ঢাকা      মঙ্গলবার ২০, অগাস্ট ২০১৯ - ৫, ভাদ্র, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. রীপা চক্রবর্তী

অনারারী মেডিকেল অফিসার,

ওরাল এন্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারী,

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল


অনিয়মিত টুথব্রাশ ও ফ্লসিংয়ের ফলে সৃষ্ট সমস্যা ও তার প্রতিকার

দৈনন্দিন ভালো ও সঠিক যত্ন-আত্তি একটি সুস্থ ও চমৎকার মৌখিক স্বাস্থ্যের ভিত্তি। আপনি যদি মনোযোগী আর কৌশলী মানুষ হন, তবে আপনার রোজকার রুটিনে অবশ্যই দুবেলা সঠিক পদ্ধতি মেনে দাঁত মেজে পরিচ্ছন্ন করা এবং পুরো মুখ পরিষ্কারের পাশাপাশি ফ্লসিং ও মাউথ গার্গল অন্তর্ভুক্ত।

তবে দাঁতের যত্ন আপাত দৃষ্টিতে আপনার সঠিক মনে হলেও ডেন্টিস্টগণ জানাচ্ছেন যে, অনবরত ও অতিরিক্ত দাঁত ব্রাশ, ব্রাশিং করতে প্রয়োজনের কম বা বেশি সময় নেয়া, সঠিক টুথব্রাশ না ব্যবহার করা, সঠিক মাত্রার উপাদান সমৃদ্ধ টুথপেস্ট না ব্যবহার করা, প্রয়োজনের অধিক মাত্রায় ও অধিক সময় বিভিন্ন মাউথওয়াশ দিয়ে ডেন্টিস্টের প্রেসক্রিপশন ব্যতিত গার্গল আপনার সার্বিক মৌখিক সুস্থতাকে ব্যাহত করছে। এমনকি অদূর ভবিষ্যতে গুরুতর সমস্যারও সৃষ্টি করছে।

এখন পবিত্র রমজান মাস। ইবাদত-বন্দেগির একটি অনুসঙ্গ পরিচ্ছন্নতা হলেও সারাদিন রোজা রেখে ও ইফতার করে তারাবি পড়ার পর ক্লান্তি ভর করে অনেক সময়। ফলে আমরা ডেন্টিস্টগণ প্রচুর পেসেন্ট পাই যাদের মুখে প্লাক জমে পাথর ও নি:শ্বাসে প্রচন্ড দূর্গন্ধ থাকে যা খাবার পর মুখ পরিষ্কার না করার ফল, অথবা পরিষ্কার করেও মুখের ভিতরে মাড়িতে প্রদাহ, রক্তক্ষরণ, দাঁতের বহুদিনের ক্ষয়, ইনফেকশন হতে হতে ফোঁড়ার সৃষ্টি হয়েছে।

আবার এমনও পেসেন্ট আমরা পাই যাদের ডেন্টিস্ট্রি এর উপর বিশ্বাস নেই। কবিরাজের ঝাঁড়-ফুক তাদের প্রধান চিকিৎসা। অথবা পাড়া-মহল্লার ছোট ঔষধের দোকান থেকে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই তারা তাদের চিকিৎসা করে ভয়াবহ কিছু সমস্যার (জিঞ্জিভাইটিস, পেরিওডেনটাইটিস, সিস্ট, টিউমার, এমনকি ওরাল ক্যান্সার) ভুক্তভোগী হয়ে তারপর উন্নত চিকিৎসার দ্বারস্থ হন।

এত কথা বলার প্রধান উদ্দেশ্য হল সকলকে এটা বোঝানো যে, অনিয়মিত, ভুল, অতিরিক্ত, দাঁতের যত্ন ও অপচিকিৎসা পদ্ধতি দাঁত ও মাড়ির কঠিন ও প্রাণঘাতি বিভিন্ন রোগের জন্য দায়ী। এটা এখন বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে, মৌখিক পরিচ্ছন্নতা আনয়নের বিভিন্ন সরঞ্জামাদির (টুথব্রাশ, টুথপেস্ট, ডেন্টাল ফ্লস, মাউথওয়াশ ইত্যাদি) অতিরিক্ত ও ভুল ব্যবহারে সামগ্রিক মৌখিক পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়। যেমন: ব্রাশিংয়ে ভুলের কারণে দাঁতের এনামেল লেয়ারের ক্ষতিসাধন ও এর ফলে সেনসিটিভিটির প্রাদুর্ভাব ঘটে। কারণ, জোরে জোরে ব্রাশ করলে দাঁতের উপরিভাগে থাকা এনামেল লেয়ারের উপর চাপ সৃষ্টি হয়, ফলে এর উপাদানগুলো ব্রাশের ব্রিসলের তৈরি করা ঘর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পেরে স্থানবিচ্যুত হয়। আর এভাবে আস্তে আস্তে এনামেল লেয়ারের ক্ষয় হয়ে আরো ভিতরের ডেন্টিন লেয়ার বেড়িয়ে পড়ে, যার দরুন ঠান্ডা বা গরমে এমনকি টক-ঝাল-মিষ্টি যেকোন খাবার খেলেই দাঁতে শিরশির অনুভূতি হয়।

এই প্রক্রিয়া অনবরত চলতে থাকলে তা একসময় দাঁতের ডেন্টিন লেয়ার ও আরো ভিতরের সিমেন্টাম লেয়ারের ক্ষতিসাধন করে ও একে দূর্বল করে দেয়। ফলে আস্তে আস্তে মাড়িক্ষয় হতে শুরু করে কারণ ডেন্টিন ও সিমেন্টাম লেয়ারের সংযোগস্থল থেকে মাড়ির গঠন শুরু হয়। আর অবশেষে মাড়ির ক্ষয় থেকে তা উচ্চতায় কমে যাওয়া শুরু করে, আরো দূর্বল হয়ে যায়। ফলে দাঁত নড়ে যায়, বা দাঁতের মাড়ির অংশ বেড়িয়ে পড়ে, মাড়িতে প্রদাহ হয় এমনকি ফোঁড়া বিশেষ তৈরী হয়ে রক্ত ও পুঁজ জমে, যা আমরা এবসেস বলে জানি। আর এই এবসেস থেকেই পরবর্তিতে আস্তে আস্তে সিস্ট, টিউমার এমনকি তা ক্যান্সারেও রূপ নেয় ক্ষেত্রবিশেষে।

তবে কি শুধু ব্রাশিংয়ের কারণেই এমন হতে পারে?

না, শুধু ব্রাশিংয়ের কারণেই এমনটা নয়, এর আরো কারণ আছে। ডেন্টাল ফ্লসিংয়ের উপর পেরিওডন্টিস্টরা সবসময় জোর দেন। কারণ, ফ্লসিং দাঁতের ও মাড়ির ভিতরে লেগে থাকা আঁঠালো ও শক্ত খাদ্যকণা দূর করতে ও সেইসাথে প্লাক-ক্যাল্কুলাস জমা হওয়া প্রতিরোধ করতে সহায়তা করে।

কিন্তু আপনি যদি ভুলভাবে, জোরে জোরে ও নিয়মমত ফ্লস ব্যবহার না করেন, তবে শুধু প্লাক-ক্যাল্কুলাস-ই নয়, আরো বড় ক্ষতিসাধন হয় দাঁত ও মাড়ির। কারণ, অতিরিক্ত ও জোরের ফ্লসিং মাড়িতে ক্ষত তৈরী করে, ফলে জ্বালাপোড়ার অনুভূতি ও রক্তপাত হওয়ার দরুন আস্তে আস্তে তা মাড়ির আলসারে পরিণত হয়। যেহেতু ক্ষত থেকে জীবাণু সহজেই ভিতরে প্রবেশ করে ব্যাক্টেরেমিয়া (ইনফেকশন) করে ফেলার সুযোগ পায়। টুথপিকে কাজ আরো ভালভাবে করে পরিস্কারের বদলে।

এছাড়াও সঠিক পরিমাণে ও সঠিক নিয়মে প্রেস্ক্রাইবড ডোজ ছাড়া বিভিন্ন কোম্পানির বিভিন্ন টুথপেস্ট, মাউথওয়াশ ও ওরাল সল্যুশন, চিয়ুইংগাম ইত্যাদি ইচ্ছেমত ব্যবহারে অপরিসীম ক্ষতি হয়। কারণ, এগুলোতে থাকা মেডিকেটেড উপাদানগুলো একেকজনের জন্যে একেকভাবে কাজ করে। যদি প্রয়োজনের অধিক ব্যবহৃত হয় তবে তা মানবশরীরে বিষক্রিয়া তৈরী করতে সক্ষম এবং অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো এলার্জি ও বিষাক্ত প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।

এই ধরনের প্রতিক্রিয়ার ফলাফল খুব-ই বিপদজনক হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে তাদের জন্যে যাদের হৃদরোগ, প্রস্থেটিক হৃদয় ভালভ, প্রস্থেটিক জয়েন্ট এবং রেনাল ডায়ালিসিস শান্ট, বা রেনাল ডায়ালিসিস ব্যবহৃত ফিস্টুলা আছে।

প্রতিকার:

সব সমস্যারই প্রতিকার আছে। আর আপনি চাইলেই দাঁত ও মাড়ির এসব সমস্যার সমাধান করতে পারবেন।

কিভাবে?

শুধুমাত্র সচেতনতা বৃদ্ধি ও আপনার ডেন্টিস্টের পরামর্শকে আদর্শ হিসেবে ধরে সঠিক নিয়মে ও সঠিক উপচারে নিয়মিত মৌখিক যত্ন করে।

অনেকেই সঠিকভাবে ব্রাশ করার পদ্ধতি জানেন না। তাদের জন্যে উপদেশ:

১. খেয়াল করুন, আপনি কি বেশি মাত্রায় সোডা জাতীয় খাবার খান? বা টক ফল খান? খাবার খেয়ে সাথে সাথেই ব্রাশ করেন? যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তবে আপনার অভ্যাস বদলে ফেলতে হবে। আপনাকে যেকোন খাবার খাওয়ার পর অন্তত ৩০ মিনিট পর ব্রাশ করতে হবে। আপনি মুখ পানি দিয়ে কুলকুচি করতে পারবেন কিন্তু ৩০ মিনিটের আগে কোনমতেই ব্রাশ নয়।

২. খেয়াল করুন, আপনার ব্রাশের ব্রিসলগুলো কি আগের মত নরম আছে? ফেটে ফেটে গেছে বা রাফ হয়ে গেছে? যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তবে আপনার ব্রাশ বদলানোর সময় হয়েছে। আপনাকে প্রতি ৩মাস পর পর নরম ব্রিসলের বেন্ডেবল ব্রাশ কিনতে হবে ও ফ্লুওরাইড যুক্ত জেল টুথপেস্ট ব্যবহার করতে হবে। টুথপেস্ট হাতে নিয়ে যদি দেখেন খসখসে নয়, যেমন জেল টুথপেস্ট, সেগুলোই দাঁত ও মাড়ির জন্য ভালো।

৩. দাঁত ও মাড়ির সাথে টুথব্রাশ নিয়ে ৪৫ডিগ্রীতে মানে খাড়া সোজাভাবে না নিয়ে আড়া আড়ি ভাবে ধরে দাঁত ও মাড়ির সাথে কোণাকুণি করে ব্রাশ করবেন। এটাই স্বীকৃত ও সঠিক পদ্ধতি।

৪. প্রতিটি দাঁত সার্কুলার মোশনে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মাঁজবেন, উপর-নিচ ভাবে নয়। কারণ, তাতে উপরের ময়লা নিচে ও নিচেরটা উপরে যাওয়া ছাড়া আর কিছু হয় না। মোট ২থেকে ৩মিনিট ধরে দাঁত মাঁজবেন ও মাড়ি হালকা করে ম্যাসাজ করবেন সাথে জিহবা পরিষ্কার করবেন। এতে মুখে স্যালাইভার সঠিক নি:সরণ হবে সেই সাথে জীবাণুর সংক্রমনের প্রকোপ কমবে।

এই রমজানে এভাবে দাঁত ও মাড়ি সর্বোপরি সারাবছর শারীরিক ও আত্মিক যত্ন নিন, ভালো থাকুন আর প্রতি ৬ মাসে একবার অবশ্যই আপনার ডেন্টিস্টের পরামর্শ নিন।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ঈদে ভোজন-পূর্ব যে বিষয়গুলোতে দৃষ্টি রাখবেন

ঈদে ভোজন-পূর্ব যে বিষয়গুলোতে দৃষ্টি রাখবেন

শুরুতেই ঈদ মোবারক। কোরবানী ঈদের সবচেয়ে আনন্দদায়ক, আকর্ষনীয় শেষ পর্ব- মাংস কাটা,…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর