ঢাকা      সোমবার ২২, জুলাই ২০১৯ - ৭, শ্রাবণ, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. মাহজাবীন ইসলাম

স্পেশাল্টি ট্রেইনি রেজিস্ট্রার, নিউরোলজি
শেফিল্ড টিচিং হসপিটাল, যুক্তরাজ্য। 


‘বিলাতের প্রফেসররা মুগ্ধ হলেও রোগীদের ধন্যবাদ পান না দেশের চিকিৎসকরা’

শুক্রবার সকাল। যুক্তরাজ্যে শেফিল্ড টিচিং হসপিটালে রেজিস্ট্রার হিসাবে আমাকে সারা সপ্তাহের রোগী প্রেসেন্ট করতে হয়। শেষ করলাম, রাউন্ড শেষ হলো। আমার কনসালটেন্ট, নিউরোমাসকুলার ডিজিজ স্পেশালিস্ট জানতে চাইলেন আমি বাংলাদেশ থেকে কিনা। জানালাম, আমি বাংলাদেশি। বললেন, আই এম ডিলাইটেড টু শেয়ার মাই এক্সপেরিয়েন্স ইন বাংলাদেশ। এরপর যা বললেন, সেটার সারমর্ম এরকম–বাংলাদেশের নিনস (National Institute of Neuroscience-NINS) এবং আমার বর্তমান হাসপাতাল—শেফিল্ড টিচিং হসপিটাল মোটর নিউরোন ডিজিজ বিষয়ে গবেষণাধর্মী প্রজেক্ট করছে। তিনি ২ সপ্তাহ ঢাকাতে ছিলেন, নিনসের সার্ভিস লেভেল দেখে মুগ্ধ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোগীদের সঙ্গে চিকিৎসকরা যে আন্তরিকতার সঙ্গে কথা বলেন, সেবা প্রদান করেন—সেই প্রশংসাই করলেন বারবার। আমাদের ডাক্তারদের নিউরোলজিতে যোগ্যতা আর মেধা— দুটো নিয়েই তিনি ভীষণ আশাবাদী। 

বিদেশি বিশেষজ্ঞদের মুখে দেশের চিকিৎসকদের নিয়ে এ ধরনের অসাধারণ কিছু কথায় গর্বে মনটা ভরে গেলো। আলাপের এক পর্যায়ে তিনি জানতে চাইলেন, দ্বীন মোহাম্মদ স্যার কে চিনি কিনা, মৃদু স্বরে বললাম, “হি ইজ দ্য রিজন ওয়াই আই এম ইনটু নিউরোলজি টুডে, দ্যাট ওয়ান ডে আই উইশ টু বি এজ ক্যারিজম্যাটিক এজ হিম' ... (খুশি খুশি ইমো)। 

এতগুলো কথা বলার কিছু কারণ আছে, সেই সঙ্গে আছে কষ্টও। আমাদের ডাক্তারদের পরিশ্রম সুদূর বিলাতের প্রফেসরদের মনে দাগ কাটে, অথচ যাদের জন্য এত পরিশ্রম, সেই সাধারণ মানুষদের একটা হাসি, একটু ধন্যবাদ তাদের ভাগ্যে জোটে না। 

আমরা পারি কোনো রোগী মারা গেলে বা ডাক্তার ‘বেশি’ টাকা নিলে সেটা নিয়ে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখতে, অথচ ঢাকা মেডিকেলে কত লক্ষ টাকার চিকিত্সা দশ টাকার বেড ভাড়ায় সম্পন্ন হচ্ছে, তা নিয়ে দু-কলম ও লিখি না। সাধারণ মানুষ মনে করে, আমরা জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পড়ে ডাক্তার হয়েছি, এটা তাদের প্রাপ্য। অবশ্যই হয়ত প্রাপ্য, কিন্তু আমাদেরও যাবার বেলায় আপনার হাসিমুখের একটা ধন্যবাদ প্রাপ্য, অকথ্য গালাগাল আর মার নয়।

আমাদের ডাক্তাররা যারা উন্নত দেশে কাজ করছেন, তাদের অধিকাংশই খুব সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন। কেন বিদেশে এসে আমরা কসাই থেকে আবার ডাক্তার হয়ে যাই? কারণ একটাই— সম্মান। বিদেশে রোগীরা চিকিৎসকদের যে সম্মানটা দেয়, আমরা সেটা হারাতে চাই না। এবং অবশ্যই, আমাদের চার বছর ধরে বিনা বেতনে কাজ করার গ্লানিটাও নিতে হয় না। দাবি আর সরবরাহে সমন্বয় না করে নিরবচ্ছিন্ন সেবা চাওয়ার বিষয়টি কতটা যুক্তিযুক্ত, তাও ভেবে দেখার সময় এসেছে।

আমার ছোটবেলা কেটেছে লিবিয়াতে। বাবা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করতেন আরো অনেক দেশের প্রোফেশনালদের সঙ্গে। বাবার একটা কথা শুনে শুনে বড় হয়েছি, “মা জাতি হিসেবে আমরা খুব মেধাবী।” বড় হয়ে আমার মনে হয়েছে, আমরা আসলেই জাতি হিসেবে অসম্ভব মেধাবী।  অভাব যদি থেকে থাকে সেটা হলো ভালো মানসিকতার।

আমাদের দেশের ডাক্তারদের প্রশংসা শুনে অভ্যাস নেই। আমার যে দুজন ব্রিটিশ প্রফেসর বাংলাদেশের ডাক্তারদের প্রশংসা করলেন, তাদের ২০-২৫ বছরের অভিজ্ঞতা। তাদের এই ফিডব্যাকটা খুব মূল্যবান। আমার লেখাটা নিউরো সাইন্সের ডাক্তারদের কাছে এই প্রশংসাটা পৌঁছে দেবার জন্য। সঙ্গে বাকি সবার জন্য যারা নিরবে-নিভৃতে কাজ করে দেশের ধ্বংসোন্মুখ স্বাস্থ্য ব্যবস্থাটাকে ধরে রেখেছেন।

আশাবাদী মানুষ আমি—সুদিনের অপেক্ষায়। 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে

হাসপাতালের সকলে মিলে সমাজকে অনেক কিছুই দিতে পারে। সাধারণত যে মানুষ যেভাবে…

ভুতের হাসপাতাল!

ভুতের হাসপাতাল!

হুট করেই ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেল। পড়ার টেবলে অন্যমনস্ক আমি যেই না সামনে…

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সিটি কর্পোরেশন সমীপে কিছু কথা

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সিটি কর্পোরেশন সমীপে কিছু কথা

বেশ কিছুদিন ধরেই ডেঙ্গু জ্বরের ভাইরাসবাহী এডিস মশার প্রকোপ বেড়েছে। রাজধানীতে এর…

স্বাস্থ্য বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘হোয়াটস আপ ডক’ ৫০তম পর্বে

স্বাস্থ্য বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘হোয়াটস আপ ডক’ ৫০তম পর্বে

ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় ‘চিকিৎসা সংক্রান্ত’ অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আমরা সবাই অবগত। কিন্তু যদি বলা…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর