ঢাকা শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ৪ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ২২ মিনিট আগে
ডা. মাহবুবুর রহমান

ডা. মাহবুবুর রহমান

সিনিয়র কনসালটেন্ট, ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট ও সি সি ইউ ইনচার্জ, ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল, ঢাকা।


৩১ মে, ২০১৯ ১৮:৫৭

মাতৃত্বকালীন কার্ডিওমায়োপ্যাথি: রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা

মাতৃত্বকালীন কার্ডিওমায়োপ্যাথি: রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা

মাত্র পঁচিশ বছর বয়স তার। ফুটফুটে সহজ সরল নির্দোষ মুখশ্রী। শ্বাসকষ্ট নিয়েই চেম্বারে ঢুকলো। মাত্র ছ’দিন আগে সিজারিয়ান অপারেশন করে প্রথম বাচ্চার মা হয়েছে সে। তার মায়ের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেলো গর্ভাবস্থার শেষ দিকে শ্বাসকষ্ট নিয়ে অন্য একটি হাসপাতালে ভর্তিও হয়েছিল। প্রাথমিক চিকিৎসায় উন্নতি হওয়ায় ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে যায়।

শারীরিক পরীক্ষায় দেখা গেলো পায়ে পানি, দ্রুত হার্ট বিট, রক্তচাপ খুব কম। আমি তাকে দ্রুত করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) ভর্তি হতে বললাম। বেডসাইড ইকো করে দেখা গেল, তার হার্টের পাম্পিং ক্ষমতা খুবই কম, মাত্র ২৫%। প্রেসার বাড়াবার জন্য ইনজেকশন দেবার ব্যবস্থা করলাম।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এটি হলো পেরিপার্টাম কার্ডিওমায়োপ্যাথি (Peripartum Cardiomyopathy)। প্রতি এক হাজার প্রেগন্যান্সিতে একজন এই রোগে আক্রান্ত হয়। প্রেগন্যান্সির শেষ মাস এবং বাচ্চা প্রসবের পরবর্তী পাঁচ মাস পর্যন্ত এই রোগ হতে পারে।

সমস্যা কোথায়?

হার্ট হলো শরীরের কেন্দ্রীয় সেচ মেশিন বা পাম্পিং অরগান। সমস্ত শরীরে অক্সিজেন ও খাদ্য পৌঁছে দেয়াই তার কাজ। পাশাপাশি সমস্ত শরীর থেকে কার্বনডাইঅক্সাইড বয়ে নিয়ে ফুসফুসে পৌঁছে দেয়াও গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এই কাজগুলো করতে হার্টের দরকার শক্তিশালী এক বিশেষ বৈশিষ্ট্যের মাংসপেশি। এই মাংসপেশি অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্তকে শক্তি প্রয়োগ করে সারা শরীরে পৌঁছে দেয় এবং রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে ভূমিকা পালন করে। কার্ডিওমায়োপ্যাথি রোগে ঠিক এই মাংসপেশিগুলো আক্রান্ত হয়। মাংসপেশি দুর্বল হয়ে পাম্পিং ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে প্রেসার কমে যায়। রোগী সহজে হাপিয়ে ওঠে, কার্যক্ষমতা হ্রাস পায়, শ্বাসকষ্ট হয়, স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হয়। সঠিক সময় যথাযথ চিকিৎসা না হলে রোগীর জীবনহানির সম্ভাবনা তৈরি হয়।

রোগের কারণ কি?

রোগের কারণ জানা থাকলে চিকিৎসা যথার্থ এবং সহজ হয়। যেমন যক্ষ্মারোগের যখন কোনো কারণ জানা ছিল না তখন উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসা—যেমন: হাওয়া বদল করা, পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ ইত্যাদি উপদেশ দেয়া হতো। তবে সব রোগীই আগে পরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তো। কিন্তু যখন জানা গেল যে, যক্ষ্মা একটি জীবানুর সংক্রমণের কারণে হয়—তখন বিজ্ঞানীরা উঠেপড়ে লেগে গেলেন এর জীবানুনাশক ওষুধ আবিষ্কারে। এবং আমরা এখন জানি যে, সঠিক চিকিৎসা পেলে যক্ষ্মা একটি আরোগ্যযোগ্য রোগ মাত্র। 
কিন্তু পেরিপার্টাম কার্ডিওমায়োপ্যাথির সঠিক কারণটি আমরা এখনো জানি না। নানান তত্ত্ব এবং মতামত অবশ্য আছে। তবে কোনোটির চূড়ান্ত সুরাহা হয়নি।

কোনো কোনো তত্ত্ব অনুযায়ী, বাচ্চা গর্ভাশয়ে থাকাকালীন বাচ্চার দেহের বিরুদ্ধে মায়ের রক্তে একধরণের বিষাক্ত কেমিক্যাল বা এন্টিবডি তৈরি হয়। এই কেমিক্যাল বাচ্চার শরীরে প্রবেশ করতে পারে না এবং তার কোনো ক্ষতিও করে না। কিন্তু তা মায়ের হার্টকে টার্গেট করে এবং হার্টের মাংসপেশির প্রদাহ সৃষ্টি করে মাংসপেশিগুলোকে দুর্বল করে দেয়। এই তত্ত্বের সঙ্গে বাতজ্বর থেকে হার্টের ভাল্ভ নষ্ট হওয়ার বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার মিল রয়েছে।

চিকিৎসা কি?

এখানে মনে রাখা দরকার যে, হৃদপিণ্ডের মাংশপেশি দুর্বল হওয়ার আরো কারণ রয়েছে। যেমন: হার্টের নিজস্ব রক্তনালীতে চর্বি জমে বা ব্লক হয়ে মাংসপেশি ধ্বংস হতে পারে। সেক্ষেত্রে ওষুধ প্রয়োগ ও রিং বা বাইপাস অপারেশনের মাধ্যমে ব্লক অপসারণ করে চিকিৎসা দিলে হার্টের পাম্পিং ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। হার্টের ভাল্ভ নষ্ট হয়েও হার্টের পাম্পিং ক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে। সেক্ষেত্রে বেলুন করে বা অপারেশনের মাধ্যমে ভাল্ভ প্রতিস্থাপন করে চিকিৎসা করলে পাম্পিং ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এছাড়া বিভিন্ন জীবানুর আক্রমণেও তীব্র প্রদাহ সৃষ্টি হয়ে মাংসপেশি দুর্বল হতে পারে। সেক্ষেত্রে যথাযথ এন্টিবায়োটিক প্রয়োগ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

কিন্তু মাতৃত্বকালীন কার্ডিওমায়োপ্যাথির ক্ষেত্রে চিকিৎসা কি হবে? এর তো কোনো সুনির্দিষ্ট কারণই জানা নেই এখন পর্যন্ত। তাই উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসাই এখন পর্যন্ত ভরসা:
১. রোগীর শারীরিক বিশ্রাম খুবই জরুরি।
২. প্রেসার কমে গেলে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে প্রেসার বাড়াবার ওষুধ (vasopressors) প্রয়োগ করতে হবে।
৩. তরল বা লিক্যুইড গ্রহণ কমিয়ে নির্দিষ্ট করে দিতে হবে।
৪. শরীরে জমে থাকা অতিরিক্ত পানি ডাইউরেটিকস্ (water pills) এর মাধ্যমে বের করে দিতে হবে।
৫. প্রেসার মোটামুটি বজায় থাকলে RAAS Blockers, MCR Blockers জাতীয় ওষুধ দিলে পাম্পিং ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। 
৬. নতুন ওষুধ Ivabradine, ARNI ইত্যাদি প্রয়োগে ভাল ফল পাওয়া যেতে পারে। 
৭. এছাড়া Digoxin প্রয়োগে রোগীর উপসর্গভিত্তিক উন্নতি হতে পারে। 
৮. যেসকল রোগীর পাম্পিং ক্ষমতা ( LVEF) খুব কম তাদের শিরায় রক্ত জমাট বাঁধতে পারে বা ব্রেন স্ট্রোক করতে পারে। তাদেরকে রক্তজমাটবিরোধী ওষুধ ( anticoagulant or antithrombotic) প্রয়োগ করতে হবে।

কোনো স্থায়ী সমাধান?

মাতৃত্বকালীন কার্ডিওমায়োপ্যাথির এক তৃতীয়াংশ রোগী সম্পূর্ণ রোগমুক্ত হয়। সুতরাং তাদেরকে প্রাথমিক সাপোর্টিভ চিকিৎসাটা নিশ্চিত করতে হবে। অন্য এক তৃতীয়াংশ রোগী দীর্ঘস্থায়ী হার্ট ফেইল্যুরে চলে যায়। ভাল হয়, খারাপ হয় এভাবে চলতে থাকে। যথাযথ ওষুধ প্রয়োগ ভাল থাকার পূর্বশর্ত । বাকি এক তৃতীয়াংশ রোগীর জন্য দুঃসংবাদ! এরা দ্রুত খারাপ হয়ে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হতে থাকে। চিকিৎসা দেয়া সত্ত্বেও উপসর্গ শুরুর ছয় মাসের মধ্যে যথেস্ট উন্নতি না হলে বুঝতে হবে এরা এই গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত। তাদের বাঁচবার একমাত্র উপায় হলো হার্ট প্রতিস্থাপন বা ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা। উন্নত বিশ্বে যেখানে দুর্ঘটনাজনিত অকাল মৃত্যুর পর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দান করা যায়, সেখানেও হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও দুষ্প্রাপ্য। তবে এখন পর্যন্ত সেটাই ভালো চিকিৎসা।

প্রতিকারের উপায়?

আগেই বলেছি, এক তৃতীয়াংশ বাদ দিলে বাকিদের চিকিৎসা যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক। তাই উপসর্গ দেখা দেবার সঙ্গে সঙ্গে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে। গর্ভকালীন শেষ মাস বা প্রসব পরবর্তী পাঁচ মাসের মধ্যে কোনো ধরণের শ্বাসকষ্ট হলে সবার আগে একটি ইকোকার্ডিওগ্রাম করতে হবে। এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করতে হবে। আর হ্যাঁ, একবার যাদের কার্ডিওমায়োপ্যাথি হয়েছে তারা আর কখনোই সন্তান নেবার পরিকল্পনা করতে পারবেন না। কারণ দ্বিতীয়বার এই রোগে আক্রান্ত হবার আশঙ্কা খুবই বেশি।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত