ঢাকা শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ৩ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৪ ঘন্টা আগে
০৩ জুন, ২০১৯ ১১:১৮

অদূর ভবিষ্যতে কোনো রোগী বিদেশ যাবে না

অদূর ভবিষ্যতে কোনো রোগী বিদেশ যাবে না

আপোষহীন সততা, নিরলস পরিশ্রম আর কাজের প্রতি ভালোবাসাই অধ্যাপক ডা. বদরুল আলমের আজকের এ প্রোজ্জ্বল অবস্থানের মূল চাবিকাঠি। গাইবান্ধার এ কৃতী সন্তান বর্তমানে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি দেশবরেণ্য এ নিউরোলজিস্ট মুখোমুখি হয়েছিলেন মেডিভয়েসের। পাঠকদের জন্য রইলো তার সাক্ষাৎকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

মেডিভয়েস ডেস্ক: কোন প্রেক্ষাপটে নিউরোসায়েন্স হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল?
অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম: বাংলাদেশে প্রায় ১৬ কোটি লোকের বসবাস। এর মধ্যে বিরাট সংখ্যক রোগী নিউরোলজি ও নিউরোসার্জারি রোগে আক্রান্ত। আমাদের গড় আয়ু বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিউরোলজিক্যাল ডিজঅর্ডারের রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। যেমন: স্ট্রোক, পারকিনসন, ডিমেনসিয়া—এগুলো হচ্ছে বেশি বয়সের রোগ। এছাড়া আমাদের দেশে প্রতিদিনই অনেক মানুষ দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে মস্তিষ্ক ও স্পাইনাল কর্ডে আঘাত পাচ্ছেন। তারাও নিউরো রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, ব্রেইন টিউমারের শতভাগ রোগী আগে বিদেশে গিয়ে অপারেশন করাতো। সেই পরিস্থিতিতে আমি যখন ছাত্র, তখন আমার শিক্ষক অধ্যাপক ড. কাজী দীন মোহাম্মদ স্যারকে বললাম, স্যার, এদেশে পঙ্গু হাসপাতাল আছে, কার্ডিওলজি রোগের জন্য হাসপাতাল আছে, কিডনির বিশেষ হাসপাতাল আছে, ন্যাশনাল আই ইনস্টিটিউট আছে, কিন্তু এত রোগী থাকা সত্ত্বেও নিউরো সায়েন্স ইনস্টিটিউট নেই কেন? তখন তিনি বললেন, তোমরা ছাত্রত্ব শেষ করো, তোমরা চেষ্টা করলে ভবিষ্যতে অবশ্যই দেশে একটা নিউরো সায়েন্স ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। স্যারের মেধা, অনুপ্রেরণা, দেশের প্রতি অসাধারণ প্রতিশ্রুতিশীলতা—এগুলো আমাকে এতোই মুগ্ধ করেছিল যে, আমি এমডি পাস করার পর, প্রথমে আমার যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজে পদায়ন হয় তখন থেকেই স্যারকে বলতে থাকি, স্যার আপনি তো বলতেন দেশে একটা নিউরো হাসপাতাল হলে দেশের মানুষ সেবা পেতো। তখন তিনি আমাদের বললেন, তোমরা কাজ শুরু করো, দেখ ঢাকা শহরে কোথাও জায়গা আছে কিনা? জায়গার ব্যবস্থা হলে আমরা সরকারের কাছ থেকে জমি নিবো। ২০০০ সালে এইভাবে আমাদের যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে অনেক সময় পেরিয়ে যায়। একপর্যায়ে আমরা সফল হলাম, অবশেষে জায়গা পেলাম।

আজকে যেখানে এই হাসপাতাল, সেই জায়গাটি ছিল বিরাট এক বস্তি। এই বস্তি উচ্ছেদ করার জন্য অনেক সংস্থার সঙ্গে, অনেক বস্তিবাসীর সঙ্গে আমাদের প্রাণান্তকর যুদ্ধ করতে হয়েছে। দুটি বছর লেগেছে, বস্তি উচ্ছেদ করতে। এরপর আস্তে আস্তে আমরা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করলাম। অবশেষে ২০১২ সালের অক্টোবরে আমাদের প্রধানমন্ত্রী এটির উদ্বোধন করেন।
হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার সুফল কিন্তু আমরা পেতে শুরু করেছি। সারাদেশের মানুষ এখানে সেবা পাচ্ছে। সারাদেশ থেকে ২৪ ঘণ্টা মানুষ এখানে আসছে চিকিৎসা নিতে। ইমার্জেন্সি, বহির্বিভাগ, আন্তঃবিভাগ- কোথাও তিলধারণের জায়গা নেই। এখানে প্রথমে ছিল সাড়ে তিনশো বেড। সেখানে একশো বেড বাড়িয়ে করলাম সাড়ে চারশো বেড। একটি দিনও আমাদের একটি বিছানা খালি থাকে না। শুধু তাই না, অনেক সময় ভর্তিযোগ্য রোগীকে ভর্তি করতে না পেরে অন্যত্রও স্থানান্তর করে থাকি। এসব সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রী আমাদের পার্শ্ববর্তী জায়গায় আরো পাঁচশো বেডের আরেকটি ভবনের অনুমোদন দিয়েছেন। এবং সেই প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে আমি কাজ করে যাচ্ছি।

মেডিভয়েস ডেস্ক: এখানে কি ধরণের রোগীরা সেবা পায়? বার্ষিক কতটি অপারেশন হয়?
অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম: বাংলাদেশে নিউরো রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। আর পৃথিবীতে স্ট্রোক হচ্ছে মৃত্যুর অন্যতম কারণ। যতটা ঝুঁকিতে আগে মানুষ হৃদরোগে থাকতো, কার্ডিওলজিতে ভর্তি হতো, স্ট্রোক নিয়ে এখন মানুষ ততটাই ঝুঁকিতে থাকে। এখানে স্ট্রোকের পাশাপাশি আসে ব্রেইন টিউমারের রোগী, আসে ডিমেনসিয়া ও পারকিনসন রোগী। যে কোনো ধরনের প্যারালাইসিসের রোগীও আসে। এছাড়া আসে জিবিএস, যে রোগে মানুষের নার্ভগুলো অকেজো হয়ে যায়, মেনিনজাইটিস ও এনকেফালাইটিসের রোগীরাও।

এখানে প্রতিদিন বর্হিবিভাগে নিউরোলজি বা নিউরো সার্জারি মিলিয়ে রোগী আসেন কমপক্ষে দেড় হাজার। আর জরুরি বিভাগে প্রতিদিনি কমপক্ষে একশ থেকে ১২৫ জন। সব মিলিয়ে আমাদেরকে প্রতিদিন ১৬-১৭শ’ রোগী দেখতে হয়। এর বেশিরভাগই আমরা বহির্বিভাগে চিকিৎসা দিয়ে থাকি অথবা জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দিয়ে থাকি। আর কিছু রোগী, যাদের বাহিরে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব নয়, কেবল তাদেরকে আমরা ভর্তি করে থাকি। 

মেডিভয়েস ডেস্ক: আপনাদের জনবল কত? এ জনবল দিয়ে চিকিৎসাদানে সক্ষম কিনা?
অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম: মানসম্মত এবং সঠিক সংখ্যার জনবল এখনো আমাদের এখানে আছে। প্রথমে আমাদের হাসপাতাল ছিল সাড়ে তিনশ’ বেডের। জনবলও নিয়োগ দেয়া ছিল সেই অনুপাতে। পরে একশ’ বেড বাড়িয়ে সাড়ে চারশ’ বেডের হাসপাতালে উন্নীত করেছি। এখন আগের জনবল দিয়েই হাসপাতাল পরিচালিত হচ্ছে। তবে আমার মনে হয়, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই জনবল দিয়েই এখানে সেবা দেয়া সম্ভব। এবং সেদিক থেকে সরকারের ব্যবস্থাপনায় কোনো ঘাটতি নেই বলে আমি মনে করি। 

মেডিভয়েস ডেস্ক: এখানে চিকিৎসা ব্যয় কেমন?
অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম: আপনি জানেন, এটি সরকারি হাসপাতাল। এখানে চিকিৎসা ব্যয় বলতে তেমন কিছুই নেই। কেবল সরকারের নির্ধারিত একটা সামান্য ফি আছে। যেমন: একটা সিটি স্ক্যান বাহিরে করাতে লাগে সাড়ে চার হাজার টাকা আর এখানে লাগে মাত্র দুহাজার টাকা। এরমধ্যে মুক্তিযোদ্ধা, গরিব রোগী ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিকিৎসা একদম ফ্রি। এছাড়া দুঃস্থ ও পথচারী যারা দুর্ঘটনায় পড়ে হাসপাতালে আসেন, যাদের কোনো আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ পাওয়া যায় না তাদের জন্যও ফ্রি। ভর্তি হওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে পেয়িং বেডের জন্য সপ্তাহে ২৬০ টাকা লাগে। আর এসি কেবিনের ভাড়া হচ্ছে মাত্র ৫০০ টাকা, আর ডাবল শেয়ার কেবিন মাত্র ২৫০ টাকা। অপারেশনের খরচও এখানে খুবই নগণ্য। বড় অপারেশন মাত্র দুই হাজার আর ছোট অপারেশন মাত্র ১ হাজার টাকা লাগে। যে অপারেশন বাহিরে করলে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা লাগতো, সেই অপারেশনটি এখানে করলে মাত্র দুই হাজার টাকা লাগে। এমনকি গরিব রোগীদের ফ্রিও করানো হয়। তাই সবদিক বিবেচনা করে বলা যায়, এখানে নামমাত্র মূল্যে চিকিৎসা দেয়া হয়।

মেডিভয়েস ডেস্ক: প্রায় রোগীদের অভিযোগ থাকে, আপনারা সিট দিতে পারেন না এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য জানতে চাই?
অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম: এটা সত্যি কথা। আমি স্বীকার করি, যেসব রোগী ভর্তির জন্য আসেন তাদের সবাইকে সিট দেয়া সম্ভব হয় না। একটা কথা মনে রাখতে হবে, ১৬ কোটি মানুষের দেশে মাত্র সাড়ে চারশো বেডের একটা নিউরো হাসপাতাল যথেষ্ট না। তবে যে অভিযোগ মানুষ করে থাকেন, তার কিছুটা সত্যি আবার কিছুটা সত্য নয়। আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে একটা প্রবণতা আছে, যে কোনো রোগ হলেই হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে।

অথচ আমরা যখন এ হাসপাতাল করি তখন আমরা বলেছিলাম, খুব বেশি প্রয়োজন না হলে কোনো রোগীকে ভর্তি রাখবো না। তাদেরকে আউটডোরে দেখবো, জরুরি বিভাগে দেখবো। সার্বিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাটা তাদের বাড়িতে দিয়ে দিবো, যাতে পুরো পরিবার তাদের দেখাশোনা করতে পারে। রোগীর সঙ্গে যখন দূরদূরান্ত থেকে স্বজনরা আসেন, তখন তারা আশপাশের কোনো হোটেলে থাকেন। তখন তাদের অনেক টাকা-পয়সা নষ্ট হয়। এজন্য আমরা মনে করি, যেসমস্ত রোগীদের আমরা চিকিৎসা দিয়ে বাড়িতে পাঠাতে পারবো অথবা আশপাশের হাসপাতালে থেকে যারা চিকিৎসা চালিয়ে নিতে পারবে সেসব রোগীদের ভর্তি করার দরকার নেই।

সে কারণে যেসব রোগীরা বাসায় বসে সেবা নিতে পারে তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দিই। আর বলে দিই প্রয়োজনে একমাস দুমাস পরে এসে যেন দেখিয়ে যায়। এতে অনেকে অভিযোগ করে বসেন, যে আমাকে তো ভর্তি দিল না। আসলে বিষয়টা তা নয়। আসল ব্যাপার হচ্ছে, যেসব রোগীর এখানে ভর্তি দরকার সেসব রোগীকে আমরা ভর্তি করবোই। হয়তো সিট না থাকায় আজকে পারছি না, সেক্ষেত্রে কালকে করবো, কালকে নাহলে পরশু করবো। কিন্তু যাদের চিকিৎসা বাড়িতে করা সম্ভব তাদের কেন ভর্তি করবো? এই ভর্তি না করার ফলে একটা ভুল ধারণা তৈরি হয়, আর সেটা থেকেই সিট না পাওয়ার অভিযোগ করা হয়।  

মেডিভয়েস ডেস্ক: নতুন সংযোজন হতে যাওয়া নিউরো সায়েন্সের ভবনে কি পরিমাণ রোগী সেবা পাবেন?
অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম: রোগীর সেবাদানে প্রধানমন্ত্রী নিউরো সায়েন্সকে আরো একটা ভবন প্রতিষ্ঠা করার অনুমোদন দিয়েছেন। সেটা হবে আরো পাঁচশ’ শয্যার। অর্থ্যাৎ এ নিয়ে নিউরো সায়েন্স হাসপাতালটি হবে সাড়ে নয়শো শয্যার হাসপাতাল। এখানে আরো নতুন নতুন কিছু ডিপার্টমেন্ট সংযোজন হবে, যেসব ডিপার্টমেন্ট বর্তমানে বাংলাদেশে নেই। যেমন: স্ট্রোকের রোগীদের পুনর্বাসন দরকার। কিন্তু সেরকম কোনো ব্যবস্থা আমাদের দেশে নাই। আবার ডিমেনসিয়া রোগীদের জন্যও হাসপাতালে তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। নতুন পাঁচশ’ বেডে তাদের জন্য কিছু বেড রাখবো। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ হচ্ছে, ছোট ছোট বাচ্চাদের পেডিয়াট্রিক নিউরো সার্জারি বিভাগ। আপনি দেখে থাকবেন, অনেক ছোট বাচ্চার মাথা ফুলে যায়, মাথায় পানি জমে বা মাথা মোটা হয়ে যায়। এগুলো হচ্ছে ব্রেইনের জন্মগত ত্রুটি। এই রোগীগুলোর জন্যও সারাদেশে সরকারি হাসপাতালে তেমন কোনো শয্যা নেই।

আমরা মনে করি, নতুন এই পাঁচশ’ বেড করতে পারলে তাদের জন্যও একটা ব্যবস্থা করতে পারবো। এছাড়া অত্যাধুনিক কিছু স্ট্রোক ইউনিট করবো। এতে স্ট্রোকের রোগীদের জন্য আইভি টিপিএ চিকিৎসার পরিসর আরও বৃদ্ধি পাবে। তখন স্ট্রোকের রোগীদের যদি আক্রান্ত হওয়ার ৬ ঘণ্টার মধ্যে নিউরো সায়েন্স হাসপাতালে আনা সম্ভব হয়, তাহলে এই চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীকে ভালো করে তোলা সম্ভব হবে। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় এটা হবে একটা যুগান্তকারী পরিবর্তন।

মেডিভয়েস ডেস্ক: নিউরো সার্জারির রোগীরা বেশিরভাগই বিদেশ চলে যায়, এক্ষেত্রে আপনারা কি করতে পারেন?
অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম: আমাদের মধ্যে কিন্তু বিদেশ-নির্ভরতা কমছে। বিশেষ করে ব্রেইন টিউমার, স্পাইনাল টিউমার। এসব রোগীরা আগে শতভাগ বাইরে চলে যেতো। আপনার দেখবেন, আমরা প্রতিমাসে শতাধিক ব্রেইন টিউমার ও স্পাইনাল টিউমার অপারেশন করি। এ ধরণের অপারশেন বিএসএমএমইউ ও ঢাকা মেডিকেলে করে। এর ফলে ৪০/৫০ ভাগ রোগীর বাইরে যাওয়ার প্রবণতা কমে গেছে। আমরা যদি আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে পারি, জনবল বাড়াতে পারি, মেডিকেল কলেজগুলোকে যদি উন্নত করতে পারি তাহলে অদূর ভবিষ্যতে কোনো রোগী বিদেশ যাবে না।

মেডিভয়েস ডেস্ক: নিউরো রোগী চেনার উপায় বা বেসিক কোনো লক্ষণ আছে কিনা?
অধ্যাপক ডা.বদরুল আলম: অবশ্যই আছে। এ ব্যাপারে সচেতনতা খুবই দরকার। একটা বড় লক্ষণ হচ্ছে, হঠাৎ করে একটা সাইড অবশ হয়ে যাওয়া। এছাড়া হটাৎ করে তীব্র মাথাব্যথা, হঠাৎ করে বমি, খিঁচুনি, চোখে না দেখা, হটাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া–এইগুলোই হচ্ছে মূলত নিউরো রোগের লক্ষণ। এই ধরণের সমস্যা দেখা দিলে, বুঝতে হবে তার ব্রেইনের সমস্যা, তাকে সঙ্গে সঙ্গে নিকটস্থ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। আর বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ১ বছরে হাঁটার কথা, আট মাসে বাবা-মাকে ডাকার কথা। যখন দেখা যাবে একবছরেও হাঁটছে না, বাবা-মাকে ডাকছে না, অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে মিশছে না, খেলাধূলায় অংশগ্রহণ করছে না, তখন বুঝতে হবে ব্রেইনে কোনো সমস্যা আছে। আর বয়স্কদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, অনেকে তার বাসা চিনতে পারছে না, নিজের স্বাক্ষর ভুল করছে তখন ধরে নিতে হবে তার ব্রেইনের রোগ হয়েছে।

মেডিভয়েস ডেস্ক: সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ আছে কি না?
অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম: অবশ্যই আছে। কিছু কিছু আছে অজানা। তবে যেসব কারণ আমাদের জানা, সেগুলো সবারই জানা দরকার। যেমন: যাদের ব্লাড প্রেসার বেশিদিন অনিয়ন্ত্রিত থাকে, তাদের অল্প বয়সে স্ট্রোক হতে পারে, আর যাদের ডায়াবেটিক আছে, যদি নিয়ন্ত্রণ না করে তাহলে তারও স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আবার যেসব মায়েরা জর্দা খান, সাদা পাতা, পান পাতা খান, সেটা ভয়ানক ক্ষতিকর এমনকি ধূমপানের চেয়েও ক্ষতিকর। এছাড়া ইয়াবা, হিরোইন, মদপান বা যে কোনো ধরণের নেশা করলে স্ট্রোক করার ঝুঁকি থাকে।

মেডিভয়েস ডেস্ক: এটা প্রতিরোধ নিরাময় যোগ্য কিনা?
অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম: উপরে যে কারণগুলো বললাম, সেগুলো যদি নিয়ন্ত্রণ করা যায়, নেশাদ্রব্য যদি পরিহার করা যায়, নিয়মিত যদি ব্যায়াম করা যায়, তাহলে প্রতিরোধ করা সম্ভব। বিভিন্ন ধরণের শাকসবজি, কলিজা অনেক ধরণের প্রাণীর মধ্যে প্রোটিন পেয়ে থাকি। এগুলো যদি কেউ ঠিকমতো জানেন, তাহলে তার এসব সমস্যা ভালো হয়ে যাবে। নিউরোলজির অনেক রোগ নিরাময়যোগ্য। এই ধরুন মৃগী রোগ। এই রোগের কত যে সর্বাধুনিক চিকিৎসা আছে, এটা আমাদের দেশের অনেক মানুষই জানে না। অনেকে মনে করেন, এটা মনে হয় বায়ু দূষণের কারণে হয়, তারা এটার জন্য ওঝা-কবিরাজের কাছে যায়। অথচ এটা আসলে ব্রেইনের রোগ। অনেক মৃগী রোগীর ব্রেইনের ভেতরে টিউমার থাকে। সেক্ষেত্রে টিউমার অপারেশন করলে দেখা যায়, মৃগী রোগী ভালো হয়ে যায়। অনেক বাচ্চার মাথার রক্তনালীতে জন্মগত সমস্যা থাকে, সেটাও অপারেশন করলে ভালো হয়ে যায়।

মেডিভয়েস ডেস্ক: দেশে একটিমাত্র নিউরো ইনস্টিটিউট, সারাদেশের রোগীদের সামলাতে আপনারা কতটা সক্ষম?
অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম: দেশে ইনস্টিটিউট একটা। এটা সত্যি, কিন্তু সারাদেশে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এই বিভাগ আছে, বিশেষ করে পুরনো মেডিকেল কলেজগুলোতে এই বিভাগ আছে। সেখানে চিকিৎসা নিতে পারেন। এখন ইচ্ছা করলাম আর দশটা নিউরো সায়েন্স ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করে ফেললাম, এমনটা সম্ভব না। তবে হ্যা, যে ধরণের উন্নয়ন হচ্ছে সে হিসেবে ভবিষ্যতে দেশের বিভাগগুলোতে একটা করে নিউরো সায়েন্সের শাখা হতে পারে। আমি মনে করি, এই মুহূর্তে নিউরো সায়েন্সে যে ধরণের জনবল ও সার্ভিস আছে, তা যথেষ্ট। প্রয়োজনে তারা বিভিন্ন মেডিকেলে যাবে, জেলা পর্যায়ে যাবে, গিয়ে সেবা দিবে। তাই আমি মনে করি, সার্বিকভাবে এই মুহূর্তে নিউরো সায়েন্স সার্বিক সেবাদানে সক্ষম। 

মেডিভয়েস ডেস্ক: তরুণ চিকিৎসকদের নিউরো সায়েন্সে উচ্চশিক্ষার বিষয়ে আপনার পরামর্শ?
অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম: যারা সবেমাত্র এমবিবিএস পাস করেছে তাদের জন্য নিউরো সায়েন্সে একটা অপার সম্ভবনা। এজন্য বলবো, নিউরো সায়েন্সের যত শাখা আছে সারা পৃথিবীব্যাপী তার অর্ধেকও আমরা ওপেন করতে পারিনি। হার্ট না কেটে যেমন স্টেন্টিং করা যায়, নিউরোলজিতেও তেমনি করা যায়। এটাকে বলে ইন্টারভেনশনাল নিউরোলজি। এ বিষয়ে অপার সম্ভবনা আছে। এ বিষয়টি তরুণ চিকিৎসকদেরও জানতে হবে। এ বিষয়ে তরুণ চিকিৎসকরা কাজ করলে নিজের পেশার পাশাপাশি দেশের মানুষের ও অনেক উপকার হবে। পারকিনসন রোগের জন্য বাংলাদেশে একজনও সার্জন নেই, যিনি ডিবিএস সার্জারি করেন। এটা একটা নিউরোলজির জন্য অপার সম্ভাবনা। এই দ্বারগুলো উন্মোচন করার জন্য আমি তরুণ ডাক্তারকে আহ্বান জানাই।

মেডিভয়েস ডেস্ক: দুদক বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের অনুপস্থিতির বিষয়টি দেখছে, এটাকে কিভাবে দেখছেন?
অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম: দুদক একটা সাংবিধানিক সংস্থা। সুতরাং দুদকের কাজ দুদকই করবে। দুদক কেন যে কোনো সংস্থাই দেখতে পারে। যেহেতু এটা একটা সরকারি সংস্থা। ডাক্তারের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষ ও মিডিয়ার মধ্যে একটা ভুল বোঝাবুঝি আছে। মনে করেন আমি হাসপাতালে গিয়ে দশজনের মধ্যে পাঁচজনকে পেলাম আর পাঁচজন পেলাম না বা একশো জনের মধ্যে ৫০ জন পেলাম আর ৫০ জন পেলাম না। এটা কিন্তু হাসপাতালের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ঘটনা। কারণ হাসপাতাল তিনটি শিফটে চলে। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা, আবার দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা, আবার রাত ৮টা থেকে পরের দিন সকাল ৮টা পর্যন্ত। এই তিনটা শিফটে কিন্তু ডাক্তার নার্স, কর্মকর্তা, কর্মচারী ভাগ করা আছে। তাই কোনো প্রতিষ্ঠানে গিয়ে যদি বলে শতভাগ পেলাম না, তাহলে ভুল হবে। তাই তাদের আগে জানা উচিত হাসপাতাল সিস্টেমটা কিভাবে চলে। আমি মনে করি ডাক্তারদের উপস্থিতি আগের চেয়ে অনেকাংশে বেড়েছে। তাই ঢালাওভাবে চিকিৎসক অনুপস্থিতির যে অভিযোগ করা হয় তা সর্বাংশে সত্য নয়।

মেডিভয়েস ডেস্ক: ডাক্তার হওয়ার পেছনে কার প্রেরণা?
অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম: স্কুল লাইফ থেকে একটা স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হবো। কিন্তু একজন নিউরোলজিস্ট হবো, এ জিনিসটা এমবিবিএস পাস করার পর চিন্তা করেছি। ডাক্তার হওয়ার পর উপজেলা পর্যায়ে দেখলাম, নিউরো রোগীগুলোর চিকিৎসা আমরা ঠিকমতো দিতে পারছি না, কারণ উপজেলা পর্যায়ে এমন কোনো চিকিৎসক নেই যিনি নিউরোলজি রোগীকে ঠিকমতো চিকিৎসা দিবেন। উপজেলায় গিয়ে আমার উপলব্ধি হলো, এই সাবজেক্টে আমাদের লোক দরকার। কারণ উপজেলা পর্যায়ে মোটামুটি সব ধরণের চিকিৎসক আছেন। কিন্তু নিউরো বিশেষজ্ঞ নেই। আমার সেই অনুভূতি থেকে নিউরোলজিতে আসা। আর পরবর্তীতে প্রফেসর কাজী দীন মুহাম্মদ আমার অনুপ্রেরণা।

মেডিভয়েস ডেস্ক: আপনার শিক্ষা জীবন ও কর্মজীবন কোথা থেকে শুরু করেছেন?
অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম: গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা উপজেলায় একটা অজপাড়া গাঁয়ে আমি প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি করি। হাইস্কুলটা ছিলো আমার বাড়ি থেকে পাঁচ মাইল দূরে। উপজেলা পর্যায়ে একটাই ভালো স্কুল ছিলো। প্রতিদিন পায়ে হেঁটে পাঁচমাইল পথ অতিক্রম করে স্কুলে যেতাম। আর ইন্টারমিডিয়েট করেছি কারমাইকেল কলেজ থেকে। আর এমবিবিএস করি রংপুর মেডিকেল কলেজে। আর এমডি করেছি সাবেক পিজি এখনকার বিএসএমএমইউতে। এরপর আমার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ এফআরসিপি ও এমএসিপি ডিগ্রি পেয়েছি।
আর ১৯৮৪ সালে পাবনার বেড়া উপজেলায় মেডিকেল অফিসার হিসেবে প্রথম কর্মজীবন শুরু করি। আমি পাঁচ বছর সেখানে কাজ করেছি।

মেডিভয়েস ডেস্ক: যেসব রোগী সেবা নিতে আসেন তাদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?
অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম: এটা একটি সরকারি হাসপাতাল। এখানে মানুষের সেবা পাওয়ার অধিকার আছে। আমাদের দায়িত্ব হলো, পরিপূর্ণ সেবা প্রদান করা। কিন্তু প্রয়োজনের চেয়ে বেশি আশা করা উচিত নয়। আমাদের বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে। সব রোগী এখানে চিকিৎসা নিয়ে ভালো হবে এমনটা না। এখানে এমন কিছু রোগী আসে শেষ পর্যায়ে, যাদের জন্য আমাদের করার কিছুই থাকে না। একসময় রোগী মৃত্যুবরণ করে। কিন্তু তার আত্মীয়-স্বজন এই মৃত্যুকে মেনে নিতে চান না। এই বাস্তব উপলব্ধিগুলো মানুষের মাঝে জাগ্রত হলে আমরা আমাদের কাজ সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে পারবো।

মেডিভয়েস ডেস্ক: স্যার, এই ইনস্টিটিউটের সার্বিক কার্যক্রম কিভাবে পরিচালনা করছেন?
অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম: পুরো কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আমাদের এডমিনিস্ট্রেটিভ বিভাগ আছে। এটা পাঁচজনের সমন্বয়ে গঠিত। তারা সার্বিক কার্যক্রম দেখাশোনা করে। প্রতিমাসে আমরা হেড অব ডিপার্টমেন্টদের নিয়ে বৈঠক করি। যেসব জটিল রোগী ভর্তি হয়, তাদের নিয়ে সপ্তাহে দুদিন মেডিকেল বোর্ড হয়ে থাকে। এখানে রোগীরা যে সেবা পেয়ে থাকে, তা পৃথিবীর যেকোনো উন্নত দেশের তুলনায় কম না। এখানে প্রত্যেক অধ্যাপককে রোটেশন অনুযায়ী আউটডোরে রোগী দেখতে হয়। এই সিস্টেমটা প্রতিটা হাসপাতালে চালু করলে রোগীরা আউটডোর থেকে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি যেতে পারবে।

মেডিভয়েস ডেস্ক: মেডিভয়েস সম্পর্কে আপনার মতামত?
অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম: শুনেছি মেডিভয়েস তরুণ চিকিৎসকের পেশা ও চিকিৎসাখাতের সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করে থাকে। আমি মনে করি, এ ধরণের উদ্যোগ প্রশংসাযোগ্য। ইতোমধ্যে মেডিভয়েস যে কাজগুলো করেছে আমার কাছে ভালো লেগেছে।

মেডিভয়েস: আপনাকে ধন্যবাদ। 
অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম: আপনাদেরও। 

(সাক্ষাৎকারটি মেডিভয়েসের মে ২০১৯ প্রিন্ট সংখ্যায় প্রকাশিত)

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত