে আসলেই প্রেশার বেড়ে যায়।

ওষুধের দোকানে বেশিরভাগ সময়ই প্রেশার লো পায়। অনেক বেশী প্রেশারের রোগীরও লো পায়। আমরা স্টেথোস্কোপ ব্যবহার করি ৬০০০ টাকা দামের আর তাদেরটা ২০০ টাকা। শব্দ ভালো শুনতে পাওয়ার কথা না। প্রেশার মাপায়ও সবাই এক্সপার্ট হবে এমনটা আশা করা বোকামি। আরেকটা কারণ হতে পারে ইচ্ছে করে লো প্রেশার বানায়। এতে রোগীর দূর্বলতার সাথে মিলে যায়। এতে একটা সেলাইন দেয়া সহজ হয়। ৫৫ টাকার সেলাইনের বিল হয় ৪৫০/৫০০ টাকা।

সত্যি সত্যিই প্রেশার বেশী পেলে ঔষধ দিতেই হয়। তখন শুরু হয় প্রশ্ন, আতংক।

আমার শরীরতো মোটা না। আমার কেনো প্রেশার হলো? আমারতো কোন সমস্যা নাই, ওষুধ না খাইলে চলবে না? গতরাতে ভালো ঘুম হয় নাই, এজন্য বোধহয় প্রেশার বাড়ছে। ঘুমাইলে ঠিক হইয়া যাইবো।

প্রেশারের ঔষধ একবার শুরু করলে কি আর ছাড়া যাবে? অনেকেই একবার মেপে নরমাল পেলেই ঔষধ বন্ধ করে দেন।

আসুন জানি বিষয়গুলোঃ

শরীর মোটা চিকনের সাথে প্রেশারের কোন সম্পর্ক নাই। প্রেশারের ৯০ ভাগের কোন সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায় না। শুধু কিছু রিস্ক ফ্যাক্টরকে দায়ী করা হয়। এদেরকে এসেনশিয়াল হাইপারটেনশন বলে।

বাকি ১০% এর কারণগুলো মোটামুটি নিম্নরূপ-

১. কিডনিরোগ।

২. হরমোন জনিত রোগ।

৩. ব্যাথানাশক ঔষধ, গর্ভনিরোধক বড়ি, ইনজেকশন । 

৪. মহাধমনীর গোড়া সরু (কোয়ার্কটেশন অব এওর্টা), কিডনি ধমনী সরু (রেনাল আর্টারী স্টেনোসিস)।

৫. মদ্যপান।

হাইপারটেনশন এক নিরব ঘাতকের নাম। এই প্রেশারের ঢেউ যেখানে যেখানে লাগে সেখানেই ক্ষতি হয়। বিশেষ করে টার্গেট অরগ্যানগুলো যেমন- ব্রেইন, হার্ট, কিডনির মারাত্মক ক্ষতি করে। সুতরাং অবহেলা করার সুযোগ নাই। সঠিক ও কার্যকরী চিকিৎসা অবশ্যই নিতে হবে।

ওষুধ চলা অবস্থায় নরমাল পেলে ওষুধ বন্ধ করা যাবেনা। ধরুন, একটা স্প্রিং স্বাভাবিকের চাইতে উঁচু হয়ে গেল। পাঁচ কেজি ওজনের বাটখারা মাথায় রেখে লেভেলে আসলো। আপনি কি বাটখারা তুলে নিবেন? এতে করে স্প্রিং টা লাফ দিয়ে হঠাৎ আরো উপরে উঠে যাবে। হ্যাঁ, যদি বেশী নিচে নেমে যায় ওজন কমিয়ে দিন। ৪.৫ কেজি করুন, যদি তাও নিচে থাকে আরো কমান, ৪ কেজি করুন। একসময় পুরো ওষুধই বাদ দেয়া যেতে পারে। তবে বুঝে শুনে, রয়ে সয়ে, ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক।

আসুন রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখি, কমাই জীবনের চাপ, ঝেড়ে মুছে ফেলি হৃদয়ের দুশ্চিন্তার ছাপ। মন হোক ফুরফুরে, মৃদু বাতাসে দোলা রজনীগন্ধা বা ঝুমকো জবার মতো।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ওয়েবার সিনড্রোম

ওয়েবার সিনড্রোম

জার্মান চিকিৎসাবিজ্ঞানী স্যার ওয়েবার ১৮৬৩ সালে সর্বপ্রথম ওয়েবার সিনড্রোমের কথা বলেন। বিজ্ঞানী…

রক্তে কোলেস্টেরল: প্রতিরোধের উপায় কি?

রক্তে কোলেস্টেরল: প্রতিরোধের উপায় কি?

শরীরের চর্বি বা কোলেস্টেরল নিয়ে নানা ধরণের ভুল ধারণা আমাদের মধ্যে আছে।…

যেভাবে বিপদজনক হয়ে উঠছে ডেঙ্গু!

যেভাবে বিপদজনক হয়ে উঠছে ডেঙ্গু!

ডেঙ্গু (Dengue) যে ভাইরাস (virus) দিয়ে হয় তার নাম Dengue virus. এই…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর