ঢাকা      মঙ্গলবার ১৭, সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ২, আশ্বিন, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. কাওসার উদ্দিন

সহকারী সার্জন

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।


বাংলাদেশী রোগীদের ভারতপ্রীতির নেপথ্য ও আমাদের ব্যর্থতা

'দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ট ভারতের বিখ্যাত ডা. লাল প্যাথ ল্যাব এখন বাংলাদেশে।' এফএম রেডিওতে খেলার ধারাভাষ্য শুনছি তার মাঝে এই এড! এসব শুনে এখন আর অবাক হই না। অনেক আগে থেকেই এপোলো বাংলাদেশে, যেখানের অনেক ডাক্তারই ইন্ডিয়ান। মাঝেমাঝে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখি, অমুক ইন্ডিয়ান বিশেষজ্ঞ আসছেন তমুক প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে বা হসপিটালে, সেবা দিবেন রোগীদের। প্রচার প্রচারণা চলে ফুল দমে, এতে নাকি বাড়ে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রসারও।

আমার বাসা খুলনায়, সেখানে পুরোদমে সার্ভিস দিচ্ছে ইন্ডিয়ান ফর্টিস হাসপাতাল, এদেশের প্রতিষ্টানের সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চারে। অতি সম্প্রতি চালু হয়েছে খুলনা থেকে কলকাতা এম্বুলেন্স সার্ভিসও, উদ্বোধন করেছেন আমাদের প্রিয় নেতা। কিছুদিন পূর্বে আন্তর্জাতিক মানের নতুন হাসপাতালে চালু হয়েছে দেবী শেঠির নারায়না হার্ট সেন্টার, সরাসরি পরিচালিত হবে তাদের দ্বারাই।

এই তো ক'দিন আগেই বাংলাদেশের সরকারী হাসপাতালে ভারতীয় কয়েকজন ডাক্তারের অল্প কিছুদিন রোগী দেখার একটি বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ পায়। আমার খুব কাছ থেকেই প্রতিদিন সকালে দুটো বাস ছেড়ে যায় যশোরের বেনাপোলের উদ্দেশ্যে, যার সিংহভাগ যাত্রী যায় ডাক্তার দেখাতে, যায় বাংলাদেশের অনেক জায়গা থেকে। খুলনায় ইন্ডিয়ান এম্বেসির বিশেষ শাখা আছে, আছে স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার শাখাও। প্রতিদিন কত শত মানুষ চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ইন্ডিয়া যেতে সেখানে লাইন দেয় তা দেখে ভিমড়ি খেতে হয়। আমাদের পেপার পত্রিকায় তাদের চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোর বিজ্ঞাপন চলে দেদারসে। আমাদের প্রশাসনও বরাবর তাদের ব্যাপারে নমনীয়।

প্রায়শই মোবাইলে মেসেজ আসে, থাকে ওপারে চিকিৎসা নিতে যাবার নিমন্ত্রণ। তাদের সাথে আমাদের যাতায়াত ব্যাবস্থা এখন বেশ চমৎকার, সড়ক, রেল, বিমান, নৌ, সব পথেই সেখানে যাওয়া যায়। তাই যাদেরই একটু সামর্থ্য আছে, কিছু হলেই তারা ছুটছেন ওপারে। চিকিৎসা সেখানে যাই পাক, আস্থা ও বিশ্বাসের স্থানে ভারতীয় ডাক্তারদের অবস্থান আমাদের চেয়ে বেশ উপরে। ওদের মেরুদন্ডও অনেক সোজা শক্ত, ক'দিন আগেই দেখেছি আমরা। এই যে ওদের এত প্রসার তার জন্য আমরা হিংসা করতেই পারি। ওদের এই আশাতীত সাফল্যের পিছনে ওদের চেষ্টা যত না বেশি, তার চেয়ে বেশি দায়ী আমাদের ব্যর্থতা।

বাংলাদেশী রোগী পেলে ওরা তার পাসপোর্ট দেখে আর ভারতীয় রোগীর চেয়ে খরচ কম রাখে! বাংলাদেশী রোগীদের সময় দেয় বেশি, তাদের কথা শোনে বেশি, কথা বলে বেশি, অনেকের সাথে মেহমানের মতই আপ্যায়ন করে। চিকিৎসা ওরা যাই দিক, করুক যত ভুল চিকিৎসা, আর আমরা যতই ওদের চেয়ে সুপার স্পেশাল হই না কেন, ওরা আমাদের রোগীদের মন জয় করেছে ওদের ব্যবহার দ্বারা। ওরা রিসার্চ করলে রিসার্চ করার মতই করে, আমাদের অনেকের মত রাতারাতি খ্যাতি পাবার জন্য না, বড় মানুষদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে পোস্ট পজিশনের জন্য না, ওষুধ কোম্পানি ডায়াগনস্টিক কোম্পানির লাভের জন্য করে না, আর করলেও সেটা খুব কম। ওরা যা করে তা দেশের জন্য, আর আমরা যা করি তার অধিকাংশই নিজের জন্য। আর একারণেই ওদের প্রতিষ্টানগুলো আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখে, আমাদের মেধা গুলো বাইরে যেয়ে বিকশিত হলেও, ওদের মেধাগুলো বিকশিত হয় ওদের দেশে থেকেই।

গাইনির এক ম্যাম একবার এক গল্প করেছিলেন, কলকাতার এয়ারপোর্ট থেকে মারুতী গাড়িতে করে হোটেলে যাচ্ছিলেন, ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলেন 'তোমাদের এমপি মন্ত্রীরাও এই সব গাড়িতে চলে!'

ড্রাইভার উত্তর দিয়েছিলো, 'আমরা অনেক বেশি দেশপ্রেমিক, নিজেরা নিজেদের বানানো গাড়িতে চড়ি!' তারা কতটা দেশপ্রেমিক, দেশের নামকে উজ্জ্বল করতে তাদের কর্মকান্ড কত বেশি সেসবের ফিরিস্তি যদি দেয়া শুরু করি তবে তা লিখে শেষ করা যাবে না। যতই বলি, ওদের অনেকে তো এখনো খোলা জায়গায় মলত্যাগ করে, তাতে ওদের কিছু যায় আসে না, ওদের যা অর্জন এবং জ্ঞান বিজ্ঞানে ওদের যা অবস্থান তা থেকে আমরা যোজন যোজন দূরে। তাই তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের দেশে রাজত্ব করে, আর আমরা প্রজার মত ওদের বিনোদন, ওদের বাহনই ব্যাবহার করি, ওদের পণ্য আমাদের বাজারে বেশ উঁচু দামেই গণ্য!

মাহথির মোহাম্মাদ বলেছিলেন, 'কেন যাবো সিঙ্গাপুর, আমাদের দেশেই অমন প্রতিষ্ঠান তৈরি করো!' আমরা স্বপ্ন দেখি মালয়শিয়া সিঙ্গাপুর হবো, কিন্তু যে দেশে ডাক্তারের গায়ে বারবার হাত ওঠে, কিন্তু বিচার হয় না, প্রকাশ্য খুনের বিচার হয়না সেখানে সিঙ্গাপুর হওয়াটা এখনো ঢের দেরী!

আসলে ভাল কিছু করতে গেলে ডেডিকেশন লাগে, সুদূর প্রসারী চিন্তা ভাবনা লাগে, শুধু ভালভাবে পাশ করার চিন্তা আর নকল বাদ দিয়ে সৃষ্টিশীল শিক্ষা ব্যবস্থা লাগে, শৃঙ্খলায় পূর্ণ আর্থ সামাজিক অবস্থা লাগে, লাগে যথোপযুক্ত আইন ও প্রশাসনের ব্যাবহার, সর্বোপরি লাগে দেশপ্রেমিক মানসিকতা।

এ দেশে নাকি সমর্থকের চেয়ে নেতা বেশি। বিভিন্ন জায়গায় ডাক্তার যে মার খায়, কার হাতে জানেন, সাধারণ মানুষের হাতে যতটা না, তার চেয়ে বেশি নেতাদের হাতে! নেতারা ক্ষমতায় সর্বেসর্বা হলেও, চিন্তায় বড়ই গরীব। তারা ভাবে কিছু হলে ওপার উপর সব পারে তারা দেখাতে পারবে, তাই কোন ইস্যু পেলে ইচ্ছেমত দু’হাত দেখিয়ে দেয় গরীবের ডাক্তারগুলোকে। সব মিলিয়ে ফলাফল যা, এদেশে অনেক বেশি মেডিকেল কলেজ, ডাক্তারও যথেষ্ট, কিন্তু কেমন যেন অস্থির অশান্ত হতাশাজনক পরিবেশ। কেউ চায় দেশ ছেড়ে যেতে, ডাক্তারি পড়েও কেউ যায় অন্য পেশায়, কেউ আবার সকাল বিকাল আফসোস করে কোন কুক্ষণে যে মেডিকেলে ভর্তি হয়েছিলাম।

কি কারণ এর পিছনে, যদি লেখা শুরু করি তা বেশ বড় হবে। অল্প কিছু বলি, মান যাই থাকুক, টাকা থাকলেই মেডিকেল কলেজ বানানোর অনুমোদন পাওয়া যায়, সহজে নাকি পাশও করা যায়, কারণ পাশ না করালে নাকি পরের বছর ছাত্র পাওয়া যায় না, তাদের অনেকের মতে 'আগে পাশ করুক, পড়ে শিখে নিবে!' যেখানে নিয়মিত সমহারে ডাক্তার নিয়োগ প্রয়োজন, সেখানে এ বছর একশ তো, পরের বছর এক হাজার, নিয়োগের বৈষম্য ব্যাপক, সুযোগ সুবিধার বৈষম্য আর নাই বা বলি।

নিয়োগের এই বৈষম্যের ফলে কিছু ডাক্তার কষ্ট করে বেশি, আর কেউ কেউ মান যাই থাকুক সহজে প্রবেশ করে যায় সেবাদানে, এদের অনেকেই নষ্ট করে সেবার মান। আছে মানহীন সেবাদনকারী বানানোর প্রতিষ্ঠান, তারা কতটুকু কি চিকিৎসা দিবে সেসবের নাই সুনির্দিষ্ঠ নীতিমালা, নাই কার্যকর রেফারাল সিস্টেম, তাই এ দেশে শিক্ষক সাংবাদিক, ওজা কবিরাজ সবাই ডাক্তার। সিস্টেমের এসব গলদ নিয়ে যুগযুগ ধরে কতজন কত কথাই না বলেছে, কিন্তু সমাধান কি হয়েছে আজও!

আমাদের নীতি নির্ধারক আবার আমরা না। বনেদী প্রশাসক শ্রেণী যখন যা ভাল বোঝে তাই চাপিয়ে দেয়, আর আমাদের অনেক সিনিয়রবৃন্দ নিজ মসনদ টিকিয়ে রাখতে জি হুজুর বলে সেটাই মেনে নেয়। আর এ কারণে এদেশে প্রচার পায় 'ডাক্তার নাকি থাকে না গেরামে', ওদিকে জুনিয়র গুলো থাকে ব্যারামে, উপরের পোস্টের সিনিয়ররা শুধু থাকেন আরামে.

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ডাক্তাররা রোগের চিকিৎসা করে, মৃত্যুর নয়

ডাক্তাররা রোগের চিকিৎসা করে, মৃত্যুর নয়

: ব্যাটসম্যানদের ভুলে আজ খেলাটা চলে গেল! : ভুল বলছেন কেন? বল…

এক্সাম ফোবিয়া ও ডিপ্রেশন: মুক্তির সহজ সমাধান

এক্সাম ফোবিয়া ও ডিপ্রেশন: মুক্তির সহজ সমাধান

প্রশ্ন: স্যার আমি মেডিকেলের ৩য় বর্ষের ছাত্রী। মেডিকেলে ইতিমধ্যেই ১ বছর লস…

সন্তানের থ্যালাসেমিয়ার জন্য পিতা-মাতার অজ্ঞতাই দায়ী!

সন্তানের থ্যালাসেমিয়ার জন্য পিতা-মাতার অজ্ঞতাই দায়ী!

সিএমসি, ভেলোরে আমি যে রুমে বসে রোগী দেখছি সেখানে ইন্ডিয়ার অন্যান্য রাজ্যের…













জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর