ঢাকা      সোমবার ২৩, সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ৭, আশ্বিন, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. মুহাম্মাদ সাঈদ এনাম ওয়ালিদ

চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট, জনস্বাস্থ্য গবেষক।


বুদ্ধিমান থেকে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী জাতিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা!

ইউরোপিয়ান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের সেমিনারে যোগ দিতে গিয়েছিলাম ইউরোপ। আমার প্রেসেন্টেশন ছিলো। পাঁচদিনব্যাপী সায়েন্টিফিক সেমিনারে ইউরোপসহ বিশ্বের কয়েক হাজার সাইকিয়াট্রিস্ট ছিলেন। গল্পগুজব, আড্ডা কথা-বার্তার এক পর্যায়ে তারা অনেকেই বললেন, "যতদূর দেখেছি, যে ক'জনার সঙ্গে মিশেছি, আমাদের কাছে মনে হয়েছে বাংলাদেশিরা জেনেটিক্যালি মেধাবী, বন্ধুবৎসল"। ভেবেছিলাম, নেহায়েত আমাকে খুশি করার জন্যেই এমনটি বলা হয়েছে।

এক মাস পর ফের গেলাম ক্যালিফোর্নিয়াতে আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের সেমিনারে। সেখানে বিশাল আয়োজন, ইউরোপিয়ান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ে তিনগুণ বেশি সাইকিয়াট্রিস্ট এর সম্মিলন। সেখানেও আমি আমার সাবজেক্ট এর স্পিকার প্রেসেন্টার। 

অবসরে গল্প আড্ডার এক পর্যায়ে তারাও একই কথা বললেন। বাংলাদেশি যে কয়েকজনের সঙ্গে তাদের মেশার সুযোগ হয়েছে, যাদেরকে খুব কাছ থেকে তারা দেখেছেন মিশেছেন, তাদেরকে তুলনামূলক মেধাবী, বুদ্ধিমান মনে হয়েছে, এবং সেটাও তাদের মতে জেনেটিক্যালি।

বিষয়টি এবার একটু আমালে নিলাম। এনিয়ে একটু গভীর আলাপের দিকে গেলাম তাদের সঙ্গে। "হোয়াই অ্যান্ড হাও"। 

কনক্লুশনটা দাঁড়ালো বাংলাদেশিদের ফুড হেভিট। রান্নার স্টাইল। 

আমাকে কাছে পেয়ে উৎসুক হয়ে তারা বাংলাদেশিদের খাবার প্রক্রিয়াজাত করণের ব্যাপারটা আরো কিছু জেনে নিলেন। আমি বললাম, “আমরা সাধারণত মা বা স্ত্রীর হাতের রান্না খাই আজীবন। তারা অত্যন্ত যত্ন সহকারে খাবার গুলো তৈরি করেন এবং টেবিলে পাড়েন। ধোয়া-মুছা থেকে শুরু করে ডায়নিং টেবিল পর্যন্ত থাকে তাদের ভালোবাসা আর মমতার ছোঁয়া। রেস্ট্রুরেন্ট আমরা তেমন একটা খাই না। অফিসে গেলে বাসা থেকেই টিফিন নিয়ে যাই।” 

আমাদের বেশির ভাগ অফিসিওদের মা, স্ত্রী কিংবা বোন হাউজ ওয়াইফ। তাদের সময় কাটে পরিবারের সুস্বাস্থ্যের কথা ভেবে ভেবে। অনেক মায়েরা বা স্ত্রীরা আছেন যারা নিজে বাজারে গিয়ে পরিবারের জন্যে ভালো কিছু একটা কিনে আনেন। এমন মমত্ববোধ বিরল।

আমার কথা তাদের অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকলো। এসব শুনে অনেকের চোখের কোনে জলে চিক চিক করলো। আমাদের মতো পরিবার প্রথা ইউরোপ আমেরিকান কালচারে নেই। একেবারে নেই বললে ভুল হবে কিছু সম্ভ্রান্ত পরিবারে এখনো আছে। 

অফিসিওদের বেশির ভাগ হোটেল রেস্তোরাঁয় খান আর রাতে বাসায় গিয়ে নিজে ইলেক্ট্রনিক মেশিনে ঝটপট পাকিয়ে নেন। কোনোমতে খাবারটা সেরে নেন। আমাদের মতো সবাইকে নিয়ে ডায়নিং টেবিলে বসে আয়েশ করে খাওয়া তাদের স্বভাবে নেই। এমন কি স্বামী-স্ত্রী ও এডাল্ট বাচ্চা-কাচ্চা রেস্তোরাঁর গেলেও সবাই নিজ নিজ মতো অর্ডার দেয়, নিজ নিজ বিল দেন।

এক আমারিকান কলিগ একটা গল্প পাড়লো। রেস্টুরেন্টে বাবা, মা আর ছেলে গেছেন পিজা খেতে। একই টেবিলে বসা তিনজন। পিজা ওর্ডার হলো দুটো। মা-বাবা দুজনে আয়েশ করে খেয়ে উঠলেন। ছেলে খেলো না, এদিক ওদিক তাকিয়ে র’লো। মা একবার জিজ্ঞেস করছিলো, 'ইউ...?' ছেলে বললো, 'নো মাম…ইটস ওকে'। 

আমি গল্পটা বুঝলাম না। বললাম বিষয়টা কি? আমেরিকান সহকর্মী বললেন, "সাঈদ, এখানে রেস্ট্রুরেন্টে যে যার সাধ্যমতো ওর্ডার দেয়, খায় যে যার বিল দেয়। হোস্টিং বা শেয়ারিং সিস্টেম নাই, ছোট বেলা থেকেই নাই। ছেলে এডাল্ট, সুতরাং তার সাধ্যমতো ওর্ডার সে করবে, তার বিল সে দেবে। সেদিন ছেলের কাছে পয়সা ছিলো না তাই সে ওর্ডার করেনি। হোক না সাথে মা-বাবা। সো হোয়াট"।

আমি বললাম, “মা-বাবা বিষয়টা বুঝেছে..? ছেলের পয়সা নেই তাই খাচ্ছে না?”। তিনি বললেন, “হ্যা। কিন্তু কিছুই করার নেই। সিস্টেমটাই ওরকম। উল্টোটাও হয়। ছেলের পয়সা আছে খাবে, মা বাবার কাছে নেই, খাবে না। বসে থাকবে। ইটস নরমাল হিয়ার...।”

যাহোক যে কথায় ছিলাম বাংলাদেশিরা বুদ্ধিমান কেনো এ নিয়ে, এবং এটা এ অঞ্চলের ফুড হেভিটের জন্যে এসব আলোচনা।  

বাংলাদেশিরা মাছ খায় বেশি। নোনা ও মিঠা সব পানির মাছ পাওয়াও যায় বেশি। তাজা মাছ, সবজি, গাছের ফল। মাছের তেলের পুষ্টিগুণ ব্রেইনের গঠনের জন্যে খুবই ভালো। 

তবে আমাদের ভবিষ্যৎ খুব একটা ভালো না৷ ইদানিং যেভাবে ব্যবসায়ীরা মাছ, মাংস, ফল-মূল, তৈল, সবজিতে ভেজাল ও বিষাক্ত ক্যামিকেল দিচ্ছে তাতে আগামী পঞ্চাশ বা একশো বছরে এদেশের ঘরে ঘরে দুইটা বা তিনটা বাচ্চা প্রতিবন্ধী হয়ে জন্ম নেবে। বুদ্ধিমান জাতি থেকে পরিণত হবে সুবিশাল বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী এক জাতি। 

ভেজাল ব্যবসায়ী সমাজের এসব কুলাঙ্গারদের লাগাম এখনই টেনে ধরা উচিত। এদেরকে কঠিন শাস্তির আওতায় (ফায়ারিং স্কোয়াড) আনা উচিত, তা সে যত শীর্ষ পর্যায়ের ব্যবসায়ী হোক। এসব কুলাঙ্গাররা একটা জাতিকে সুকৌশলে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

সন্তানের থ্যালাসেমিয়ার জন্য পিতা-মাতার অজ্ঞতাই দায়ী!

সন্তানের থ্যালাসেমিয়ার জন্য পিতা-মাতার অজ্ঞতাই দায়ী!

সিএমসি, ভেলোরে আমি যে রুমে বসে রোগী দেখছি সেখানে ইন্ডিয়ার অন্যান্য রাজ্যের…

আধুনিক মায়েরা সিজার ছাড়া বাচ্চা প্রসবের চিন্তাই করেন না

আধুনিক মায়েরা সিজার ছাড়া বাচ্চা প্রসবের চিন্তাই করেন না

সমাজে কিছু মানসিকভাবে অসুস্থ ডাক্তার বিদ্বেষী মানুষ আছে। অসুখ হলে ইনিয়ে বিনিয়ে…

আনিসের প্রত্যাবর্তন 

আনিসের প্রত্যাবর্তন 

রাস্তায় একজনের মুখে সরাসরি সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে দিলো আনিস। আচমকা এ আচরণে…

কনজেনিটাল হার্ট ডিজিজ: গল্পে গল্পে শিখি

কনজেনিটাল হার্ট ডিজিজ: গল্পে গল্পে শিখি

স্রষ্টার সৃষ্টি বড় অদ্ভুত, মেডিকেল সায়েন্স পড়লে এটা ভাল বুঝা যায়। মাছের…

বদ লোকের গল্প!

বদ লোকের গল্প!

উপজেলায় নতুন তখন। সবাইকে ঠিকঠাক চিনিও না। হঠাৎ একদিন আমার রুমে পেট…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস