ঢাকা      মঙ্গলবার ১৬, জুলাই ২০১৯ - ১, শ্রাবণ, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. ফাহমিদা শিরীন নীলা

এমবিবিএস, এফসিপিএস (গাইনী)

ফিগো ফেলো (ইতালি)

গাইনী কনসালট্যান্ট, বগুড়া।


সিজারিয়ান ডেলিভারী বনাম গাইনী ডাক্তার

আমরা গাইনী ডাক্তাররা কেন কিভাবে সাধারণ মানুষের কাছে খারাপ হই? কেন সাধারণ মানুষ ভাবে, আমরা ইচ্ছে করেই তাদের অপারেশন করে দিচ্ছি। নরমালে যে বাচ্চা হতে পারতো তাকে পেট কেটে বের করছি। কেন? পয়সার লোভে? এটাই সাধারণের ধারণা। আর শুধু সাধারণই বা বলছি কেন! অন্য ডিসিপ্লিনের অনেক ডাক্তারও এমনটাই ভাবে। ভাবার কিছু কারণ আছে। সেগুলো আলাপের আগে চলুন শুনে নিই দুটো একটা গল্প।

সাহিত্য গ্রুপে স্বাস্থ্য বিষয়ক পোস্ট দেয়ার সাথে সাথেই ইনবক্সে নানান মেসেজ আসতে থাকে। স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, পরামর্শ। প্রথম দিকে পারতপক্ষে আমি সবারই উত্তর দেয়ার চেষ্টা করতাম। কেন সেটা বন্ধ করলাম সেই গল্পটা আগে বলি। এক মেয়ে প্রায় আমাকে মেসেঞ্জারে নক করে অনেক প্রশ্ন শেষে বলতো, আমি আসব আপনার কাছে। এটা বলার পরে বেশ কিছুদিন গ্যাপ দিয়ে সে আবারো অনেক প্রশ্ন করে জানাতো সে শীঘ্রই আসবে দেখাতে। সে মূলতঃ সাবফার্টিলিটির রোগী ছিল। বাচ্চা চাইতো। আমাকে নানানভাবে মেসেঞ্জারে ট্রিটমেন্ট দেয়ার জন্য উৎসাহিত করতো। সাধারণ টুকটাক সমস্যার ট্রিটমেন্ট ফোনে বা মেসেঞ্জারে দেয়া গেলেও বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসা এভাবে দেয়া অসম্ভব। অন্ততঃ যুগলের রিপোর্ট না জানলে। আমি বলতাম, আমাকে না দেখালেও চলবে কিন্তু আপনি ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ খান।

এভাবে বেশ অনেক ক'বার একই কথামালার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে শেষটায় আমাকে মেসেজ দিল, 'আপনার কাছে গেলে আমাকে আপনি ইঞ্জেকশন দেবেন না তো আবার?' এরপর আর কথা কন্টিনিউ করার কোন মানে হয় না। এত সময় কোথায় আমার যে চাইল্ডিশ একটা মেয়ের সাথে দিনের পর দিন চ্যাট করে তাকে সুপরামর্শ দিব! সে যাক, এ ঘটনার পর থেকে আমি খুবই সাবধানে কথাবার্তা চালাই মেসেঞ্জারে। বারবার বেলতলায় যাওয়া মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ না। তবু যে একেবারে কারোটার উত্তর দেই না তাও না। প্রশ্ন শুনে সমস্যার গুরুত্ব বুঝে উত্তর দেই।

একদিন এক মেয়ে জানতে চাইলো আমি কোথায় বসি। সে তার বোনকে নিয়ে আসতে চায়, নরমাল ডেলিভারি করাতে চায়। আমি ঠিকানা দিলেও এ নিয়ে কোন আশা রাখি না। রোগীর বিষয়ে এক্সপেকটেশন শব্দটা আমার ডিকশনারীতে অনেক আগে থেকেই ঝাপসা হয়ে গেছে। কিংবা বলা যায়, আমিই ঝাপসা করে রেখেছি। এতে ঝামেলা কম। আর তাছাড়া অজানা অচেনা মানুষের কাছে এক্সপেকটেশন রাখবোই বা কেন! তবু যেদিন চেম্বারে এসে গ্রুপটার পরিচয় দিয়ে জানালো, সেই সে মেয়ে তখন এক ভীষণ ভালোলাগা কাজ করেছিল। গ্রুপটাই যে একটা ভীষণ দূর্বলতার জায়গা।

যা হোক, ওনার বোনটা লেবারের ফার্স্ট স্টেজে ছিল। ব্যাথাও তেমন ছিল না। কিন্তু আমি ইন্টারনাল পরীক্ষা করে দেখলাম, তার ফাইন্ডিংস খুব ভাল। আমি তাকে ক্লিনিকে ভর্তি হতে বললাম। তখন সন্ধ্যা। তাকে কাউন্সেলিং করলাম। রাতে তাকে ড্রিপ দিব না। বরং ঘন্টা দুয়েক পরে তার সার্জিক্যাল ইন্ডাকশন (পানি ভেঙে দেয়া) করে লাইকারের (জরায়ুর পানি) কালার দেখে নিলাম। সারারাতের ব্যাপার। বাচ্চা যদি আগে থেকেই খারাপ থাকে, লাইকারের কালার আমাকে সাবধান করে দেবে। লাইকারের কালার ভাল। আমার হিসাবে সব ঠিক থাকলে ভোররাত নাগাদ ডেলিভারি হয়ে যাবে। তাই ওকে প্যাথেডিন দিয়ে রাখতে বললাম। এটা দুইদিক থেকেই উপকারী। রোগীও ঠান্ডা থাকবে, ওদিকে জরায়ুর মুখও খুলবে।

আমি চলে আসলাম ক্লিনিক থেকে। রোগীর বোন, সেই মেয়েটি বারবার আমার সামনে হাতজোড় করছিল যেন নরমাল ডেলিভেরী করে দেয়া হয়, যেভাবেই হোক। ওনার এরকম অবিবেচনাপূর্ণ আচরণে অবাক হয়েছি। আজকালকার যুগে একটা কচি প্রসূতিও জানে, নরমাল ডেলিভেরী কারো হাতের খেলা নয়। এটা পুরোটাই বিধাতার কলকাঠির ফসল। যা হোক, সারারাতই প্রায় আধো ঘুম আধো জাগরণে পার করলাম। পাছে ক্লিনিক থেকে ফোন আসলে যদি বুঝতে না পারি! ফোন আসলো না। অযথা মাথাব্যথা নিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে নিজেই ফোন দিলাম ডিউটি ডাক্তারের কাছে। 'কি ব্যাপার, রোগীর খবর জানালে না!'

সে উত্তরে যা জানালো তাতে আমি হতবাক। আমি আসার ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই তারা নানান অভিযোগ করে চলে গেছে। মূল অভিযোগ, ম্যাডাম কেন নরমাল ডেলিভেরী না করিয়ে বাড়ী গেল? ম্যাডাম কেন রোগীর কাছে থাকলো না? কেন ডেলিভেরী এখনও হল না? ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ যে পোস্টখানি পড়ে তারা আমাকে নক করেছিল সেখানেই আমি পঁইপঁই করে বুঝিয়ে বলেছিলাম, নরমাল ডেলিভেরীতে প্রধানত যা দরকার তা হল ধৈর্য্য।

যা হোক, আমি কষ্ট পেলেও ভুলে গেলাম ধীরে ধীরে। কষ্টটাও পেতাম না, যদি না সে আমার ভালোবাসার গ্রুপের সদস্য হিসেবে না আসতো। শুনেছি তারা অন্য এক ক্লিনিকে নিয়ে গিয়ে সিজার করেছেন। তা বেশ। কিন্তু এর পরের কাহিনী খুবই ইরিটেটিং। আমার লেখা রোগীনামচায় তারা কমেন্ট করেছেন, আমার কাছে তারা যে সেবা পেয়েছে তাতে তারা তো বটেই তাদের চৌদ্দগুষ্টির কাউকে আমার কাছে পাঠাবে না। আমাকে যেন আল্লাহ হেদায়েত করেন।

আর হ্যাঁ, আরো একটা বড় কমপ্লেইন করেছেন, আমি তাদের তুমি করে সম্বোধন করেছি। আমি তাদের কমেন্টের উত্তর দেইনি। প্রয়োজন বোধ করিনি। কারণটা খুব ছেলেবেলায় একটা কবিতায় পড়ে শিখেছি একটা নীতি। সবকিছু সবাইকে শোভা পায় না।

আজ আবার একটা রোগী পেলাম, আগের দিন বিকেল থেকে তার ডেলিভেরীর প্রাণপণ চেষ্টা করেছে বাড়ীতে। আমাদের কাছে ক্লিনিকে নিয়ে এসেছে দুপুরে। এসেই প্রথম কথা,সিজার করে দাও। রোগী চাইলেও তো আর সাথে সাথে তা করে দেয়া যায় না। বাচ্চা মিড ভ্যাজাইনাতে আটকে আছে। বাচ্চার মাথা ফুলে ঢোল (ক্যাপুট)। ব্লাডার ফুল। রোগী তারস্বরে চিৎকার করছে। এই চিৎকারের ধ্বনি আমরা চিনি। অবস্ট্রাকটেড কেস।

প্রথমেই বাচ্চা বেঁচে আছে কি না দেখে নিলাম। হ্যাঁ, বেঁচে আছে তখনও। তাড়াতাড়ি সিজারের আয়োজন। এরই ফাঁকে আমি ওটিতে ঢোকার আগেই এক সিস্টার আর এক খালা রোগীর ক্যাথেটার করতে গিয়ে অল্পবিদ্যার ফলাফল ঘোষণা করেছে, রোগীর নরমাল ডেলিভারি হয়ে যাবে। মাথা হাতে পাওয়া যাচ্ছে। ব্যস, আবারও কিছু বিলম্ব। কাউন্সেলিং। অতঃপর এক মরণাপন্ন বাচ্চা বের করলাম পানিশূন্য, হাগু ভর্তি জরায়ু থেকে। বাচ্চার মাথার অর্ধেকটাই প্রায় লম্বা হয়ে ফুলে গেছে জননপথে লম্বা সময় আটকে থেকে । বাচ্চা শরীরে যেন কোন শক্তি নেই, বেচারা কাঁদতেও পারছেনা ঠিকমতো। আর ওর কিশোরী মা ওর ক্ষীণ কন্ঠের আওয়াজ পাওয়ার পর থেকেই বায়না ধরেছে,'আমাকে আগে বাচ্চা দেখান'।

উল্লেখিত দুটো ঘটনা কিন্তু পুরোপুরি দুটো বিপরীত চিত্র। একটিতে সবকিছু নরমাল ডেলিভেরীর ফেভারে থাকলেও শুধুমাত্র রোগীর সহনশীলতার অভাবে সিজার হয়েছে। অন্যটিতে অতিরিক্ত সহনশীলতা দেখাতে গিয়ে রোগীর এবং বাচ্চার জীবন সংকটে পড়েছে।

এখন প্রশ্ন আসে, রোগী সহনশীলতা দেখাবে কতদূর পর্যন্ত? উত্তর সহজ, যতোদূর পর্যন্ত তার গাইনোকলজিস্ট তাকে এলাউ করবেন৷ কারণ, নরমাল ডেলিভারি নামে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও এটা মনিটর করা একান্ত আবশ্যক। নতুবা এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া মুহূর্তেই তার অস্বাভাবিক রূপ প্রদর্শন করতে দ্বিধা করেনা একটুও। কাজেই একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের মনিটরিং ব্যতীত শুধুমাত্র সহনশীলতা প্রদর্শন করলে বিপদ আসন্ন। আবার একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের অধীনে থেকেও ধৈর্য্য ধরতে না পারলেও কাঙ্খিত ফল পাওয়া সম্ভব না। সুতরাং, গর্ভধারণ করার পূর্ব থেকে শুরু করে প্রসবের পরেও ছয় সপ্তাহ সময় পর্যন্ত একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের অধীনে থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ: আমার দেখা একটি বিভৎস ঘটনা

শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ: আমার দেখা একটি বিভৎস ঘটনা

শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ কাজ করাকে পেডোফেলিয়া বলে। আর যাদের এই আকর্ষণ…

মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় ইরানের এগিয়ে চলার গল্প 

মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় ইরানের এগিয়ে চলার গল্প 

যতদিন যাচ্ছে ইরানের মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় যুক্ত হচ্ছে অভূতপূর্ব সব অবিষ্কার। বিশ্ব…

বিদেশে চিকিৎসা: শোনা কথায় কান দিবেন না

বিদেশে চিকিৎসা: শোনা কথায় কান দিবেন না

যখন গাইনী আউটডোরে চাকরি করি তখন এক জুনিয়র এসে বলল "আপু তোমরা abnormal…

সাইমন্ড্স ডিজিজ রোগ ও তার প্রতিকার

সাইমন্ড্স ডিজিজ রোগ ও তার প্রতিকার

আমাদের মাথার ভেতরে পিটুইটারি গ্রন্থির অবস্থান। পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নানা রকম হরমোন…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর