ঢাকা      মঙ্গলবার ১৮, জুন ২০১৯ - ৫, আষাঢ়, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. কাজী শামসুল আরেফীন

মেডিকেল অফিসার (৩৩ তম বিসিএস), 
সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।


হাসপাতাল ইমার্জেন্সিতে কিছু লোকের অতি চালাকীয় কর্মকাণ্ড

সময় আনুমানিক রাত ৯:৩০। ২০১৯ সালের ১ লা জুন। ইমার্জেন্সি, সরাইল হাসপাতাল। ডিউটি রুমে বসে আছি। খুব টায়ার্ড লাগছিল। বলতে গেলে ঝিমাচ্ছিলাম। এমএলএসএস এসে বলল, স্যার একটা খারাপ রোগী আসছে। আমি বললাম, কি সমস্যা। বলল যে, মহিলা রোগী.. খারাপ মনে হচ্ছে। ইমার্জেন্সি রুমের ভিতর রোগীটা একটা বেডে শুয়ে ছিল। ব্লাড প্রেসার নাই। কোন পালস নাই। চোখের মনি ফিক্সড এবং বড় হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ জীবনের কোন সাইন সিম্পটম ছিল না।

রোগীর সাথে রোগীর স্বামী শ্বাশুড়ি এবং আরো দু’একজনকে দেখলাম। বললাম কি হয়েছিল। রোগীর স্বামী বলল- আমি বাইরে ছিলাম। কোন সাড়া শব্দ না দেখে দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলে স্ত্রীকে বিছানায় শায়িত অবস্থায় পেলাম। তারপর ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে আসলাম।

তারা বলছে, মনে হয় স্ট্রোক করেছে। সাধারণত মাত্র ২৫ বছর বয়সে মহিলা পেশেন্ট স্ট্রোক খুব কম হয়।

যাই হোক খাতায় এন্ট্রি করার আগ মুহূর্তে আবার রি-চেক করছিলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম গলার সামনের অংশের দু পাশেই ligature mark। সাধারণত কেউ যদি আত্নহত্যা করে সেক্ষেত্রে ligature mark prominently একপাশে থাকে। মহিলাটির ক্ষেত্রে দু পাশেই ছিল। আর কেউ যদি আত্নহত্যা করে তাহলে অবশ্যই ভিতর থেকে দরজা বন্ধ থাকার কথা। তারা বলছিল দরজাটা চাপানো ছিল। আর মহিলাটি বিছানায় শুয়ে ছিল। কেউ আত্নহত্যা করলে সাধারণত লাশ ঝুলে থাকার কথা। উনাদের কথাবার্তায় চরম অসঙ্গতি লক্ষ করে সরাইল থানার ওসিকে ফোন দিয়ে ফোর্স পাঠাতে বলি।

ফোর্স আসার আগ মুহূর্তেই আরেকটা এক্সিডেন্টের রোগী আসে যার বা পায়ের দুটি হাড়ই ভেঙে যায়। আমি তখন ওই রোগী ম্যানেজ করতে থাকি। আর উনাদের বলি কেউ যেন বাইরে না যায়।

পুলিশ খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে ইমার্জেন্সিতে চলে আসে। তারাও পরীক্ষা নিরীক্ষা করে এটা homicidal case হিসাবে শনাক্ত করে। এবং খুব সম্ভবত মেয়েটির গলায় দড়ি দিয়ে পেঁচিয়ে মারা হয়। ইতোমধ্যে কোন ফাঁকে যেন মেয়েটির জামাইকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। কোথায় যেন সে গায়েব হয়ে যায়। এরই মধ্যে আরো প্রায় তিনটা রোগী আসে ফুড পয়জনিংয়ের। প্রত্যেকটাই ভর্তি দেয়ার মত পেশেন্ট। মানুষের বিশাল জটলা।

মজার বিষয় শুনবেন, তখন প্রায় ১২ টা বেজে গেছে। রোগী তখনো বিদায় হয় নাই। ভেতরে মোট ৬ টি রোগী। এক চাচা আসল তখন। বয়স ৬৫-৭০ এর মত হবে। উনি একটু পরপর তার হাত আমার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। আমি বললাম আপনার কি সমস্যা। বলল যে প্রেশার মাপতে এসেছেন। আমি বললাম রাত ১২ টার সময় আসছেন প্রেশার মাপতে। বলল যে, উনার নাকি সিরিয়াস সমস্যা। উনাকে দেখার আগে থানার লোকদের বিদায় করলাম, এক্সিডেন্টের রোগীটাকে প্লাস্টার করে বিবাড়িয়া রেফার করলাম। ফুড পয়জনিংয়ের রোগী দুইটাকে ভর্তি দিলাম। নতুন আরেকটি পেশেন্টকে দেখে বিদায় করলাম। এই সময়ের মধ্যে উনি দিব্যি আশেপাশের লোকজনের সাথে কথা বলছেন। এতগুলা মানুষের সাথে ননস্টপ কাজ করে যাচ্ছি উনি সেটাও দেখেছেন।

সবকাজ শেষ করার পর উনাকে প্রায় ৪০ মিনিট পর দেখলাম। প্রেশার দিব্যি নরমাল পেলাম। সত্যি উনার এতই সিরিয়াস সমস্যা ছিল যে এই ৪০ মিনিটে উনি একটু উহ আহ পর্যন্ত করলেন না...!!

মানুষের বিবেক বুদ্ধি দিনদিন লোপ পাচ্ছে। মানুষ সবসময় নিজের সমস্যাটাকেই বড় করে দেখে। কেন যেন অন্যের মত করে নিজেরটা ভাবে না। আরেকটা কথা ইদানিং নতুন ট্রেডিশন শুরু হয়েছে। আউটডোরে প্রচন্ড ভিড় দেখে কিছু অতি চালাক ইমার্জেন্সিতে ১৫ দিন ধরে পেট ব্যথা, ১ মাস ধরে মাথা ব্যথা, ৩ মাস ধরে কোমড় ব্যথা নিয়ে হাজির হয়। এই পেশেন্টগুলাকে না দেখে বিদায় করে দিয়ে আউটডোরে দেখাতে বললে কারো কারো বিবেক উথলিয়ে পরে। এইরকম করলে আসলে ইমার্জেন্সি ডিপার্টমেন্ট খোলা রাখার ই দরকার নাই। ২৪ ঘন্টা আউটডোর খোলা রাখলেই হয়।

মনে রাখবেন- Quantity বাড়লে আপনি কখনোই Quality সেবা দিতে পারবেন না।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

উত্তীর্ণ ৮৩৬০ চিকিৎসক থাকতে নতুন বিসিএস কেন?

উত্তীর্ণ ৮৩৬০ চিকিৎসক থাকতে নতুন বিসিএস কেন?

স্বাস্থ্য খাতের দুরবস্থা নিরসনে বর্তমান স্বাস্থ্যবান্ধব সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এরই ধারাবাহিকতায়…

রক্ত পরিসঞ্চালনের ইতিহাস

রক্ত পরিসঞ্চালনের ইতিহাস

রক্ত নিয়ে মানুষের কৌতুহল বহুদিনের। এক কালে মানুষ ভাবতো রক্ত, পিত্ত, কফ…

মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ও তার চিকিৎসা

মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ও তার চিকিৎসা

কেউ যদি বলে, 'আমি পাগল!' তাহলে সেটা neurosis. আর যদি বলে, 'আমি…

যে কারণে চিকিৎসায় রিস্ক নিতে চান না ডাক্তাররা

যে কারণে চিকিৎসায় রিস্ক নিতে চান না ডাক্তাররা

পত্রিকার কাটতি/টিআরপি বাড়ানোর জন্য সাংবাদিকদের বহুল জনপ্রিয় টার্ম/অস্ত্র হল "ভুল চিকিৎসায় রোগীর…

‘বিলাতের প্রফেসররা মুগ্ধ হলেও রোগীদের ধন্যবাদ পান না দেশের চিকিৎসকরা’

‘বিলাতের প্রফেসররা মুগ্ধ হলেও রোগীদের ধন্যবাদ পান না দেশের চিকিৎসকরা’

শুক্রবার সকাল। যুক্তরাজ্যে শেফিল্ড টিচিং হসপিটালে রেজিস্ট্রার হিসাবে আমাকে সারা সপ্তাহের রোগী…

রক্ত দান না জীবন দান?

রক্ত দান না জীবন দান?

তখন ফিফথ ইয়ারে পড়ি। মেডিসিনে হুমায়ুন স্যারের ইউনিটে প্লেসমেন্ট। স্যার শান্ত, সৌম্য,…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর