ঢাকা      মঙ্গলবার ১৮, জুন ২০১৯ - ৫, আষাঢ়, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. গুলজার হোসেন উজ্জল

হেমাটোলজি বিশেষজ্ঞ।


রক্ত পরিসঞ্চালনের ইতিহাস

রক্ত নিয়ে মানুষের কৌতুহল বহুদিনের। এক কালে মানুষ ভাবতো রক্ত, পিত্ত, কফ –এই তিনের সমন্বয়ে মানবদেহ। এর ভারসাম্যে ব্যতিক্রম হলেই শরীর ও মনে বিকার হয়। গ্রীক পন্ডিত হিপোক্রেটিস এই ধারণার প্রবর্তক। বিশ্বাস করতো আয়ুর্বেদ, রোমান বা ইসলামিক স্কলাররাও। বাইবেলে আছে… The life in the flesh is in the blood…. (Leviticus 17:11.)

১৫৪২ সালে পোপ অষ্টম ইনোসেন্ট এক কান্ড করে বসলেন। পোপ মহাশয় তার ঝুলে যাওয়া চামড়া, দুর্বল পেশী আর চেহারার হারানো জৌলুস নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগছিলেন। তিনি এসবের জন্য দায়ী করলেন তার শরীরের পুরনো রক্তকে। ভাবলেন হয়ত জোয়ান শরীরের রক্ত তার শরীরে ঢুকাতে পারলেই ফিরে পাওয়া যাবে তার হারানো জওয়ানী। তাই তিন তরুণকে বেছে নেওয়া হলো। হয়ত তাদের স্বর্গের লোভ দেখানো হয়েছিল। তাদের শরীর থেকে রক্ত বের করে ঢুকানো হলো পোপের শরীরে। হতভাগ্য তিন তরুণসহ মারা গেলেন পোপ। পোপের আর জওয়ানী ফিরে পাওয়া হলো না। সেই তরুনদের ভাগ্যে স্বর্গ জুটেছিল কিনা জানার উপায় নেই।

বলা যায়, এটাই ছিল রক্ত পরিসঞ্চালণের প্রথম বড়সড় প্রয়াস। বলা বাহুল্য ব্যর্থপ্রয়াস।

১৬৬৭ সালে ফরাসী বিজ্ঞানী জাঁ ব্যাপটিস্ট মানুষের শরীরে ভেড়ার রক্ত সঞ্চালণ করলেন। অতঃপর মানুষটি মারা গেল। ফেসে গেলেন জাঁ ব্যাপটিস্ট। খুনের দায়ে অভিযুক্ত হলেন। এরপর অনেকবছর থেমে ছিল রক্ত পরিসঞ্চালনের প্রচেষ্টা। সেধে খুনের অপবাদ কে নিতে চায়?

১৮১৮ সালে জেমস ব্লান্ডেল নামে এক ব্রিটিশ ডাক্তার তাঁর নিজের তৈরী ট্রান্সফিউশন সেট দিয়ে এক প্রসব পরবর্তী রক্তক্ষরণের রোগীর শরীরে রক্ত পরিসঞ্চালন করলেন। রক্ত দিলেন রোগীর স্বামী। রোগীটি বেঁচে গেল । সেই উৎসাহে জেমস সাহেব আরো কয়েকজন রোগীকে একই ভাবে রক্ত দিলেন। কিন্তু এদের অনেকেই মারা গেল। মানুষের কাছে রক্ত পরিসঞ্চালনের আসল রহস্যটি তখনো পরিষ্কার হয়নি।

১৯০১ সাল। কার্ল ল্যান্ডস্টেইনার নামের বনী ইসরায়েল বংশের এক আদম সন্তান মানবজাতির জন্য বয়ে আনলেন এক বিরাট আশীর্বাদ। তিনি জানালেন রক্তের প্রধান তিনটি গ্রুপের কথা। এ, বি,ও গ্রুপ। এই তিন গ্রুপে মিলমিশ হয়না। গ্রুপ মিলিয়ে রক্ত দিলে তবেই পরিসঞ্চালন নিরাপদ হবে। এই ছিল তাঁর আবিষ্কার। ১৯৩০ সালে এই মহান বিজ্ঞানী নোবেল পেলেন।

১৯৪০ সালে তিনি মানব জাতিকে এগিয়ে দিলেন আরেক ধাপ। বললেন রক্তের নেগেটিভ পজিটিভের কথা। এর নাম আর এইচ সিস্টেম।

আজ যখন কোন মূমূর্ষু রোগীকে রক্ত দেই শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে যাই সেই মানুষটির প্রতি। এই ইহুদী সন্তানের কল্যানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ময়দানে বেঁচে গিয়েছিল হিটলারের অনেক সৈন্য। আজো বেঁচে যায় সিরিয়ার কোন নিরীহ মুসলমান, আইএস জঙ্গী, সনাতনী পুরোহিত, রোহিঙ্গা বা আরাকানী বৌদ্ধ।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

উত্তীর্ণ ৮৩৬০ চিকিৎসক থাকতে নতুন বিসিএস কেন?

উত্তীর্ণ ৮৩৬০ চিকিৎসক থাকতে নতুন বিসিএস কেন?

স্বাস্থ্য খাতের দুরবস্থা নিরসনে বর্তমান স্বাস্থ্যবান্ধব সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এরই ধারাবাহিকতায়…

মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ও তার চিকিৎসা

মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ও তার চিকিৎসা

কেউ যদি বলে, 'আমি পাগল!' তাহলে সেটা neurosis. আর যদি বলে, 'আমি…

যে কারণে চিকিৎসায় রিস্ক নিতে চান না ডাক্তাররা

যে কারণে চিকিৎসায় রিস্ক নিতে চান না ডাক্তাররা

পত্রিকার কাটতি/টিআরপি বাড়ানোর জন্য সাংবাদিকদের বহুল জনপ্রিয় টার্ম/অস্ত্র হল "ভুল চিকিৎসায় রোগীর…

‘বিলাতের প্রফেসররা মুগ্ধ হলেও রোগীদের ধন্যবাদ পান না দেশের চিকিৎসকরা’

‘বিলাতের প্রফেসররা মুগ্ধ হলেও রোগীদের ধন্যবাদ পান না দেশের চিকিৎসকরা’

শুক্রবার সকাল। যুক্তরাজ্যে শেফিল্ড টিচিং হসপিটালে রেজিস্ট্রার হিসাবে আমাকে সারা সপ্তাহের রোগী…

রক্ত দান না জীবন দান?

রক্ত দান না জীবন দান?

তখন ফিফথ ইয়ারে পড়ি। মেডিসিনে হুমায়ুন স্যারের ইউনিটে প্লেসমেন্ট। স্যার শান্ত, সৌম্য,…

রক্ত দানের ইতিহাস ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা 

রক্ত দানের ইতিহাস ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা 

সারা পৃথিবীতে অসংখ্য মানুষ রক্ত দান করে অন্যের জীবন বাঁচায়। সেই ১৮১৮…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর