ঢাকা      সোমবার ২৩, সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ৭, আশ্বিন, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. কাওসার উদ্দিন

সহকারী সার্জন

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।


হার্টে সমস্যা, মনে সাহস রাখুন

বুকে ব্যাথা। শ্বাস কষ্ট। ব্যাথার চেয়ে শ্বাস কষ্টটাই বেশি। মনে হচ্ছে শ্বাস বন্ধ হয়ে এই বুঝি মারা যাবে। বাতাসের জন্য হাহাকার। এপাশ ওপাশ করছে। কিন্তু কোনপাশেই শান্তি নেই। বিপি ১৬০/১১০। ধুরুম ধারুম হার্টবিট হচ্ছে। পালস ১২০। এডেড সাউন্ড আছে। কিন্তু এই সাদাসিধে স্টেথো সেটা ঠিক ধরতে পারলো না। তবে লাংসের তলানীতে অল্প বিস্তর পটপট শব্দ শোনা যায়। আগে থেকে শ্বাস কাশ নাই। কিন্তু এখন শ্বাস নেয়ার সাথে বুকের খাঁচা ভীতরে ডেবে যাচ্ছে।

অক্সিজেন দেয়া হল। ঠোট দেখে বোঝা যায় পরিপক্ক ধূমপায়ী। জিজ্ঞেস করতেই সেটার উত্তর পাওয়া গেল। বুকটাকে মনে হল সিলিন্ডারের মত গোল। COPD থাকার সম্ভাবনা প্রবল। কিন্তু শুধু এটাই তার ডায়াগনোসিস না। হাইপারটেনশনের রোগী। ওষুধ খায় নিয়মিত। ভাষ্যমতে গ্যাস্ট্রিকের ব্যাথা। ওষুধ খেয়েছে সেটার। কিন্তু কাজ হচ্ছে না মোটেও। চোখের সামনে MI ভাসে। নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

রাত ১.৩০। ল্যাব খোলা নাই একটাও। ইমার্জেন্সিতে ইসিজি নাই। অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে ফারুক খান হাজির। তিনি ফার্মেসী ম্যান। মানুষ ভাল। কিন্তু ওষুধের নাম পড়তে একটু কষ্ট হয়! অন টু থ্রি, ট্রিটমেন্ট স্টার্ট। একটা এন্টি আলসারেন্ট আর ল্যাসিক্স আনতে বলা হল ফার্স্ট। মুখেই বলে দেয়া হল। সেটাই তিনি ভাল বোঝেন। তাকে বললাম, 'ইসিজি করা দরকার, লোক ডাকেন।' খান সাহেব ল্যাবের লোককে ফোন দিলেন। বুদ্ধি করে দ্রুত তাকে আসতে বললেন। টেকনিশিনিয়ান থাকে এই কাছাকাছি। ফারুক খানের এই গুণগুলো বেশ। অধিকাংশ রাত তিনি দোকানেই থাকেন। রাত্রি যতই গভীর হোক তাকে পাওয়া যায় সদা। প্রয়োজন মাফিক এম্বুলেন্সের ব্যবস্থাও সহজে করে দিতে পারেন।

এদিকে পেশেন্ট রেস্টলেস। ঘামাচ্ছে প্রচন্ড। এই ঘটনায় সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র রোগীর বউ। বয়স হবে চল্লিশের কাছাকাছি। মানসিকভাবে এমন শক্ত মহিলা আমি কমই দেখেছি। সাথে দুটো ছেলে। তাদের ম্যানেজ করছেন। কিছুক্ষণ পরপর স্বামীর কপাল মুছে দিচ্ছেন। আমার কথা মনযোগ দিয়ে শুনছেন।

বললাম- 'ওনাকে হেলান দিয়ে রাখেন, শ্বাসে আরাম হবে।' নিজে দাঁড়িয়ে বসে থাকা স্বামীর মাথাটাকে বুকের উপর নিয়ে রাখলেন। এরমধ্যেই ইসিজি করানোর ব্যবস্থা হলো। Myocardial ischaemia এর ক্লিনকাট সাইন, সাথে Left ventricular hypertrophy। Infarction হওয়ার ঝুঁকি অনেক। 'হার্টে বেশ সমস্যা আছে, বড় মেডিকেলে নেয়া জরুরী, প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছি, মনে সাহস রাখুন।'

প্রাথমিক কাউন্সেলিং শেষ। MI এর প্রাথমিক চিকিৎসাপত্রের স্লিপ লিখে খান সাহেবকে দিলাম। তিনি একসাথে চারটা ট্যাবলেট আর স্প্রেটাই শুধু খুঁজে আনতে পারলেন। এগুলোই আপাতত দেয়া হল। রোগীর স্ত্রী বেশ স্থির। ভাবছেন কি করবেন, কি হবে। কিন্তু কোন ভেঙে পড়া নেই। অন্য অনেকের মত হাউমাউ করে হা হুতাশ নেই। আলোচনা করলেন, ডিসিশন নিলেন নিজেই- 'হ্যাঁ, মেডিকেলেই নিবো।' যদিও অনেকে নেয় না। যদি না পারে, হাতে যা আছে তা দিয়ে আমার অর্ডার লেখাও শেষ। আজ না পারুক, কাল হয়তো নিবে। যেহেতু ঝুঁকি আছে, সেহেতু সাইনটাও নিয়ে নিলাম।

কিছুক্ষণ ভাবলেন আবার, 'না, নিয়েই যাবো।' স্রষ্টাকে ধন্যবাদ দিলাম, আল্লাহ ভরসা, আশা করি এ যাত্রায় বেঁচে যাবে, চেষ্টা তো করেছি, এখন শুধু দোয়া করি। নিতান্তই গরীব মানুষ, পরিবারে আয়ের একমাত্র সম্বল। 'চিকিৎসা শুরুর আগে, কাপড়ের দিকে তাকাও' নীতি কথা। নীতি রক্ষা করে যা কিছু করার তার সবটাই হল।

রাত ২.৩০। যাত্রা শুরু হল, বিদায়কালে, 'স্যার, আমি বোধহয় বাঁচবো না?' কি বলেন এসব, ভয়ের কিছু নেই, চিকিৎসা তো দিয়েছিই, বুকে বল রাখেন, রক্ষা করবেন আল্লাহ...।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

হার্ট ফেইলিউর: পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা

হার্ট ফেইলিউর: পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা

কেরামত মোল্লা সারারাত সোজা হয়ে বসে কাটিয়ে দেন। ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখ, ঘুমাতে…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস