ঢাকা      শনিবার ২১, সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ৫, আশ্বিন, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. ছাবিকুন নাহার

মেডিকেল অফিসার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল


রক্ত দান না জীবন দান?

তখন ফিফথ ইয়ারে পড়ি। মেডিসিনে হুমায়ুন স্যারের ইউনিটে প্লেসমেন্ট। স্যার শান্ত, সৌম্য, প্রশান্তির এক অসাধারণ কম্বিনেশন। যখন স্যার পড়াতেন, আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো স্যারকে ফলো করতাম। সব রোগীর জন্যই স্যারের মমতা ছিল দেখার মতো। কোন একদিন এক শীর্ণকায় দরিদ্র রোগীকে দেখিয়ে বললেন, এর রক্ত লাগবে। তোমরা কে ম্যানেজ করতে পারবে?

মেডিসিন ক্লাব করতাম। ব্লাড যোগাড় করতে পারব শুনে স্যার খুব খুশি হলেন। স্যার কিছু ওষুধ দিলেন, যা উনার কাছে স্যাম্পল হিসাবে ছিল, মেডিসিন ক্লাব থেকে এক্সচেঞ্জ করে ওই রোগীকে দেয়ার জন্য।

এখানে প্রাসঙ্গিক ভাবে একটা কথা বলে রাখি, মেডিসিন ক্লাব রোগীদের বিনামূল্যে রক্ত দেয়, ওষুধ এক্সচেঞ্জ করে। এই অধম মেডিসিন ক্লাবের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলাম। প্রায় প্রতিটা মেডিকেল কলেজেই এর কার্যক্রম আছে। এটা সম্পূর্ণ মেডিকেল স্টুডেন্টদের স্বেচ্ছা শ্রমে পরিচালিত হয়।

ওই রোগীর কী হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই স্যার বললেন, matted tubercular lymhadenopathy (মারাত্মক যক্ষ্ম রোগ) খুব খারাপ অবস্থা। হয়তো কয়েকটা দিন বাঁচবে...।

স্যারের কন্ঠে সেই হাড্ডিসার রোগীটার জন্য কেমন যেন একটা হাহাকার ঝরে পড়ল।

- হবু ডাক্তারের স্বভাব সুলভ বিহবলতায় স্যারকে বললাম, যে মরে যাবে তার জন্য এগুলো করে কী হবে স্যার?

- স্যার আমার কথায় একটুও রাগ না হয়ে স্নেহ মাখা কন্ঠে বললেন, হয়তো বেশিদিন নাই, তবে যে ক’টা দিন বাঁচে। দেখছ তো কত গরীব! রক্ত, ওষুধ কিছুই কেনার ক্ষমতা নাই। এগুলো পেয়ে যদি শেষ ক’টা দিন ভালো থাকে...।

এই হচ্ছেন আমাদের হুমায়ুন স্যার। আমার প্রিয় শিক্ষক, আমাদের প্রিয় শিক্ষক। জীবনে অনেককে, অনেক সময় রক্ত দিয়েছি। সেগুলো তেমন মনে নেই, তবে ওই রোগীর কথা এখনো মনে আছে।

দুই.

ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। এনাটমির ডেমো ক্লাস চলছে। এক সিনিয়র হাজির।

- নাহার ও পজিটিভ নাহ্?

- হুম ভাইয়া।

- তাড়াতাড়ি আসো, ইমার্জেন্সী রক্ত লাগবে, রোগী ওটিতে, প্রচুর ব্লিডিং হচ্ছে...।

ভাইয়া আরো কী কী যেনো বলছেন। আমি সেসব শুনছি না। আমি কেবলই রোগীর মুখটা আঁকার চেষ্টা করছি। একটা রক্তশূন্য সাদাটে নির্জীব মুখ। তির তির করে কাঁপা ঠোঁট... আস্তে আস্তে করে... লালচে আভা ছড়িয়ে পড়ছে... রক্তের আভা... আমার রক্ত... একটু একটু করে খুলে যাচ্ছে বন্ধ চোখের পাতা... ঘোলাটে চোখে বেঁচে ফেরার চাপা ঔজ্বল্য।

আমি কেমন যেনো ঘোরের মধ্যে পড়ে গেলাম। প্রথম বার রক্ত দেয়ার ভয়, বিহ্বলতা, সব সেই রোগীর অবয়বে যেয়ে মিশে গিয়েছিল যেনো। মানুষ হয়ে জন্মাবার জন্য কৃতজ্ঞতা তখনি প্রথম জানিয়েছিলাম স্রষ্টাকে।

তিন.

ইন্টার্নের সময়। এক ইয়ারমেটের বোনের সিজারের এ্যাসিস্ট করেছি। হঠাৎ রক্তের প্রয়োজন হলো। রক্ত আনতে সময় লাগবে। নিজেই ওটির পাশের রেস্ট রুমে শুয়ে পড়লাম। রক্ত ড্র করলেন আমাদেরই আরেকজন। এমন কত বার! কতশত ডাক্তার একই কাজ করেন। মূলত ইন্টার্নের সময় তো অহরহ।

এই গল্পগুলো করতে চাই না। অহংকার প্রকাশ পায় বলে। কেউ যদি কিছু মনে করে? কিন্তু আজ কেন যেনো মনে হলো আপনাদের সাথে শেয়ার করি। যদি কেউ এতে উদ্বুদ্ধ হয়। রক্ত দিতে এগিয়ে আসে।

আসুন কিছু রক্তদান সম্পর্কিত তথ্য জেনে নেই-

কে রক্ত দিতে পারবে?
# একজন সুস্থ্য সবল মানুষ যার বয়স ১৫-৬০ বছর।

কত দিন পর পর?
# প্রতি তিন মাস পর পর।

রক্ত দিলে কোন সমস্যা হয়?
# না। বরং একজন মানুষের জন্য কিছু করতে পারার আনন্দে মন ভরে থাকে।

কোন সাইড ইফেক্ট আছে কি?
# না, তবে কারো কারো একটু ঝিমঝিম, হাল্কা মাথা ঘোরার মতো হতে পারে। কিছুক্ষণ বালিশ ছাড়া পায়ের দিকটা উঁচু করে শুলে, এক/দুই গ্লাস পানি বা পানীয় খেলে ঠিক হয়ে যায়।

রক্ত দিলে শরীরের রক্ত কমে যায়?
# না। এই রক্ত প্রতিনিয়ত তৈরি হয় এবং ভেঙে যায়। কাজেই আপনি রক্ত না দিলেও এটা ন্যাচারালি নষ্ট হয়ে যাবে।

ভাবুন তো আপনার রক্তে ধ্বনিত হচ্ছে অন্যের হৃৎপিন্ড। ব্যাপারটা কেমন, নাহ্? আমার তো মনেহয়, কী অদ্ভূত! কী অদ্ভূত! তাই বলছিলাম কী, রক্ত সঞ্চয় করুন। ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। এই সঞ্চয় আপনি রক্তদানের মাধ্যমে করতে পারেন। প্রতিটা সেন্টারেই রক্তদাতাকে ডোনার কার্ড দেয়। যেটা দেখিয়ে নিজের ও প্রিয়জনের প্রয়োজনে রক্ত যোগাড় করা যায়। অনেকে হয়তো অনেক কিছুই দান করেন। নিঃসন্দেহে রক্তদান অন্যান্য যে কোন দানের চেয়ে শ্রেয়

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

সন্তানের থ্যালাসেমিয়ার জন্য পিতা-মাতার অজ্ঞতাই দায়ী!

সন্তানের থ্যালাসেমিয়ার জন্য পিতা-মাতার অজ্ঞতাই দায়ী!

সিএমসি, ভেলোরে আমি যে রুমে বসে রোগী দেখছি সেখানে ইন্ডিয়ার অন্যান্য রাজ্যের…

এক্সাম ফোবিয়া ও ডিপ্রেশন: মুক্তির সহজ সমাধান

এক্সাম ফোবিয়া ও ডিপ্রেশন: মুক্তির সহজ সমাধান

প্রশ্ন: স্যার আমি মেডিকেলের ৩য় বর্ষের ছাত্রী। মেডিকেলে ইতিমধ্যেই ১ বছর লস…

আধুনিক মায়েরা সিজার ছাড়া বাচ্চা প্রসবের চিন্তাই করেন না

আধুনিক মায়েরা সিজার ছাড়া বাচ্চা প্রসবের চিন্তাই করেন না

সমাজে কিছু মানসিকভাবে অসুস্থ ডাক্তার বিদ্বেষী মানুষ আছে। অসুখ হলে ইনিয়ে বিনিয়ে…

আনিসের প্রত্যাবর্তন 

আনিসের প্রত্যাবর্তন 

রাস্তায় একজনের মুখে সরাসরি সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে দিলো আনিস। আচমকা এ আচরণে…

কনজেনিটাল হার্ট ডিজিজ: গল্পে গল্পে শিখি

কনজেনিটাল হার্ট ডিজিজ: গল্পে গল্পে শিখি

স্রষ্টার সৃষ্টি বড় অদ্ভুত, মেডিকেল সায়েন্স পড়লে এটা ভাল বুঝা যায়। মাছের…

বদ লোকের গল্প!

বদ লোকের গল্প!

উপজেলায় নতুন তখন। সবাইকে ঠিকঠাক চিনিও না। হঠাৎ একদিন আমার রুমে পেট…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর