ঢাকা      শুক্রবার ২০, সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ৪, আশ্বিন, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. আশিকুর রহমান রুপম

প্রাক্তন অনারারি মেডিকেল অফিসার,

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।


মেডিকেল শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের জানা জরুরি 

বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি মিলে মোট ১১১টি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। প্রতি বছর ১০ হাজার ডাক্তার পাস করছেন। এরইমধ্যে ৩৫ হাজার ডাক্তার আছেন, যারা বেকার বা ক্লিনিকে যৎ সামান্য বেতন আর কেউ বা প্রাইভেট প্রাক্টিস তথা জেনারেল প্রাক্টিশনার বা সনোলজিস্ট হিসেবে আয় রোজগার করে যাচ্ছেন। এরকম কঠোর পরিশ্রম করে অনেকে চান্স পাচ্ছেন, অনেকে পাচ্ছেন না। দিনের পর দিন এই Hand to mouth শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। MBBS এর পর কিসে আবার চান্স? আমার মনে হয় ডাক্তারের ছেলে মেয়ে বা শিক্ষক বা বিসিএস ক্যাডারের ছেলে মেয়ে ছাড়া বাকি সাধারণ বাবা-মাগণ এ বিষয়ে তেমন অবগত নন। তাদেরকে কতগুলো জিনিস জানানো দরকার বলে মনে করছি। 

নিম্নের সব কথাগুলোই এই গ্রুপের বাবা-মার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে। 

প্রতিটি বাবা-মাই তার সন্তানকে প্রতিষ্ঠিত হিসেবে দেখতে চান। এক্ষেত্রে সরকারি মেডিকেলের চেয়ে বেসরকারি মেডিকেলের ছেলে মেয়েদের বোধ হয় একটু বেশিই প্রত্যাশা থাকে। বাবা-মা মনে করেন, ডাক্তারি পেশাটা খুব আড়ম্বরপূর্ণ। এ পেশাতে যারাই আসেন, তারাই সহজে কম সময়ে প্রতিষ্ঠা পায়। ভাবনা সম্পূর্ণ ভুল না হলেও সম্পূর্ণ ঠিকও নয়। মূলত এ পেশাতে প্রতিষ্ঠা পেতে বেশ সময় লেগে যায়। বাবা-মায়েরা এটা বুঝতে চান না। তারা ভাবেন, এমবিবিএস করলেই তো ডাক্তার। এখন শুধু সেবা দিবে, ইনকাম করবে। অনেকে অবশ্য এটা জানেন যে, “বড় ডাক্তার” হতে চাইলে ডিগ্রি গ্রহণ করতে হবে। সে না হয় হবে, বয়স তো আছে। কিন্তু কি সেই পরীক্ষা? কতটা কঠিন? কত দিন লাগে চান্স পেতে? বছরে কয়বার দেওয়া যায়? কত টাকা লাগে ফর্ম ফিল-আপ করতে? এসব বিষয়ে অধিকাংশ বাবা-মাই বেখেয়াল থাকেন। 

যে ছেলে বা মেয়েটিকে এতদিন আদর-যত্ন করে এমবিবিএস পর্যন্ত অক্ষরে-অক্ষরে নিয়ম-কানুন মেনে চলিয়ে, বারবার উৎসাহ দিয়েছেন যে ডাক্তারি পাস করতেই হবে, সেই বাবা-মাই পাস করার পর হঠাৎ করে মনের দিক থেকে বয়স্ক হয়ে যান এবং বাচ্চাদেরও বয়স্ক ভাবতে শুরু করেন। ধরেই নেন যে, এখন বাচ্চা ডাক্তার। বড় হয়ে গেছে। বিয়েও দিয়ে দেন অনেকে। সুতরাং ভাবেন, এখন জগৎ তার। সে নিজের মতো করে গুছিয়ে নিক। 

কিন্তু এখানেই আমার কাছে মনে হয়েছে সবচেয়ে বড় ভুল মনে হয়েছে। বাবা-মাদের এমবিবিএস পরবর্তী ছেলে-মেয়েদের জীবন, পরীক্ষা, পরীক্ষায় পাস সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা রাখা উচিত। এবং ঠিক এমবিবিএসের মতো করেই বারবার তাগিদ, তাড়া এবং প্রেরণা দেওয়া উচিত। প্রতিদিন পড়াশোনা কেমন হচ্ছে তা খোঁজ নেওয়া উচিত। 

তাদের অবগত হওয়া উচিত এমবিবিএস শেষ করার পর ডাক্তারদের দুই রকম পড়াশোনা করতে হয়। এক. চাকরির পড়াশোনা তথা বিসিএস ধারা, যা বছরে মাত্র একবার আসে এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের পড়াশোনা। দুই. বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হবার ডিগ্রি তথা পোস্ট গ্রাজুয়েশনের জন্য পড়াশোনা। 

দুই লাইনের দুই পড়াশোনাই সমান তালে অনেকে চালিয়ে নেন, অনেকে পারেন না। তখন যে কোনো একদিকে ছুটেন। আর এই সময়টাতেই বেশির ভাগ ছেলে-মেয়ের বিশেষ করে ছেলেদের অর্থের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তখন শুরু করেন বিভিন্ন ক্ষ্যাপ/প্রাইভেট প্র‍্যাক্টিস বা প্রাইভেট মেডিকেলে সহকারী রেজিস্ট্রার পদে কলুর বলদের মতো অল্প বেতনে খাটুনি। অবশ্য লেকচারার পোস্টের লোকজন বেশ আরামে থাকেন। তারা ছাত্রদের পড়ানোর জন্য নিজেরাও সর্বদা পড়াশোনার সংস্পর্শে থাকেন এবং দ্রুত চান্স পান। 

পোস্ট গ্রাজুয়েশন সম্পর্কে কিছু কথা:

এফসিপিএস পরীক্ষা। বড় ডিগ্রি। খুব কঠিন পরীক্ষা। তিন দিনে হয়। তিন দিন ঢাকায় থেকে পরীক্ষা দিতে হয়। পরীক্ষার ফর্ম ফিল আপ করতে এ বছর লাগছে ১১ হাজার টাকা। প্রিপারেশন নিতে কম পক্ষে ৬ মাস নাক মুখ বন্ধ করে পড়তে হয়। চাকরি করে বা ক্ষ্যাপ মেরে পড়া খুব কঠিন। বছরে দুইবার দেওয়া যায়। জানুয়ারি এবং জুলাই। তবে এ ডিগ্রিতে পাসের হার কম। তবে শেষ করতে পারলে বিশেষজ্ঞ হিসেবে সুনামের সঙ্গে কাজ করা সম্ভব।  

বর্তমানে ডাক্তারদের মধ্যে রেসিডেন্সির চাহিদা সবচেয়ে বেশি। রেসিডেন্সি হলো চান্স পেলে একটা নির্দিষ্ট হাসপাতালে রোস্টার ডিউটির মতো ট্রেনিং করে পড়াশোনা করা এবং এতে সরকার প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা ভাতা প্রদান করে। আর এই ট্রেনিংয়ে সরাসরি প্রফেসরদের দ্বারা ক্লাস, পরীক্ষা হয়। শেখা হয় ভালো। পাসের হারও ভালো। পরীক্ষা হয় বছরে শুধু একবার। নভেম্বর মাসে। পরীক্ষা হয় ঢাকায়। এটা লং কোর্স—পাঁচ বছরের।

আরেকটি ডিগ্রি পরীক্ষা হলো ডিপ্লোমা/এমফিল/এমপিএইচ। বছরে একবার দেওয়া যায়। মোটামুটি মার্চ-এপ্রিলের দিকে হয়। এটার চাহিদাও আছে। কারণ মাত্র দুই বছরে ডিগ্রি শেষ করে বিশেষজ্ঞ হওয়া যায়। তবে চাকরিতে পদোন্নতি বেশি পাওয়া যায় না। তাই অনেকে পড়ে আবারো রেসিডেন্সি বা এফসিপিএস করতে চান।

আরেকটি বিষয় বাবা-মায়েরা বুঝতে চান না। ডাক্তারদের মাঝে কয়েকটি কাজের ধারা আছে। তার মধ্যে আছে ক্লিনিক্যাল (যারা সরাসরি রোগী দেখেন, চিকিৎসা দেন/অপারেশন করেন), আরেকটি হলো প্যারাক্লিনিক্যাল (যারা প্যাথলজিকাল রোগ-নির্ণয় করেন, চিকিৎসা দেন না) এবং আরেকটি হল বেসিক (যারা শুধু ছাত্র পড়ান, চিকিৎসা দেন না)। বেশির ভাগ বাবা-মাই চান, প্রথম লাইন তথা ক্লিনিক্যাল লাইনে সন্তানকে দেখতে। অথচ প্রত্যেকটি লাইনই ভালো। সবগুলোতেই প্রতিষ্ঠা পাওয়া সম্ভব। বরং ক্লিনিক্যাল লাইনটাই সবচেয়ে কঠিন এবং সময় স্বাপেক্ষ। এটা বাবা-মাকে বুঝতে হবে। 

যাই হোক, আমার লেখার উদ্দেশ্য হলো, প্রত্যেকটি সন্তানই তার বাবা-মায়ের কাছে চোখের মনি। কি করলে ভালো হবে, এটা জানতে পারলে তারা জীবনের সবটুকু দিতেও কুণ্ঠাবোধ করবেন না। তারা সন্তানের প্রতিষ্ঠা দেখতে চান। যে বাবা ডাক্তারি পাস করার আগ পর্যন্ত লেগে থাকেন, বিশেষজ্ঞ পরীক্ষায় চান্স না পাওয়া পর্যন্ত তারা যেন লেগে থাকেন, এই অনুরোধ। যাদের সামর্থ্য আছে, তাদের নব্য ডাক্তার সন্তানকে যেন, অর্থের চিন্তা করতে না হয়, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। কেননা, একটু ক্যালকুলেশন করলে দেখা যায়, ডিগ্রি ছাড়া ডিউটি করে একবছর ইনকাম করে করে পড়লে যা আয় হবে, ডিগ্রিতে চান্স পেলে তার চেয়ে বহুগুণে এগিয়ে যাবে। সম্মানও পাবে। এক্ষেত্রে বিশেষ অবস্থায় কেউ যদি ব্যাংক লোন করেও পড়ে, পরে সে ডাক্তারই তা শোধ করতে পারবেন অনায়াসে। সুতরাং সেটাও করা যায়। কথা শুনলে হয়তো হাস্যকর মনে হতে পারে। কিন্তু যা বলছি, সবগুলো নিজের চোখে দেখা বাস্তব অভিজ্ঞতা। অনেকেই এই কষ্টে আছেন। অবশ্য যাদের পারিবারিক অবস্থা নিদারুণ। তাদের ক্ষেত্রে উপায় নেই। 

বিষয়গুলো নিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানদের আরো খুলে বলার অভ্যাস করা যায়। ছাত্রজীবন থেকেই অল্প অল্প করে কিছু টাকা সঞ্চয় করে রাখা যেতে পারে, যাতে সন্তান পাস করার সঙ্গে সঙ্গেই পরের ধাপ অর্থাৎ পোস্ট গ্রাজুয়েশনে চান্স পাওয়ার জন্য প্রিপারেশন নিতে পারে।
 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

সন্তানের থ্যালাসেমিয়ার জন্য পিতা-মাতার অজ্ঞতাই দায়ী!

সন্তানের থ্যালাসেমিয়ার জন্য পিতা-মাতার অজ্ঞতাই দায়ী!

সিএমসি, ভেলোরে আমি যে রুমে বসে রোগী দেখছি সেখানে ইন্ডিয়ার অন্যান্য রাজ্যের…

এক্সাম ফোবিয়া ও ডিপ্রেশন: মুক্তির সহজ সমাধান

এক্সাম ফোবিয়া ও ডিপ্রেশন: মুক্তির সহজ সমাধান

প্রশ্ন: স্যার আমি মেডিকেলের ৩য় বর্ষের ছাত্রী। মেডিকেলে ইতিমধ্যেই ১ বছর লস…

আনিসের প্রত্যাবর্তন 

আনিসের প্রত্যাবর্তন 

রাস্তায় একজনের মুখে সরাসরি সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে দিলো আনিস। আচমকা এ আচরণে…

আধুনিক মায়েরা সিজার ছাড়া বাচ্চা প্রসবের চিন্তাই করেন না

আধুনিক মায়েরা সিজার ছাড়া বাচ্চা প্রসবের চিন্তাই করেন না

সমাজে কিছু মানসিকভাবে অসুস্থ ডাক্তার বিদ্বেষী মানুষ আছে। অসুখ হলে ইনিয়ে বিনিয়ে…

বদ লোকের গল্প!

বদ লোকের গল্প!

উপজেলায় নতুন তখন। সবাইকে ঠিকঠাক চিনিও না। হঠাৎ একদিন আমার রুমে পেট…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর