ঢাকা      রবিবার ১৮, অগাস্ট ২০১৯ - ৩, ভাদ্র, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. ছাবিকুন নাহার

মেডিকেল অফিসার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল


জরায়ুমুখ ক্যান্সার: ভয়াবহতা ও বাস্তবতা

জরায়ুমুখ ক্যান্সার বিষয়ে সচেতনতার জন্য কিছুদিন আগে একটি র‌্যালি হয়েছিল, নাম ছিল ‘মায়ের জন্য পদযাত্রা’। সেই যাত্রায়ই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, এ ব্যাপারে কিছু লেখার। মূল বিষয়ে যাওয়ার আগে আসুন একটা গল্প শুনি-

আছিয়া বিবি। বয়স ৫৫ বছর। সহজ-সরল এক গ্রামীণ নারী। সাত-সাতটি সন্তানের মা। ১৩ বছর বয়সে বধূ হয়। ১৪ বছর বয়সে মা। স্বামী ট্রাকড্রাইভার। সুঠাম, প্রাণবন্ত, সহাস্যমুখ। তবে একটু এদিক-ওদিক যাবার দোষ আছে। অবশ্য এমন দোষে আছিয়া বিবি তেমন গা করে না। করেই বা কি করবে? পুরুষ মানুষের এমন একটু-আধটু দোষ মনে হয়, জায়েজ আছে। তারপরও একটা দীর্ঘশ্বাস ঠিকই বুক চিড়ে বেরিয়ে আসে। 

কিছুদিন হয়, যখন-তখন মাসিকের রাস্তা দিয়ে রক্ত যায়। সঙ্গে দুর্গন্ধযুক্ত ময়লা স্রাব। শরীরের ওজনও দিনদিন কমছে। দুর্বল লাগে। সহবাসে রক্ত যায় দেখে স্বামী ওসব বাদ দিয়েছে অনেক আগে। তয় রোজ রোজ রক্ত গেলে নামাজ-রোযায় সমস্যা দেখে ডাক্তার দেখাতে আসছে।

আহারে মা! তুমি যদি জানতে কী রোগ তোমার শরীরে বাসা বেঁধেছে? 

উপরের গল্পে ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখতে পাবো, জরায়ুর ক্যান্সারজনিত যতগুলো রিক্স ফ্যাক্টর আছে তার সবগুলোই আছিয়া বিবির আছে। কিন্তু ব্যথা নাই দেখে সে এর ভয়াবহতা বুঝতে পারছে না। ফলে অনেক দেরি হয়ে যায়, তখন আর তেমন কিছু করার থাকে না।

আসুন জরায়ু ক্যান্সারজনিত প্রাইমারি কিছু জেনে নেই।

জরায়ুমুখ ক্যান্সার কি?

নারীর জরায়ুর মুখকে সার্ভিক্স বলে। এখানের ক্যান্সারকে সার্ভিক্যাল ক্যান্সার বা জরায়ুমুখের ক্যান্সার বলে। বাংলাদেশে এটা গাইনোকলোজিক্যাল ক্যান্সারজনিত মাতৃ-মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ। প্রথম কারণ ব্রেস্ট ক্যান্সার। প্রতি লাখে ২৯.৭ জনের হয়। তার মধ্যে অর্ধেকই মারা যায়।

কারা বেশি ঝু্ঁকিতে?

১. এইচপিভি নামক ভাইরাস ইনফেকশন- ৯৯%
২. কম বয়সে বিয়ে, 
৩. কম বয়সে বাচ্চা নেওয়া, ঘন ঘন বাচ্চা নেওয়া;
৪. পারসোনাল হাইজিন না মেনে চলা, 
৫. অস্বচ্ছলতা, 
৬. যৌন-বাহিত রোগ, 
৭. স্বামী, ট্রাকড্রাইভার বা শিপিং অথবা ডে লেবার, 
৮. বহুগামিতা (স্বামী/স্ত্রী উভয়ের জন্য প্রযোজ্য), 
৯. স্বামীর প্রথম স্ত্রী সার্ভিক্যাল ক্যান্সারে মারা যাওয়া।

লক্ষণ: 
১. দুর্গন্ধযুক্ত সাদা স্রাব, 
২. অনিয়মিত রক্তস্রাব, 
৩. সহবাস পরবর্তী রক্তস্রাব, 
৪. ৩৫ এবং ৫৫ বছর বয়সে বেশি হয়। 

চিকিৎসা:
প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পরলে শতভাগ চিকিৎসা সম্ভব। প্রাথমিক অবস্থা নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন স্ক্রিনিং পদ্ধতি আছে। তার মধ্যে পেপস স্মেয়ার, ভায়া অন্যতম। প্রতি তিন বছর অন্তর করতে হয়। অ্যাডভান্স অবস্থায় ডায়াগনোসিস হলে অপারেশন অথবা রেডিওথেরাপি অথবা দুটো দিয়েই চিকিৎসা করা হয়।

প্রতিরোধ:
প্রতিরোধক হিসেবে টিকা দেয়া যায়, যা দিনদিন জনপ্রিয় হচ্ছে। সাধারণত ৯-১৪ বছরের মেয়েদের দেয়া হয়। অন্যরাও দিতে পারে।
এছাড়া রিক্স ফ্যাক্টর এভোয়েড করা, জেনিটাল হাইজিন মেনটেন করা, ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা। বিশেষ করে স্বামী- স্ত্রী একে অপরের প্রতি সৎ থাকলে এই বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। 

জরায়ু যদিও ফেমিনিন অঙ্গ, তবু এর ক্যান্সারের অন্যতম কারণ যে এইচপিভি ভাইরাস তা কিন্তু ছড়ায় পুরুষদের মাধ্যমে। কাজেই এর থেকে বাঁচতে নারী-পুরুষ সবাইকেই সচেতন হতে হবে। একজন নারী কেবলমাত্র একজন নারীই নয়; সে কারো বোন, কারো প্রেয়সী, কারো স্ত্রী এবং অতি অবশ্যই কারো না কারো মা। আসুন মায়ের জীবন রক্ষায় একসঙ্গে হাঁটি। 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ঈদে ভোজন-পূর্ব যে বিষয়গুলোতে দৃষ্টি রাখবেন

ঈদে ভোজন-পূর্ব যে বিষয়গুলোতে দৃষ্টি রাখবেন

শুরুতেই ঈদ মোবারক। কোরবানী ঈদের সবচেয়ে আনন্দদায়ক, আকর্ষনীয় শেষ পর্ব- মাংস কাটা,…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর